ওয়াজ মাহফিলে রাষ্ট্র ও সংবিধানবিরোধী বক্তব্য

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

বাংলাদেশ একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ যা বহিঃবিশ্বে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” নামে পরিচিত। বাংলাদেশের জনগণ বাঙালি জাতির অস্তিত্ব আর মর্যাদা রক্ষার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহবানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়ে পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর বিরু’দ্ধে দীর্ঘ ৯ মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।

বিজয় অর্জনের ১ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছায় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগন একটি খসড়া সংবিধান রচনা করেন যা ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে পাস হয় এবং একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়।

বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিধিগণের দ্বারা রচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান মূলত জনগণের অধিকারের দলিল, প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের জনগণকে সকল ক্ষমতার অধিকারী সাব্যস্ত করে দেশের এই পবিত্র সংবিধানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।

যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদগণকে আত্মোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল- বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সে সকল আদর্শকে আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৬(২) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী হিসেবে পরিচিত হবেন। একই সংবিধানের ৩৯(২)ক ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, তবে এই বাক-স্বাধীনতার অর্থ বেফাঁ’স বক্তব্য রাখার স্বাধীনতা অথবা স্বৈ’রাচারিতা নয়। এই বাক-স্বাধীনতা সুযোগ নিতে হলে কোন ব্যক্তিকে-

১) সংবিধানের ৬(১)ধারার বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে; ২) সংবিধানের ৩৯(২)ধারায়- “রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহা’নি বা অপরাধ-সংঘটনে প্র’রোচনা সম্পর্কে আইনের ধারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষে’ধ-সাপেক্ষে” শর্ত পূরণ করতে হবে। সংবিধানে উল্লেখিত উপরোক্ত বিধানসমূহ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সংবিধান রচনার পর থেকে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নকারীদের অন্যতম, দেশ বরেণ্য কিছু আইনজীবিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ জেনে আসলেও ইদানিং কিছু ভাড়াটে ওয়াজি যারা তাফসীর মাহফিলের নামে এতদিন আজগুবি ও বানানো কেচ্ছা কাহিনী বলে জনগণের পকেট খালি করেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে বিলাসবহুল পাজারো গাড়ি অথবা হেলিকপ্টারে চড়ে বেড়ান, তারা মনগড়া বক্তব্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রা’ন্ত করছেন।

তারা নিজেদের স্বার্থে সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে পবিত্র সংবিধানের অবমাননা করছেন। বাক-স্বাধীনতার নামে উ’স্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে দেশে অ’রাজক ও অ’স্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছেন। কোমলমতি যুবসমাজকে ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে অপরাধমূলক কাজে জড়িত হতে উৎসাহিত করেছেন। তাদের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে কেউ কেউ ফৌজদারি অপরাধ সংগঠিত করেছেন।

কুষ্টিয়া শহরে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভা’ঙার অভিযোগে আটক মাদ্রাসার ছাত্ররা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্টেটমেন্ট দিয়ে স্বীকার করেছে যে, মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হকের ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ঈমানি দায়িত্ববোধ থেকে তারা এমনটি করেছে।

কে এই মামুনুল হক?

মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক (জন্ম: নভেম্বর ১৯৭৩) এ সময়ের সবচাইতে আলোচিত, সমালোচিত এবং বিত’র্কিত একজন বক্তা। বাবা স্বঘোষিত স্বাধীনতাবিরোধী মাওলানা আজিজুল হক। নিজেকে প্রচার বিমুখ দাবি করলেও এই বক্তা সুচতুরভাবে বাবা শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা শ্বশুরের পরিচয় দিয়ে ধর্মপ্রাণ জনগণের সহানুভূতি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের আশীর্বাদ আদায়ে সর্বদা সচেষ্ট থাকেন।

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী আর মাদ্রসা পড়ুয়া ছাত্রদের বুকের তাজা র’ক্ত মাওলানা মামুনুল হকের খুব পছন্দ। তিনি কথায় কথায় দেশের সংস্কৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেবার হুম’কি দেন। আন্তর্জাতিক জ’ঙ্গি সংগঠন আইসিসের অনুকরণে, জে’হাদি ভঙ্গিতে বাংলাদেশকে র’ক্তের বন্যায় লাল করে দেয়ার কথা বলেন।

তিনি বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র কায়েম করার স্বপ্ন দেখেন ও তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সভা-সমাবেশে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্রদের বুকের তাজা র’ক্ত দিতে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতি আদায় করেন।

সাম্প্রদায়িক বি’দ্বেষ ছড়ানো ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য রাখার অভিযোগে ২০১৩ সালে মাওলানা মামুনুল হক ৮৩ দিন জেল খাটেন। বর্তমানেও রাষ্ট্রবিরোধী ও উ’স্কানিমূলক বক্তব্য রাখার দায়ে দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরু’দ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে যা তদন্তাধীন আছে। এছাড়া জ’ঙ্গিবাদে উৎসাহ দেয়া, নারী জাতিকে হে’য় প্রতিপন্ন করা, সাম্প্রদায়িক উ’স্কানি ও দেশের বিশিষ্ঠজনদের নিয়ে ক’টূক্তিমূলক বক্তব্য প্রদানের জন্য ২০১৯ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যে ১৫ জন বক্তার উপর কড়াকড়ি আরোপ করে তার মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক অন্যতম।

সম্প্রতি হেফাজত ইসলামের মহাসচিবের মৃ’ত্যুর পর সংগঠনের নীতিনির্ধারকগণ মাওলানা মামুনুল হককে আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পদকের দায়িত্ব প্রদান করেন। ঢাকা মহানগর কমিটির শীর্ষ পদে একাধিক মামলার আসামী মাওলানা মামুনুল হকের এই নিয়োগ দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি হেফাজত নেতৃত্বের অ’বজ্ঞা প্রদর্শন ও বাংলাদেশে উ’গ্রবাদী চরমপন্থীদের উত্থানকে উৎসাহিত করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য, রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্ৰ ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে তার গগনবিদারী চিৎকার, দেশের একজন আইনপ্রণেতা, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি, একজন পথিতযশা সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদকে উদ্দেশ্য করে তার আ’ক্রমণাত্মক বক্তব্য; এই ৩ ব্যক্তিত্বকে লা’ঞ্ছিত করার প্রকাশ্য হুম’কি সরাসরি দেশের প্রচলিত আইনের ল’ঙ্ঘন। মাওলানা মামুনুল হকের এমন বে-আইনি বক্তব্য দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের স্বাভাবিকভাবেই বিচলিত করে।

প্রকাশ্যে দেশের বিশিষ্ঠ নাগরিকগণকে অবা’ঞ্ছিত ও জুতাপে’টা করার হুম’কিদাতা এই মামুনুল হকই আবার কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তার অপ’সারণ দাবি করেছেন। একটি স্বাধীন দেশে মাওলানা মামুনুল হকের মত ওয়াজিদের এরকম মা’রমুখী আচরণ ও ক’পটতা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিচের ভিডিও ক্লিপসমূহ মনযোগ দিয়ে দেখলেই তার মতাদর্শ ও স্ব-বিরোধী আচরণের সত্যতা পাওয়া যাবে।

শান্তির ধর্ম ইসলামের আবরণে যে বা যারা উ’গ্রনীতি অবলম্বন করে দেশে অ’রাজকতা সৃষ্টি করতে চায় তাদেরকে দেশের প্রচলিত আইনের আওয়তায় এনে উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। একই সাথে তাদের আয়ের উৎস ও উ’স্কানিমূলক বক্তব্যে মদদদাতাদের খুঁজে বের করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পরামর্শ দিচ্ছি।

আসুন, সবাই মিলে দেশে অ’রাজকতা সৃষ্টিকারী ও স্বাধীনতা বিরোধী এই সকল পরাজিত শক্তিকে সামাজিক ভাবে বয়কট করি। শান্তির ধর্ম ইসলামকে এদের মত উ’গ্রপন্থীদের হাত থেকে সুরক্ষা করি। মনে রাখবেন, সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের দেশে উ’গ্রপন্থী আচরণের কোন সুযোগ নেই। শান্তির ধর্ম ইসলাম উ’গ্রনীতিকে সমর্থন করেনা, করতে পরেও না।

ভিডিও-১:

ভিডিও-২:

লেখক: মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ

শেয়ার করুন !
  • 376
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply