উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়া

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার চলছে। বিভিন্ন উন্নয়নের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। আর এই সমস্ত উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে শতাধিক প্রকল্প। আর এসব প্রত্যেকটা প্রকল্পের একজন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এখন সচিব হওয়া কিংবা বিদেশে কূটনীতিক কোনো আকর্ষণীয় চাকরি নয়। প্রকল্প পরিচালক হওয়াই যেন সব চেয়ে লাভজনক চাকরি। প্রকল্প পরিচালক হওয়া মানেই যেন আলাদিনের চেরাগ হাতের মুঠোয় চলে আসা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি দেখেছে, প্রকল্প পরিচালক হওয়ার জন্য আমলাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলছে। একটি প্রকল্পের পরিচালক হওয়া মানেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়া, সারা জীবন যেন তাকে আর কিছু করতে হবে না। এক প্রকল্পের পরিচালক হলেই বাকি জীবন রাজার হালে কাটানো যাবে। এমন একটি পরিস্তিতি তৈরি হয়েছে। আর তাই লবিংয়েরও শেষ নাই।

করোনার এ সময়ের কথাই যদি ধরা যায়, দেথা যাবে দেশে করোনা সং’ক্রমণ শুরু হওয়ার সাথে সাথে এডিবি এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশেকে অর্থায়ন করেছে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন প্রকল্পে। সেই অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে কোভিড রেসপন্স প্রজেক্ট চালু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই দুটি প্রকল্পেরই প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছিল একজন বিএনপি ঘরনার চিকিৎসক সংগঠন ড্যাব এর এক নেতাকে, যিনি ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রদলের ক্যাডার। তিনি ওই প্রকল্পে কী পরিমাণ সাগর চুরি করেছেন তা নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এমনকি ঠিকানাবিহীন এক গাড়ির ব্যবসায়ীকেও পিপিই কেনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। পিপিই সরবরাহ না করে লোপাট হয়েছে বিপুল অর্থ। মাস্কের দাম, পিপিইর দাম যেভাবে বাড়িয়ে ধরা হয়েছিল তা বিস্ময়কর। এখন ওই প্রকল্প পরিচালক নেই।

বাংলাদেশের যে কোন প্রকল্পেরই বাজেট এবং প্রাক্কলিত ক্রয় তালিকা দেখলে ভিরমি খেতে হয়। কোন কোন প্রকল্পে একটি সাইকেলের দাম ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। কোন প্রকল্পে সাধারন একটা চেয়াররের দাম ধরা হয়েছে ১ লক্ষ টাকা। আর এই প্রকল্পের দুর্নীতির কথা প্রতিদিনই পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। তারপরও প্রকল্পে দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। একটি প্রকল্প যখন তৈরি করা হয় তখন এর একটি দলিল, পরিকল্পনা কমিশন থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। এই প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে যাওয়ার আগে প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় এবং কেনাকাটার প্রাক্কলিত হিসেব মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়। মন্ত্রণালয় সেটা অনুমতি দিলে পরিকল্পনা কমিশনে যায়। আর পরিকল্পনা কমিশন সেটি অনুমোদন করে। আর তাই প্রকল্পের যে দুর্নীতি আর অ’স্বাভাবিক কেনাকাটার খরচ সেটির দায় শুধু একার না।

টিআইবির একজন গবেষক মনে করছেন, এই প্রকল্পের দুর্নীতিটা হচ্ছে একটা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এখানে শুধু প্রকল্প প্ররিচালকই নন, তার সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু ব্যক্তিও জড়িত। সবাই মিলেই দুর্নীতিটা করে। কারণ যখন একটি জিনিশের প্রাক্কলিত মূল্য বেশি ধরা হয়, ১০ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এটি তদন্ত করা, দামের ব্যাপারে আপ’ত্তি করা। তাহলে দুর্নীতির ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। মন্ত্রণালয় যদি নাও করে এটি যখন পরিকল্পনা কমিশনে যায় তখন পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব এই প্রকল্পের ব্যয় যাচাই বাছাই করা এবং সঠিক আছে কি না তা খতিয়ে দেখা। কিন্তু সেটিও হয় না, যার ফলে দুর্নীতি হচ্ছে।

প্রকল্পগুলোই এখন বাংলাদেশে দুর্নীতির হটস্পট বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্পের দুর্নীতির ভাগিদার সবাই হলেও প্রকল্প পরিচালক থাকেন সর্বেসর্বা। একজন প্রকল্প পরিচালকের একাধিক গাড়ি থাকে। তারা প্রকল্পের মাধ্যমে যে আয় উপার্জন করে, তা দিয়েই চলেন। প্রকল্প থেকে তাদের বিভিন্ন রকম যে অ’বৈধ আয়, তা দিয়েই তারা ফুলে ফেঁপে ওঠেন। আর এ কারণেই বড় বড় প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার জন্য তদবির দেন-দরবার চলে সবচেয়ে বেশি। বাংলাইনসাইডার।

শেয়ার করুন !
  • 31
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply