গোল্ডেন মনিরের গডফাদার সেই প্রতিমন্ত্রীকে ধরা হবে কবে?

0

সময় এখন ডেস্ক:

দেড় হাজার কোটি টাকা আর রাজউকের দুই শতাধিক প্লট বাগিয়ে নেয়া গোল্ডেন মনিরের গডফাদার কারা? সোনা চোর কারবার, গাড়ির ব্যবসার আড়ালে অ’বৈধ ব্যবসা আর জালিয়াতি করে রাজউকের প্লট বাগানো কি তার একার ক্ষমতায় হয়েছে?

এরইমধ্যে বর্তমান সরকারে একজন প্রতিমন্ত্রী এবং কয়েকজন সংসদ সদস্যের নাম এসেছে। তবে তার উত্থান পর্বে বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামলের মন্ত্রী এমপিদের নামও আসছে। সব আমলেই গোল্ডেন মনির ছিলো তাদের গোল্ডেন বয়। কিন্তু এই গোল্ডেন বয় কীভাবে সেলসম্যান থেকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন?

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের হাত ধরে রাজউকের গডফাদার হয়ে উঠেছিলেন গোল্ডেন মনির। বিএনপি সরকার না থাকলেও গোল্ডেন মনিরের আধি’পত্য তাতে বিন্দুমাত্র কমেনি বরং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি আস্তে আস্তে বিস্তৃত করেছেন তার নেটওয়ার্ক, রাজউককে রেখেছিলেন হাতের মুঠোয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ রাজউক অফিসে তিনি ভিআইপি মর্যাদা পেতেন। এছাড়া রাজউকের চেয়ারম্যানের কক্ষে তিনি যখন তখন ঢুকতে পারতেন। তার পরামর্শের দিকেই তাকিয়ে থাকতো রাজউকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এখন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জেরায় তিনি একজন সচিবের কথা বলেছেন। যার সঙ্গে কথা বলে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবার রাজউক পুনরুদ্ধার করেছেন।

ওই সচিব তাকে রাজউক অফিসে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়েছেন। ওই সচিবের কক্ষে তিনি নিয়মিত যেতেন বলেও গোয়েন্দা তথ্যে পাওয়া গেছে। সেই সচিব গোল্ডেন মনিরকে শুধু পৃষ্ঠপোষকতাই দেননি তিনি গোল্ডেন মনিরকে আধি’পত্য বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেই সচিবের বদৌলতেই রাজউককে ব্যবহার করে গোল্ডেন মনিরের ব্যবসা আরও ফুলে-ফেঁপে উঠেছে।

শুধু রাজউকই নয়, এর আগে গণপূর্তের মাফিয়া, মির্জা আব্বাসের ডানহাত খ্যাত যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে শামীমের সময়েও ওই সচিবের নাম সামনে এসেছিলো কিন্তু কেউ তার গায়ে আঁচড় পর্যন্ত দিতে পারেনি।

গত শুক্রবার গোল্ডেন মনিরের বাড্ডার বাড়িতে রাতভর অভিযানের পর সকালে সংবাদ সম্মেলন করে তাকে গ্রেপ্তারের খবর জানায় র‌্যাব। র‌্যাবের অভিযানে ওই বাড়ি থেকে নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা, ৯ লাখ টাকার বিদেশি মুদ্রা, ৮ কেজি স্বর্ণ, একটি বিদেশি পি’স্তল, কয়েক রাউন্ড গু’লি ও ফরেন লিকার উদ্ধার করা হয়।

তবে এই অভিযানের অনেক আগেই ২০১২ সালে দুদক মনিরের নামে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা অ’বৈধ সম্পদের অভিযোগে মামলা করেছিল। দুদক বলছে, সেই মামলার তদন্ত এখনো চলছে। তাদের অনুসন্ধানে মনির ও তার স্ত্রীর ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আর এ পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযানের নগদ টাকা, সম্পদ ও যে ৫টি গাড়ি জব্ধ হয়েছে তার মূল্য ৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

র‌্যাব-এর মুখপাত্র কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, তারা প্রাথমিক অনুসন্ধানে গোল্ডেন মনিরের ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ এবং ২০২টি প্লট ও বাড়ির তথ্য পেয়েছেন। র‌্যাব অ’বৈধ মা- দ’কদ্রব্যের তথ্যের ভিত্তিতে তার বাড়িতে অভিযান চালালে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। তার ২৫টি ব্যাংক একাউন্টে আছে ৯৫০ কোটি টাকা।

র‌্যাব জানিয়েছে, সোনার দোকানের সেলস্যম্যান থেকে স্বর্ণ চোরা কারবারে জড়িয়ে পড়েন মনির। ২০০১ সাল পর্যন্ত সোনা চোরা কারবারই ছিল তার মূল কাজ। তখনই তার নাম হয় গোল্ডেন মনির। এরপর তিনি রাজউকের প্লট বাগানোর কাজ শুরু করেন। তিনি রাজউকের একটি সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে যান। তারপর তার উত্থান শুরু হয়।

রাজউকের প্লট বাগানো শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকে। রাজউকের বাড্ডা প্রকল্প থেকেই তিনি দেড়শ’র মত প্লট বাগিয়ে নেন। যারা ওই প্রকল্পে জমির ক্ষ’তিগ্রস্ত মালিক হিসেবে যাদের প্লট পাওয়ার কথা সেই প্লটগুলো নানা কৌশলে তিনি বাগিয়ে নেন। আর এই কাজে রাজউকের একটি চক্রের পাশাপাশি তাকে সহযোগিতা করে বিএনপির একজন মন্ত্রী, তার ভাই এবং একজন ক্ষমতাধর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। পরে তিনি রাজউকের আরো কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দপ্রাপ্তদের ফাইল গায়েব করে আরও ৫০টির মত প্লট নেন। এই অ’বৈধ কাজ টিকিয়ে রাখতে বর্তমান সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর সাথেও সখ্য গড়ে তোলেন। তাকে একটি দামী গাড়িও উপহার দেন বলে জানা গেছে।

গোল্ডেন মনিরের সাথে বেশ কয়েজন জন সংসদ সদস্যের সখ্যতা রয়েছে। তার বাসা ও শো রুম থেকে যে বিলাসবহুল ৫টি গাড়ি উদ্ধার করা হয় তার মধ্যে শেরপুর এলাকার একজন সংসদ সদস্যের গাড়ি আছে।

র‌্যাবের মুখপাত্র কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, বিআরটিএ গাড়িগুলোর মালিকানা যাচাই করছে। আর অ’বৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছে দুদক। বাড্ডা থানায় যে ৩টি মামলা করা হয়েছে তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগকে। মনিরের প্লট ও বাড়ির তথ্য রাজউককে দেয়া হয়েছে। এখন এটা দেখা তাদের কাজ।

তিনি জানান, গোল্ডেন মনির আসলে তার এই অ’বৈধ কজের জন্য সব সময়ই যাদের প্রয়োজন তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আর এই সম্পর্ক হয়েছে লেনদেন ও উপঢৌকনের বিনিময়ে।

জানা গেছে, তার যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো সাইনবোর্ড মাত্র। এগুলোর আড়ালে তার মূল কাজ অ’বৈধ ব্যবসা। এই কাজে যখন যে দল ক্ষমতায় সেই দলের যেসব মন্ত্রী-এপিকে প্রয়োজন তাদের কাজে লাগিয়েছেন অর্থের বিনিময়ে। রাজউক এর গণপূর্ত তার এই সময়ের বিচরণ ক্ষেত্র। এখানে কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে তার নিজস্ব সিন্ডিকেট আছে। সোনা চোরা কারবারের অ’বৈধ অর্থ তিনি রাজউকের কাজে লাগিয়ে অ’বৈধ সম্পদ বাড়িয়েছেন।

সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের তদন্তের আওতায় আনা হবে। প্রতিমন্ত্রী-এমপি যাদের নাম আসছে তাদের ব্যাপারেও তদন্ত হবে। কিন্তু তার এই কথার এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন দেখা যায়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এরকম আরো অনেক গোল্ডেন মনির আছে। তারা কমবে না যতদিন পর্যন্ত তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা না যাবে। গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রীর নাম আসছে। তার বিরু’দ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে?

শেয়ার করুন !
  • 10
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply