এস কে সিনহার অগাধ সম্পত্তি তার দুই বেইমান কন্যার দখলে!

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

বাংলাদেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করেন। একাকী, নিঃসঙ্গ জীবন। অথচ সারা জীবন বৈধ এবং অ’বৈধ পন্থায় বিপুল বিত্ত বৈভব গড়ে তুলেছিলেন বিদেশে।

কানাডার টরেন্টোতে বেগম পাড়ায় দুটো বাড়ি কিনেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে কিনেছিলেন একটি বাড়ি। সিঙ্গাপুরে দুটি ফ্ল্যাট, স্থাবর সম্পত্তি ছাড়াও কানাডায় জমা রয়েছে বাংলাদেশী টাকায় ৫০ কোটি টাকা। অস্ট্রেলিয়ায় ১০ কোটি টাকা পাচা’র করেছিলেন। কিন্তু এসব সব সম্পদ হাতছাড়া হয়েছে তার। দুই মেয়ের নামে রাখা এই সম্পদ এখন তারা বাবাকে ফিরিয়ে দিতে রাজী নয়। এমনকি, বাবার নারীঘটিত ব্যাপার ফাঁ’স হওয়ায় তার সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছে মেয়েরা।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহার দুই কন্যার বড়জন- সূচনা সিনহা থাকেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে। দ্বিতীয় মেয়ে আশা রানী সিনহা থাকেন কানাডার টরেন্টোতে। দুই কন্যাই বিবাহিত। তাদের স্বামীরা ঐ দেশেই চাকরী করেন।

বিচারপতি সিনহা প্রথম বাড়ি কেনেন সিডনীতে ২০১১ সালে। তখনও তিনি প্রধান বিচারপতি হননি। মেয়ের নামে সিডনীতে ঐ বাড়ি কিনতে ব্যায় করেন ৩০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার।

২০০৮ সালে সিনহার ছোট মেয়ে আশা রানী সিনহা কানাডায় বিজনেস ক্যাটাগরিতে ইমিগ্র্যান্ট হন। এজন্য তাকে ৫ কোটি কানাডিয়ান ডলার জমা দিতে হয়। আশা রানীর কানাডায় প্রথম বাড়ি হয় ২০১৫ সালে তার বাবার প্রধান বিচারপতি হবার ঠিক ২ মাস পর। ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন সিনহা। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তার জামাতার নামে কানাডায় দ্বিতীয় বাড়িটি কেনেন সিনহা।

উল্লেখ্য, ২০১৫ এর জানুয়ারিতে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নিয়ে নানা বিত’র্ক সৃষ্টি করেন সিনহা। অবশেষে ১০ নভেম্বর ২০১৭ সালে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের আগে তার নামে আর্থিক এবং নারী কেলে’ঙ্কারীর অভিযোগ ওঠে।

দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য বিচারপতি সিনহার নামে নতুন নয়। বিচারক জীবনের শুরু থেকেই সিনহা একজন ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসেবে পরিচিত পান। ১/১১’র সময় তার নামে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। ঐ অভিযোগে তাকে জোর করে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষরের জন্য বঙ্গভবনে ডাকা হয়। সেখান থেকে তিনি পালিয়ে আসেন। এরপরও তাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিত’র্কের মুখে দেশত্যাগ করে বড় মেয়ের কাছে অস্ট্রেলিয়ায় যান সিনহা। এ সময়ই সুপ্রীম কোর্টের এক নারী কর্মকর্তার সঙ্গে বিচারপতি সিনহার কিছু অন্তরঙ্গ ছবি যায় সূচনার ইমেইলে। এ নিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করেন সূচনা। কিন্তু বিচারপতি সিনহা এর জবাব না দিয়েই অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুর আসেন। এখানেই বড় মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের ইতি ঘটে।

ছোট মেয়ে আশা রানীও এসব ছবি পান দিদির কাছ থেকে। তিনিও বাবাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। এবারও সিনহা উত্তে’জিত হন। আশার সঙ্গেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

এখন দুই মেয়েই তাদের বাবার দুর্নীতির টাকা ভোগ করছেন। কিন্তু বাবাকে ক্ষমা করছেন না। আর বেচারা সিনহারও ঐ বাড়ি এবং টাকা যে তার এটা প্রকাশ্যে বা আইনি প্রতিকারের জন্য বলতে পারছেন না। বরং দুই মেয়েকে তিনি ‘বেইমান’ বলেই তুষ্ট থাকছেন।

বিচারপতি সিনহার যাবতীয় অপকর্মের খতিয়ান (ভিডিও)

সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার বিরু’দ্ধে আর্থিক অ’নিয়ম ও প্রভাব বিস্তার করার অন্তত এক ডজন অভিযোগ রয়েছে। মি. সিনহা নিজের ও ভাইয়ের নামে প্লট বরাদ্দে প্রভাব বিস্তার, প্লটের মূল্য পরিশো’ধ না করা, ১/১১ এর সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকারের আদায় করা অর্থ পুনরায় ফেরত দিতে উৎ’কোচ গ্রহণ, জ্ঞাত আয় বর্হিভূত অর্থের সন্ধান, আমেরিকা-কানাডা-অস্ট্রেলিয়ায় অর্থপা’চার, দুদকের তদন্তে বাধা, যু’দ্ধাপরাধের দায়ে দ’ন্ডিত রাজাকার সাকা চৌধুরীর পরিবারের সাথে গোপন বৈঠক, জজ নিয়োগে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তার বিরু’দ্ধে। গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

এস কে সিনহার বিরু’দ্ধে রাজউকের প্লটের সরকার নির্ধারিত মূল্য পরিশো’ধ না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া ও বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। ২০০৩ সালে ৩ ডিসেম্বর উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের ১ নম্বর সড়কে ৩ কাঠা আয়তনের ১৫ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ পান। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব খাটিয়ে বরাদ্দ পাওয়া প্লটটি ২০০৪ সালের ১৩ এপ্রিল ১৫ নম্বর থেকে ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর সড়কের ৫১ নম্বর প্লটের সঙ্গে বদল করেন। এছাড়া, তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্লটের আয়তন ৩ কাঠার বদলে ৫ কাঠায় পুনর্নির্ধারণ করিয়ে পুনরায় বরাদ্দ করান। কিন্তু অতিরিক্ত ২ কাঠা জমির মূল্যের জন্য রাজউক থেকে ২ বার (১৩ এপ্রিল ২০০৪ এবং ১৩ জুন ২০১৬) নোটিশ দেওয়ার পরও মূল্য পরিশো’ধ করেননি।

সূত্র জানায়, ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩১ কোটি ৯৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৫ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হাইকোর্টে পৃথক রিট আবেদন করে। রিটের রায়ে সরকারের আদায় করা অর্থের কিছু অংশ অর্থাৎ ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ৯০ দিনের মধ্যে ফেরত দেওয়ার আদেশের বিনিময়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ঘুষ নেন তিনি।

সূত্র বলছে, এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতি থাকাকালে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত ৩ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ টাকা কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মেয়েদের কাছে পা’চার ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করেছেন। সাবেক প্রধান বিচারপতির আয়কর বিবরণী, অনিরুদ্ধ রায়ের অ্যাকাউন্টস অফিসারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবরণী, কানাডায় পাঠানো টাকার ব্যাংক কনফার্মেশন এসএমএসের স্ক্রিনশট, কানাডায় অবস্থান করা প্রধান বিচারপতির মেয়ে আশা সিনহার দ্বারা অর্থপ্রাপ্তির স্বীকৃতির এসএমএস, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো অর্থের কনফার্মেশন ই-মেইল, ইন্দোনেশিয়ার পেনিন ব্যাংক হতে অস্ট্রেলিয়ায় সূচনা সিনহার অ্যাকাউন্টে পাঠানো অর্থের ডিপোজিট ফর্ম থেকে এসব অর্থপা’চার ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সাবেক প্রধান বিচারপতি ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে তারই নিজস্ব কিছু লোক দিয়ে মামলার তদ্বির করিয়ে এসব অর্থ উপার্জন করেন। বিশ্বস্ত লোকদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়, সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক রণজিৎ, কানাডা প্রবাসী অভিবাসন আইনজীবী মেজর (অব.) সুধীর সাহা। এদের মাধ্যমে তিনি মানি লন্ডারিং করে বিদেশে এসব টাকা পাঠান।

সূত্র জানায়, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরু’দ্ধে দুদকের একটি গুরুতর অ’সদাচরণ সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত করা হচ্ছিল। ওই তদন্তে তিনি বাধার সৃষ্টি করেন। চিঠি দিয়ে তিনি দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত না করার নির্দেশ দেন। এভাবে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বিভিন্ন রাষ্ট্রবিরো’ধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন। প্রধান বিচারপতি থাকাকালে তিনি জাপানে একটি সেমিনারে গিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে বলে বক্তব্য দেন। এছাড়া, তিনি ১০ম জাতীয় সংসদে বিনা প্রতিদ্ব’ন্ধিতায় নির্বাচিত ১৫৩ জন সংসদ সদস্যের পদ বাতিলের জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন। একজন আইনজীবীকে দিয়ে রিট আবেদন করানোর পরিকল্পনা ছিল তার।

সূত্র জানায়, সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য অপ’সারণের বিষয়ে ইতোপূর্বে ইসলামি দলগুলো দাবি জানিয়ে আসলেও ভাস্কর্য অপ’সারণ করে পুনরায় তা এনেক্স ভবনের সামনে প্রতিস্থাপন করে রাজনৈতিক উ’স্কানির মাধ্যমে অ’রাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছিলেন এস কে সিনহা। এছাড়া, সরকারই জাতীয় সংসদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না বলে বিত’র্কিত মন্তব্য করেন। ২০১৭ সালের ২৩ মে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপ’সারণ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল থেকে সংসদের হাতে প্রদান করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে হাইকোর্টের রায়ের বিরু’দ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল শুনানিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গত, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তোপের মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে অসুস্থতার কথা বলা হলেও ১৩ অক্টেবর বিদেশে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের বিচারপতি সিনহা জানান, তিনি অসুস্থ নন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় বি’ব্রত হয়ে তিনি বিদেশ যাচ্ছেন।

তার ছুটির মেয়াদ শেষ হলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিচারপতি সিনহা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। পদত্যাগ করার পর বিচারপতি সিনহার বিরু’দ্ধে দুর্নীতি, অর্থপা’চার, আর্থিক অ’নিয়ম ও নৈতিক স্খ’লনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ ওঠার কথা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বলা হয়, ওইসব অভিযোগের কারণে আপিল বিভাগের অন্য বিচারকরা আর প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে মামলা নি’ষ্পত্তিতে রাজি নন।

একাত্তর টিভি’র প্রতিবেদন:

শেয়ার করুন !
  • 203
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply