কক্সবাজারে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম, সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন

0

প্রতিরক্ষা ডেস্ক:

ইউরেনিয়াম- সারা বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্খিত মৌলিক পদার্থগুলোর একটি। ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ দেশগুলোকে সারাবিশ্ব সমীহ করে চলে। কারন ইউরেনিয়ামের নির্দিষ্ট আইসোটোপ ভ্যারাইটির উপযুক্ত ব্যবহারের পারমাণবিক শক্তি অর্জন করা যায়। আর এ কারনে যাদের দেশে ইউরেনিয়াের খনি আছে, উত্তোলন ও ব্যবহার করার প্রযুক্তি আছে, তারা হয় সৃমদ্ধ। অন্যদিকে সক্ষমতা থাকলেও অনেকের খনি নাই, তারা বিকল্প উপায়ে অন্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিজেদের সমৃদ্ধ করে।

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা নয় শুধু, খনিজ সম্পদে ভরপুর আমাদের এই দেশটি। কী নেই এখানে? গত কযেক বছরে আমাদের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বেড়েছে। কাজ করছেন দেশের বিভিন্ন জায়গায়। রংপুরের খনিতে সোন-রূপার অস্তিত্বের সন্ধান, দিনাজপুরে লোহার বিস্তীর্ণ খনির সন্ধান, যমুনা নদীর তলদেশে অতি মূল্যবান খনিজ মোনাজাইটের উচ্চমাত্রার জানান দিয়েছে সংস্থাটি। এবার কক্সবাজারে উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম প্রাপ্তির কথাও জানালেন গবেষকরা।

বিজ্ঞানের ছাত্র নন যারা, তাদের জ্ঞাতার্থে ইউরেনিয়াম সম্পর্কে কিছু তথ্য দেয়া যাক। ১ কেজি কয়লা থেকে ৮ কিলোওয়াট প্রতি ঘন্টা, ১ কেজি খনিজ তেল থেকে ১২ কিলোওয়াট প্রতি ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আর ১ কেজি ইউরেনিয়াম (ইউরেনিয়াম-২৩৫) থেকে প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ কিলোওয়াট প্রতি ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

অর্থাৎ তেল বা কয়লা থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি শক্তির তুলনায় ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর শক্তি ২০/৩০ লাখ গুণ বেশি। আর সেই ইউরেনিয়ামেরই উচ্চমাত্রায় উপস্থিতি পাওয়া গেছে কক্সবাজারের মাটি ও পানিতে। সদ্য প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল সায়েন্স ডাইরেক্ট ডটকম-এ (গ্রাউন্ড ওয়াটার ফর সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট এর মুখপত্র) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৯৯০ পিপিএম মাত্রারও বেশি ইউরেনিয়াম থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। পিপিএম অর্থ- পার্টস পার মিলিয়ন বা ১০ লক্ষ ভাগের ১ ভাগ।

ময়মনসিংহের ত্রিশালস্থ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট ভূ-রসায়নবিদ ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করে জাপানে পরীক্ষার পর এ ফলাফল পান।

উক্ত গবেষক দলে আরো ছিলেন- জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ জাপানের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ এডভান্সড ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির শিক্ষক-গবেষক ইয়োশিআকি কোন, জাপানের তুকোশিমা ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ টেকনোলজি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্ড সোশ্যাল সায়েন্সের শিক্ষক-গবেষক রিও আনমা, জাপানের ওসাকা সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্কুল অফ সায়েন্সের শিক্ষক-গবেষক হারু মাসুদা ও কেজি শিনোদা,

সুইডেনের কেটিএস-ইন্টারন্যাশনাল গ্রাউন্ড ওয়াটার আর্সেনিক রিসার্চ গ্রুপের ডিপার্টমেন্ট অফ সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক-গবেষক প্রসূন ভট্টাচার্য্য, জাপানের দশিশা ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষক-গবেষক ইউরিকো ইউকো এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক-গবেষক বিপুলেন্দু বসাক।

পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে থাকা জিরকন ও মোনাজাইটে ৮৫০.৭ পিপিএম থেকে ৯৯০.৬ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। যা ইতোপূর্বে সিলেট ও মৌলভীবাজারে প্রাপ্ত আকরিকের তুলনায় পরিমানে প্রায় দ্বিগুণ এবং উচ্চমানের। ২০১৫ সালে সিলেট ও মৌলভীবাজারে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ কে এম ফজলে কিবরিয়ার নেতৃত্বে চালানো অনুসন্ধানে ৫০০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম ধরা পড়ে।

ওই বছরের ডিসেম্বরে এক সেমিনারে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সিলেট ও মৌলভীবাজারের পাশাপাশি কক্সবাজার সাগর তীরে ও ব্রহ্মপুত্র নদের বালিতে ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব থাকার তথ্য প্রকাশ করেন। তবে কক্সবাজার ও ব্রহ্মপুত্র নদের মাটিতে কী মাত্রায় কিংবা কী পরিমাণ ইউরেনিয়াম রয়েছে সে তথ্য জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি।

সারাবিশ্বে ভিন্ন মাত্রার ইউরেনিয়াম ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়াম পারমাণবিক চুল্লীতে সমৃদ্ধ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়। প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামকে ০.৭% থেকে ৩.৭ পর্যন্ত এবং ৩.৭ থেকে ৫% মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়। তবে ২০% পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে বলা হয় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচআরইউ)। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রচুর পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দরকার। আর সেই ইউরেনিয়ামের যোগান নিজেদের মাটি থেকেই আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, কক্সবাজারে চালানো সাম্প্রতিক ওই গবেষণা অনুসন্ধানের জন্য ভূ-পৃষ্ঠের সর্বোচ্চ ১৮.৯ মিটার গভীর থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৩ মিটারের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জিরকন ও মোনাজাইট পাওয়া যায়।

তিনি জানান, কক্সবাজারের মাটিতে ১.১ পিপিএম থেকে ৩৩.৪ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম এবং ৬.৩ পিপিএম থেকে ২০২.৩ পিপিএম থোরিয়াম পাওয়া যায়। আর এই মাটিতে মোনাজাইটের পরিমাণ ৩.২৮% ভাগ এবং জিরকনের পরিমাণ ২.৩৬% ভাগ। আর মোনাজাইট এবং জিরকন কণা নিজেই ৩,৩৯৫.৯ পিপিএম থেকে ৩,৯৩৭.৫ পিপিএম পর্যন্ত থোরিয়াম এবং ৮৫০.৭ থেকে ৯৯০.৬ পিপিএম পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ।

যা সাধারণ মাত্রার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ। সাধারণ মাত্রায় থোরিয়াম থাকে ২৭৫.৫ পিপিএম থেকে ৩১৮.৪ পিপিএম এবং ইউরেনিয়াম থাকে ২৫৬.৩ পিপিএম থেকে ২৯০.৫ পিপিএম পর্যন্ত। সুতরাং বলা যায়, এটা বেশ সমৃদ্ধ এবং কম গভীরতায় থাকায় উত্তোলনও হবে খুব লাভজনক এবং সময় সাশ্রয়ী।

গত কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা করে ১০ পিপিএম মাত্রার ইউরেনিয়াম এর অস্তিত্ব পান বিজ্ঞানী ড. আশরাফ। যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি। হু নির্ধারিত সহনীয় মাত্রা হল ২ পিপিএম। আর এ ফলাফলের পরই কক্সবাজারের মাটিতে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম থাকার সম্ভাবনা থেকে তিনি সম্প্রতি ওই জরিপ চালান বলে জানান।

গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী জানান, তার গবেষণায় মোনাজাইটের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার (১৬%) ইউরেনিয়ামের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। রুটাইল, জিরকন ও ইলমেনাইটেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ মিশে থাকে।

ইউরেনিয়াম একটি ঘন, রূপালী-সাদা, সামান্য প্যারাম্যাগনেটিক তেজস্ক্রিয় ধাতু। এটি নমনীয় এবং ক্ষ’তিকারকও। ইউরেনিয়ামের কালো স্তর অক্সাইড বাতাসকে দূষিত করে। ইউরেনিয়াম একটি অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধাতু এবং প্রায় সমস্ত ননমেটালিক উপাদান এবং তাদের অনেকগুলি যৌগের সাথে বিক্রিয়া করে। এর অর্ধায়ু ৭০৪ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ, ১০০ গ্রাম ইউরেনিয়াম স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা হলে এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ৫০ গ্রামে পরিণত হতে সময় লাগবে ৭০৪ মিলিয়ন বছর। ইউরেনিয়াম প্রাকৃতিকভাবে একটি ভারী ধাতু। যা ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘনীভূত শক্তির প্রাচুর্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

পৃথিবীর ভূ-ত্বকে টিন, টাংস্টেন এবং মলিবডেনামের মত সাধারণ একটি খনিজ ইউরেনিয়াম। সাধারণত ২ থেকে ৪ পিপিএম ঘনত্বের পাথরেই একে দেখা যায়। ইউরেনিয়াম সমুদ্রের পানিতে জন্ম নেয় এবং সেখান থেকেও আহরণ করা যায়। তবে ভূ-পৃষ্ঠের নীচে বা পানিতে; যেখানেই ইউরেনিয়াম থাকুক না কেন সেখান থেকে তেজস্ত্রিয়তা বিকিরিত হয়। এতে উপাদানটি চিহ্নিত করা সহজ। তবে কক্সবাজারের ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়ামের কী পরিমাণ মজুদ রয়েছে বা সাগরের পানিতে কী মাত্রায় রয়েছে, তা নিয়ে এখনো কোন গবেষণা হয়নি।

কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলীয় বালিতে ভারী খনিজ সম্পদের উপস্থিতির তথ্য প্রথম জানা যায় ১৯৬১ সালে তদানীন্তন পাকিস্থান ভূ-তাত্তি্বক জরিপ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্থান আণবিক শক্তি কমিশন এই ভারী খনিজ সম্পদের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। ১৯৬৭ সালে ২ জন অস্ট্রেলিয় বিশেষজ্ঞের সহায়তায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের বালিতে ভারী খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, জরিপ, বালির নমুনা বিশ্লেষণ, খনিজের পরিমাণ নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ের ওপর গবেষণা কাজ শুরু করা হয়।

এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ওই বছরই পাকিস্থান আণবিক শক্তি কমিশন ‘ডাইরেক্টর অব নিউক্লিয়ার এন্ড মিনারেলস (ডিএনএম)’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে, যার প্রধান কার্যালয় ছিল পাকিস্থানের লাহোরে। আর একটি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হয় চট্টগ্রামে। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম অফিস হতে ধারাবাহিকভাবে ভারী খনিজ বালি অনুসন্ধান ও জরিপের কাজ শুরু করা হয়। ওই বছরেই ওই প্রকল্পের প্রথম ধাপটি শেষ করা হয়।

বাংলাদেশের ৫৫০ কিঃমিঃ দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চলে ‘ভারী খনিজ বালি অনুসন্ধান ও জরিপে’ ১৭টি স্তুপের মধ্যে পাওয়া ৮টি মূল্যবান খনিজ পদার্থের মধ্যে মোনাজাইট ও জিরকনের মত তেজস্ক্রিয় পদার্থও রয়েছে বলে জানান পরমাণু শক্তি কমিশনের কক্সবাজারস্থ খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের সাবেক ভূ-তত্ত্ববিদ ও গবেষক ড. আশরাফ সিদ্দিকী।

তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর খনিজ বালি অনুসন্ধানের কার্যক্রমটি আরও শক্তিশালীভাবে পরিচালনা করা হয়। এ সময় অস্ট্রেলিয় বিশেষজ্ঞ কর্তৃক কাজের অগ্রগতি ও ফলাফল বিষয়ক পর্যালোচনা করা হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন বেশ লাভজনক বলে প্রমাণিত হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশক্রমে ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের অর্থানুকূল্যে খনিজ বালি হতে মূল্যবান উপাদানসমূহ পৃথকীকরণের সঠিক পদ্ধতি উদ্ভাবন, উপাদানগুলোর পরিমাণ এবং গুণগত মান নির্ণয়ের জন্য কক্সবাজারে একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন ও চালু করা হয়।

এসব কার্যক্রমের মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল খনিজ বালি থেকে মূল্যবান উপাদানগুলো পৃথকীকরণের সঠিক উপায় উদ্ভাবন করা, যা থেকে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক প্ল্যান্ট স্থাপনের দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে। এরপর ১৯৭৭ সালে পাইলট প্ল্যান্ট প্রকল্পের ২য় পর্যায়ের কাজ শুরু করা হয়। ইতোমধ্যে এ কেন্দ্রের দীর্ঘ গবেষণায় এসব মূল্যবান খনিজের ব্যবহারযোগ্য মান অর্জিত হয়েছে।

ককক্সবাজারস্থ সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’র পরিচালক ড. মোহাম্মদ রাজিব জানান, প্রায় ৪ দশক সময় ধরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ‘সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্র’ উপকূলীয় এলাকায় মূল্যবান খনিজ অনুসন্ধান এবং আহরণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এ যাবৎ ১৭টি ভারী খনিজ স্তুপের আবিষ্কারসহ এর বিস্তৃতি, মজুদ এবং গুণগত মান নির্ণয় করা হয়েছে। সেই সাথে একটি পরীক্ষামূলক প্ল্যান্ট ও একটি খনিজ পৃথকীকরণ গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে কাঁচা বালি প্রক্রিয়াজাতকরণ করে চলেছে।

এ খনিজগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় প্রধান প্রধান খনিজসমূহ হলো- ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন এবং রুটাইল। সম্প্রতি উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকার নদীবাহিত বালিতেও উপস্থিত অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন খনিজ, বিশেষ করে সিলিকা সমৃদ্ধ বালি নিয়ে গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উন্নয়নে রাশিয়ার সহযোগিতায় পাবনার রূপপুরে ২টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করছে। প্রায় ২৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র দুটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তির উন্নয়নে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রথম পরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৬১ সালে। এরপর এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে ১৯৬৩ সালে পাবনার রূপপুরকে প্রকল্পের স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। বাংলাদেশ আমলে ২০০১ সালে পারমাণবিক শক্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং ২০০৭ সালের ২৪ জুন দেশে বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সাথে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করে এবং ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়রি দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক বা MOU (Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও চীনের সাথে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা শীর্ষক একটি সহযোগিতা স্মারকেও স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এরপর ২০১১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আণবিক শক্তি কর্পোরেশনের সাথে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ইতোমধ্যে রাশিয়া ২ হাজার ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আনুমানিক ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দুটি পারমাণবিক চুল্লী স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। যদিও ইতোপূর্বে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কিরিয়েস্কো বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুটি উৎপাদনের জন্য ২০২১ সালে চালু হবে বলে জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ২০১৩ সালের ২৯ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ কোন দ্বীপে ২য় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।

তবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. একেএম ফজলে কিবরিয়া এ প্রতিবেদকে বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ভূ-গর্ভস্থ মাটিতে ইউরেনিয়াম পাওয়া গেলেও এগুলো রূপপুরে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ খনি থেকে পাওয়া এসব পদার্থ আকরিক থেকে পৃথক করতে যে প্ল্যান্ট দরকার তা এখনও আমাদের দেশে স্থাপিত হয়নি। রূপপুরে সমস্ত জ্বালানী রাশিয়া থেকে সরবরাহ করা হবে।

তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এই মূল্যবান খনিজ সম্পদের ব্যবহার এই মুহুর্তে সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতের জন্য একটি মাইলফলক হিসাবে এখনই প্রস্তুতি শুরু করা উচিৎ বলে মনে করেন গবেষকরা।

গবেষক ড. আশরাফ আলী সিদ্দিকীর ধারণা, কক্সবাজারে প্রাথমিক অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেছে, তা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। গত বছর চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় চালানো জরিপেও মাটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেজস্ত্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম ও রেডিয়াম রয়েছে। এসব জরিপ চট্টগ্রাম উপকূলের মাটিতেও ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম থাকার জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। দেশের অন্যান্য সমুদ্র উপকূলীয় এলাকাতেও এই খনিজ পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

শেয়ার করুন !
  • 816
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply