যেভাবে সেলসম্যান থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার মালিক গোল্ডেন মনির

0

সময় এখন ডেস্ক:

রাজধানীর মেরুল বাড্ডা থেকে অ’বৈধ অ’স্ত্র ও মা- দ’কদ্রব্যসহ গাড়ি ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম ওরফে গোল্ডেন মনিরকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। শনিবার (২১ নভেম্বর) সকালে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায় র‌্যাব।

এর আগে শুক্রবার (২০ নভেম্বর) রাত ১০টা থেকে শুরু হয়ে অভিযান চলে রাতভর। রাতভর অভিযানের পর শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৯০’র দশকে রাজধানীর গাউছিয়ায় একটি কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন মো. মনির হোসেন। এরপর শুরু করেন ক্রোকারিজের ব্যবসা। তারপর লাগেজ ব্যবসা অর্থাৎ ট্যাক্স ফাঁ’কি দিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে মালামাল আনতেন। এক পর্যায়ে জড়িয়ে পড়েন স্বর্ণ চোরা কারবারে। এরপর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অ’বৈধভাবে স্বর্ণ চোরা কারবার, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি দখ’ল করে এখন তিনি দেড় হাজার কোটি টাকার মালিক।

আশিক বিল্লাহ বলেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অ’বৈধপথে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন গোল্ডেন মনির। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে তার স্বর্ণ চোরা কারবারের রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত। এসবই তিনি করেছেন ট্যাক্স ফাঁ’কি দিয়ে। যেখানে তার নাম হয়ে যায় গোল্ডেন মনির।

অভিযান সম্পর্কে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব-৩’র একটি দল শুক্রবার রাত ১১টায় মেরুল বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় অবস্থান নেয়। মনিরের বাসা থেকে ৬০০ ভরি স্বর্ণ, বিদেশি পি’স্তল-গু’লি, অ্যালকোহলযুক্ত পাণীয়, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা সিজ করা হয়েছে। এছাড়া অনুমোদনহীন দুইটি বিলাসবহুল গাড়িও আটক করা হয়। গাড়ি দুইটির প্রতিটির বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া তার অটো কার সিলেকশান নামে গাড়ির শো-রুম থেকে আরও ৩টি অনুমোদনহীন বিলাসবহুল গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।

গোল্ডেন মনির ওরফে মো. মনির হোসেন সম্পর্কে তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরা কারবারি এবং ভূমির দালাল। তার একটি অটোকার সিলেকশন শোরুম আছে। পাশাপাশি রাজধানীর গাউছিয়ায় একটি স্বর্ণের দোকানের সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, স্বর্ণ চোরাকারবারে জড়ানোয় ২০০৭ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার নামে একটি মামলা দায়ের হয়। গোল্ডেন মনিরের আরেকটি পরিচয় তিনি ভূমিদ’স্যু। রাজউকের কিছু অ’সাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঢাকা শহরে ডিআইটি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় তার ২ শতাধিক প্লট আছে। ইতোমধ্যে তিনি তার ৩০টি প্লটের কথা র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেছেন।

আশিক বিল্লাহ বলেন, রাজউকের কাগজপত্র জাল-জালিয়াতি করে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ করেছেন এবং স্বর্ণ চোরা কারবারের মাধ্যমে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আমরা প্রাথমিকভাবে তার বিরু’দ্ধে আরও কিছু অভিযোগ পেয়েছি। তার বিরু’দ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের জন্য দুদক, বিআরটিএ, মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি এবং ট্যাক্স ফাঁ’কি ও এ-সংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ জানাব। মূলত তার নামে ফৌজদারি অপরাধ অর্থাৎ অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা রাখায় বাড্ডা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে একটি মামলা দায়ের করবে র‌্যাব। পাশাপাশি অ’স্ত্র ও মা- দ’কদ্রব্য আইনে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত ফৌজদারি অপরাধের কারণে অর্থাৎ অনুমোদনবিহীন বিদেশি অ’স্ত্র ও মা- দ’কদ্রব্য রাখার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তার এই আইনবহির্ভূত আয়-উপার্জন অর্থসম্পদ গড়াসহ কারা কারা জড়িত, যোগসাজশ এবং সহযোগিতা করেছে সেটি তদন্ত করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানাবে র‌্যাব। তার অর্থ-সম্পদ গড়ার পেছনে এনবিআর, বিআরটিএ, রাজউকের কোন কোন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা বা যোগসাজশ রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানাব।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গোল্ডেন মনিরের সাথে প্রাথমিকভাবে আমরা একটি রাজনৈতিক দল ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানতে পেরেছি। সেই দলটিতে তিনি অর্থের জোগান দিতেন। মো. মনিরের বিরু’দ্ধে দু’টি মামলা ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে- একটি মামলা হচ্ছে রাজউক সংক্রান্ত। রাজউকের ভুয়া সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি ভূমিদস্যুতা এবং আরেকটি হচ্ছে দুদকের একটি মামলা চলমান। গোল্ডেন মনিরকে এখন র‌্যাব-৩ কার্যালয় হেফাজতে নেয়া হচ্ছে। সেখানে তাকে জেরা করা হবে।

জানা গেছে, গোল্ডেন মনির নিজের নিরাপত্তায় লাইসেন্সকৃত দু’টি আগ্নেয়া’স্ত্র সঙ্গে রাখতেন। এর মধ্যে একটি পি’স্তল ও একটি শটগান। তবে বৈধ দু’টির পাশাপাশি একটি অ’বৈধ পি’স্তলও তার কাছে ছিল। আটকের সময় তার বাসা থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়। বিদেশ যাওয়ার জন্য নিজের লাইসেন্সকৃত দু’টি অ’স্ত্র বাড্ডা থানায় জমাও দিয়েছিলেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, গোল্ডেন মনির দুবাইতে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এজন্য তার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। শনিবার গ্রেপ্তার এড়াতে পারলেই তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতেন। এদিন বেলা ১১টার দিকে আমিরাত এয়ারলাইনসের (EK-585) ফ্লাইটে মনিরের দুবাই যাওয়ার কথা ছিল।

গোল্ডেন মনিরের ছেলে মোহাম্মদ রাফি হোসেন বলেন, বাবা প্রায়ই চিকিৎসার জন্য দুবাই যান। এবারও চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন, এজন্য তার ফ্লাইট কনফার্ম ছিল। এর আগেই র‌্যাব তাকে আটক করে ফেলে। তবে মনিরের শারীরিক সমস্যা বা চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিয়ে পারেননি রাফি হোসেন।

বাবার অভিযোগের বিষয়ে রাফি বলেন, আমার বাবা নি’র্দোষ। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বাবার নামে যেসব অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে সব ভিত্তিহীন। তিনি একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী। আমরা আইনিভাবে সব মোকাবেলা করবো। সেখানেই প্রমাণ হবে বাবা অপরাধী কি-না।

উল্লেখ্য, সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী পুরনো নথিপত্রে বেশ কিছু তথ্য মিলেছে। গোল্ডেন মনির বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তারেক রহমান এবং তার বন্ধু মামুন ওরফে খাম্বা মামুনের সাথে মিলে চোরা কারবারের একটি চক্রের সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়াও বিএনপির দলীয় ফান্ডে তিনি প্রায়ই বড় অংকের অনুদান দেন।

শেয়ার করুন !
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply