ডেভিড ফ্রস্টের সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু- “আমি তাদের নেতা, আমি সংগ্রাম করব, পালাবো কেন?”

0

সময় এখন ডেস্ক:

১৯৭২ সালের জানুয়ারি, ঢাকা। ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্টস’-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের অনুলিখন সন্নিবেশিত হয়। পাকিস্থান থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ঢাকায় এই সাক্ষাৎকার গৃহীত হয়।

১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনের ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারটি প্রদর্শিত হয়-

ডেভিড ফ্রস্ট: সে রাতের কথা আপনি বলুন। সেই রাত, যে রাতে একদিকে আপনার সঙ্গে যখন চলছিল আলোচনা এবং যখন সেই আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্থানের সামরিক বাহিনী আক্র’মণে ঝাঁ’পিয়ে পড়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল, সেই রাতের কথা বলুন। সেই ২৫ মার্চ, রাত ৮টা। আপনি আপনার বাড়িতে ছিলেন। সেই বাড়িতেই পাকিস্থানি বাহিনী আপনাকে গ্রেপ্তার করেছিল।

আমরা শুনেছিলাম, টেলিফোনে আপনাকে সাবধান করা হয়েছিল, সামরিক বাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করেছে। কিন্তু আপনি আপনার বাড়ি পরিত্যাগ করলেন না। আপনি গ্রেপ্তার হলেন। কেন আপনি নিজের বাড়ি ছেড়ে অপর কোথাও গেলেন না এবং গ্রেপ্তারবরণ করলেন? কেন এই সিদ্ধান্ত? তার কথা বলুন।

শেখ মুজিবুর রহমান: হ্যাঁ, সে এক কাহিনি। তা বলা প্রয়োজন। সে সন্ধ্যায় আমার বাড়ি পাকিস্থানি সামরিক জান্তার কমান্ডো বাহিনী ঘেরাও করেছিল। ওরা আমাকে হ’ত্যা করতে চেয়েছিল। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে ওরা আমায় হ’ত্যা করবে এবং প্রচার করে দেবে, তারা যখন আমার সঙ্গে রাজনৈতিক আপসের আলোচনা করছিল, তখন বাংলাদেশের চরম’পন্থিরাই আমাকে হ’ত্যা করেছে। আমি বাড়ি থেকে না বেরুনো নিয়ে চিন্তা করলাম। আমি জানতাম, পাকিস্থানি বাহিনী এক ব’র্বর বাহিনী। আমি জানতাম, আমি আত্ম-গোপন করলে ওরা দেশের সমস্ত মানুষকেই হ’ত্যা করবে। এক হ’ত্যাযজ্ঞ ওরা সমাধা করবে। আমি স্থির করলাম, আমি ম’রি, তাও ভালো, তবু আমার প্রিয় দেশবাসী রক্ষা পাক।

ফ্রস্ট: আপনি হয়তো কলকাতা চলে যেতে পারতেন।

শেখ মুজিব: আমি ইচ্ছা করলে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দেশবাসীকে পরিত্যাগ করে আমি কেমন করে যাব? আমি তাদের নেতা। আমি সংগ্রাম করব। মৃ’ত্যুবরণ করব। পালিয়ে কেন যাব? দেশবাসীর কাছে আমার আহ্বান ছিল, তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোল।

ফ্রস্ট: আপনার সিদ্ধান্ত অবশ্যই সঠিক ছিল। কারণ এ ঘটনাই বিগত ৯ মাস ধরে বাংলাদেশের মানুষের কাছে আপনাকে তাদের একটি বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত করেছে। আপনি তো এখন তাদের কাছে প্রায় ঈশ্বরবৎ।

শেখ মুজিব: আমি তা বলিনি। কিন্তু এ কথা সত্য, তারা আমাকে ভালোবাসে। আমি আমার বাংলার মানুষকে ভালোবেসেছিলাম। আমি তাদের জীবনকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হা’নাদার ব’র্বর বাহিনী আমাকে সে রাতে আমার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করল। ওরা আমার নিজের বাড়ি ধ্বং’স করে দিল। আমার গ্রামের বাড়ি, যেখানে ৯০ বছরের বৃদ্ধ পিতা এবং ৮০ বছরের বৃদ্ধা জননী ছিলেন, গ্রামের সে বাড়িও ধ্বং’স করে দিল। ওরা গ্রামে ফৌজ পাঠিয়ে আমার বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বি’তাড়িত করে তাদের চোখের সামনে সে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল।

বাবা-মার আর কোনো আশ্রয় রইল না। ওরা সব কিছুই জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, আমাকে পেলে ওরা আমার হতভাগ্য মানুষদের হ’ত্যা করবে না। কিন্তু আমি জানতাম, আমাদের সংগঠনের শক্তি আছে। আমি একটি শক্তিশালী সংগঠনকে জীবনব্যাপী গড়ে তুলেছিলাম। জনগণ তার ভিত্তি। আমি জানতাম, তারা শেষ পর্যন্ত ল’ড়াই করবে। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রতি ইঞ্চিতে তোমরা ল’ড়াই করবে। আমি বলেছিলাম, হয়তো এটাই আমার শেষ নির্দেশ।

ফ্রস্ট: আপনাকে ওরা ঠিক কীভাবে গ্রেপ্তার করেছিল? তখন তো রাত ১-৩০ ছিল? তাই নয় কি? তখন কী ঘটল?

শেখ মুজিব: ওরা প্রথমে আমার বাড়ির ওপর মেশিনগানের গু’লি চালিয়েছিল।

ফ্রস্ট: ওরা যখন এলো, তখন আপনি বাড়ির কোনখানটাতে ছিলেন?

শেখ মুজিব: এই যেটা দেখছেন, এটা আমার শোবার ঘর। আমি এই শোবার ঘরেই তখন বসেছিলাম। এদিক থেকে ওরা মেশিনগান চালাতে আরম্ভ করে। তারপর এদিক, ওদিক সব দিক থেকে গু’লি ছুড়তে আরম্ভ করে। জানালার ওপর গু’লি চালায়।

ফ্রস্ট: এগুলো সব তখন ধ্বং’স হয়ে গিয়েছিল?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, সব ধ্বং’স করেছিল। আমি তখন আমার পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ছিলাম। একটা গু’লি আমার শোবার ঘরে এসে পড়ে। আমার ৬ বছরের ছোট ছেলেটি বিছানার ওপর তখন শোয়া ছিল। আমার স্ত্রী এই শোবার ঘরে ২টি সন্তানকে নিয়ে বসেছিলেন।

ফ্রস্ট: পাকিস্থানি বাহিনী কোন দিক দিয়ে ঢুকেছিল?

শেখ মুজিব: সব দিক দিয়ে। ওরা এবার জানালার মধ্য দিয়ে গু’লি ছুড়তে শুরু করে। আমি আমার স্ত্রীকে দুটি সন্তানকে নিয়ে বসে থাকতে বলি। তারপর তার কাছ থেকে উঠে আমি বাইরে বেরিয়ে আসি।

ফ্রস্ট: আপনার স্ত্রী কিছু বলেছিলেন?

শেখ মুজিব: না, কোনো শব্দ উচ্চারণের তখন অবস্থা নয়। আমি শুধু তাকে একটি বিদায় সম্বোধন জানিয়েছিলাম। আমি দুয়ার খুলে বাইরে ওদের গু’লি বন্ধ করতে বলেছিলাম। আমি বললাম, ‘তোমরা গু’লি বন্ধ কর। আমি তো এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তোমরা গু’লি করছ কেন? কী চাও তোমরা?’ তখন চারদিক থেকে ওরা আমার দিকে ছুটে এলো, বেয়নেট উদ্যত করে। ওদের একটা অফিসার আমাকে ধরল। ওই অফিসারই বলল, ‘এই! ওকে মে’রে ফেলো না।’

ফ্রস্ট: একটা অফিসারই ওদের থামিয়েছিল?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, ওই অফিসারটি থামিয়েছিল। ওরা তখন আমাকে এখান থেকে টেনে নামাল। ওরা পেছন থেকে আমার গায়ে, পায়ে ব’ন্দুকের কুদো দিয়ে মা’রতে লাগল। অফিসারটা আমাকে ধরেছিল। তবু ওরা আমাকে ধাক্কা দিয়ে টেনে নামাতে লাগল। আমি বললাম, ‘তোমরা আমাকে টানছ কেন? আমি তো যাচ্ছি।’ আমি বললাম, ‘আমার তামাকের পাইপটা নিতে দাও।’ ওরা একটু থামল। আমি ওপরে গিয়ে আমার তামাকের পাইপটা নিয়ে এলাম। আমার স্ত্রী তখন দুটি ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাকে কিছু কাপড়-চোপড়সহ একটি ছোট সুটকেস দিলেন। তাই নিয়ে আমি নেমে এলাম। চারদিকে তখন আগুন জ্বলছিল। আজ এই যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকে ওরা আমায় নিয়ে গেল।

ফ্রস্ট: আপনার ৩২নং ধানমন্ডি বাড়ি থেকে সেদিন যখন আপনি বেরিয়ে এলেন, তখন কি ভেবেছিলেন, আর কোনো দিন এখানে ফিরে আসতে পারবেন?

শেখ মুজিব: না, আমি তা কল্পনা করতে পারিনি। আমি ভেবেছি, এই-ই শেষ। কিন্তু আমার মনের কথা ছিল, আজ আমি যদি আমার দেশের নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে ম’রতে পারি, তা হলে আমার দেশের মানুষের অন্তত লজ্জার কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু আমি ওদের কাছে সারেন্ডার করলে, আমার দেশবাসী পৃথিবীর সামনে আর মুখ তুলে তাকাতে পারবে না। আমি ম’রি, তা-ও ভালো। তবু আমার দেশবাসীর যেন মর্যাদার কোনো হানি না ঘটে।

ফ্রস্ট: শেখ সাহেব, আপনি একবার বলেছিলেন, ‘যে মানুষ ম’রতে রাজি, তুমি তাকে মা’রতে পার না।’ কথাটি কি এমনই ছিল না?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, আমি তাই মনে করি। যে মানুষ ম’রতে রাজি, তাকে কেউ মা’রতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হ’ত্যা করতে পারেন। সে তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হ’ত্যা করতে পারেন? না, তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস। আমি একজন মুসলমান এবং একজন মুসলমান একবারই মাত্র ম’রে, দুবার নয়। আমি মানুষ। আমি মনুষ্যত্বকে ভালোবাসি। আমি আমার জাতির নেতা। আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি। আজ তাদের কাছে আমার আর কিছু দাবি নেই। তারা আমাকে ভালোবেসেছে। সব কিছু বিসর্জন দিয়েছে। কারণ আমি আমার সব কিছু তাদের জন্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছি। আজ আমি তাদের মুখে হাসি দেখতে চাই। আমি যখন আমার প্রতি আমার দেশবাসীর স্নেহ-ভালোবাসার কথা ভাবি, তখন আমি আবেগাপ্লুত হয়ে যাই।

ফ্রস্ট: পাকিস্থানি বাহিনী আপনার বাড়ির সব কিছুই লু’ট করে নিয়েছিল?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, আমার সব কিছুই ওরা লু’ট করেছে। আমার ঘরের বিছানাপত্র, আলমারি, কাপড়-চোপড় সব কিছুই লু’ণ্ঠিত হয়েছে। মিস্টার ফ্রস্ট, আপনি দেখতে পাচ্ছেন, এ বাড়ির কোনো কিছুই আজ নেই।

ফ্রস্ট: আপনার বাড়ি যখন মেরামত হয়, তখন এসব জিনিস লু’ণ্ঠিত হয়েছে, না পাকিস্থানিরা সব লু’ণ্ঠন করেছে?

শেখ মুজিব: পাকিস্থানি ফৌজ আমার সব কিছু লু’ণ্ঠন করেছে। কিন্তু এই ব’র্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, আমার সন্তানদের দ্রব্যসামগ্রী লু’ণ্ঠন করেছে, তাতে আমার দুঃখ নেই। আমার দুঃখ, ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লু’ণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল। আমার একটি সুন্দর লাইব্রেরি ছিল। ব’র্বররা আমার প্রতিটি বই আর মূল্যবান দলিলপত্র লু’ণ্ঠন করেছে। সব কিছুই পাকিস্থানি হা’নাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।

ফ্রস্ট: তাই আবার সেই প্রশ্নটা আমাদের সামনে আসে কেন ওরা সব কিছু লু’ণ্ঠন করল?

শেখ মুজিব: এর কী জবাব দেব? আসলে ওরা মানুষ নয়। কতগুলো ঠ’গ, দ’স্যু, উ’ন্মাদ, অ’মানুষ আর অ’সভ্য জানোয়ার। আমার নিজের কথা ছেড়ে দিন। তা নিয়ে আমার কোনো ক্ষো’ভ নেই। কিন্তু ভেবে দেখুন, ২ বছর ৫ বছরের শিশু, মেয়েরা কেউ রেহাই পেল না। সব নিরীহ মানুষকে ওরা হ’ত্যা করেছে। আমি আপনাকে দেখিয়েছি সব জ্বালিয়ে দেওয়া, পোড়াবাড়ি, বস্তি। একেবারে গরিব, না-খাওয়া মানুষ সব বাস করত এই বস্তিতে। বস্তির মানুষ জীবন নিয়ে পালাতে চেয়েছে। আর সেসব মানুষের ওপর চারদিক থেকে মেশিনগান চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হ’ত্যা করা হয়েছে।

ফ্রস্ট: কী আশ্চর্য! আপনি বলেছেন, ওদের ঘরে আগুন দিয়ে ঘর থেকে বার করে, খোলা জায়গায় পলায়মান মানুষকে মেশিনগান চালিয়ে হ’ত্যা করেছে?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, এমনিভাবে গু’লি করে তাদের হ’ত্যা করেছে।

ফ্রস্ট: কোন মানুষকে মা’রল, তার কোনো পরোয়া করল না?

শেখ মুজিব: না, তারা বিন্দুমাত্র পরোয়া করেনি।

ফ্রস্ট: পাকিস্থানে ব’ন্দী থাকাকালে ওরা আপনার বিচার করেছিল। সেই বিচার সম্পর্কে কিছু বলুন।

শেখ মুজিব: ওরা একটা কোর্ট মার্শাল তৈরি করেছিল। তাতে ৫ জন ছিল সামরিক অফিসার। বাকি কয়েকজন বেসামরিক অফিসার।

ফ্রস্ট: আপনার বিরু’দ্ধে কী অভিযোগ আনল ওরা?

শেখ মুজিব: অভিযোগ রাষ্ট্রদ্রো’হিতা, পাকিস্থান সরকারের বিরু’দ্ধে যু’দ্ধ, বাংলাদেশকে স্বাধীনতার ষড়’যন্ত্র আরও কত কী!

ফ্রস্ট: আপনার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন? আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো উপায় ছিল?

শেখ মুজিব: সরকারের তরফ থেকে গোড়ায় এক উকিল দিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন দেখলাম, অবস্থাটা এমনি, যুক্তির কোনো দাম নেই; দেখলাম, এ হচ্ছে বিচারের এক প্রহসন মাত্র, তখন আমি কোর্টে নিজে দাঁড়িয়ে বললাম, জনাব বিচারপতি, দয়া করে আমাকে সমর্থনকারী উকিল সাহেবদের যেতে বলুন। আপনারা বিলক্ষণ জানেন, এ হচ্ছে এক গোপন বিচার। আমি বেসামরিক লোক। আমি সামরিক কোনো লোক নই। আর এরা করছে আমার কোর্ট মার্শাল। ইয়াহিয়া খান কেবল যে প্রেসিডেন্ট, তা-ই নয়। তিনি প্রধান সামরিক শাসকও। এ বিচারের রায়কে অনুমোদনের কর্তা তিনি। এই আদালতকে গঠন করেছেন তিনি।

ফ্রস্ট: সেলের পাশে কবর খোঁড়া দেখে আপনি বুঝতে পেরেছিলেন, ওরা ওখানেই আপনাকে কবর দেবে?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, আমার সেলের পাশেই ওরা কবর খুঁড়ল। আমার চোখের সামনে।

ফ্রস্ট: আপনি নিজের চোখে তাই দেখলেন?

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, আমি নিজের চোখে দেখলাম ওরা কবর খুঁড়ছে। আমি নিজের কাছে নিজে বললাম, ‘আমি জানি, এ কবর আমার কবর। ঠিক আছে। কোনো পরোয়া নেই। আমি তৈরি আছি।’

ফ্রস্ট: ওরা কি আপনাকে বলেছিল, ‘এ তো তোমার কবর?’

শেখ মুজিব: না, ওরা তা বলেনি।

ফ্রস্ট: কী বলেছিল ওরা?

শেখ মুজিব: ওরা বলল, ‘না, না। তোমার কবর নয়। ধর যদি বম্বিং হয়, তা হলে তুমি এখানে শেল্টার নিতে পারবে।’

ফ্রস্ট: সেই সময়ে আপনার মনের চিন্তা কী ছিল? আপনি কি এই সারাটা সময়, ৯ মাস নিজের মৃ’ত্যুর কথা চিন্তা করেছেন?

শেখ মুজিব: আমি জানতাম, যে কোনো দিন ওরা আমায় শেষ করে দিতে পারে। কারণ, ওরা অ’সভ্য, ব’র্বর।

ফ্রস্ট: এমন অবস্থায় আপনার কেমন করে কাটত? আপনি কি প্রার্থনা করতেন?

শেখ মুজিব: এমন অবস্থায় আমার নির্ভর ছিল আমার বিশ্বাস, আমার নীতি, আমার পৌনে ৮ কোটি মানুষের প্রতি আমার বিশ্বাস। তারা আমায় ভালোবেসেছে ভাইয়ের মতো, পিতার মতো। আমাকে তাদের নেতা বানিয়েছে।

ফ্রস্ট: হ্যাঁ, এ কথা আমি বুঝি। স্বাধীনতার জন্য যু’দ্ধরত বাংলাদেশের আপনি নেতা। আপনার প্রথম চিন্তা অবশ্যই আপনার দেশের চিন্তা। পারিবারিক চিন্তা পরের চিন্তা।

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, জনতার প্রতিই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি তো জানি, আমি অমর নই। আজ কিংবা কাল, কিংবা পরশু আমাকে ম’রতে হবে। মানুষ মাত্রই ম’রতে হয়। কাজেই আমার বিশ্বাস, মানুষ মৃ’ত্যুবরণ করবে সাহসের সঙ্গে।

ফ্রস্ট: শেখ সাহেব, আজ যদি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ ঘটে, আপনি তা হলে তাকে কী বলবেন?

শেখ মুজিব: ইয়াহিয়া খান একটা জ’ঘন্য খু’নি। তার ছবি দেখতেও আমি রাজি নই। তার ব’র্বর ফৌজ দিয়ে সে আমার ৩০ লাখ বাঙালিকে হ’ত্যা করেছে।

ফ্রস্ট: ভুট্টো এখন তাকে গৃহব’ন্দী করেছে। ভুট্টো তাকে নিয়ে এখন কী করবে? আপনার কী মনে হয়?

শেখ মুজিব: মিস্টার ফ্রস্ট, আপনি জানেন, আমার বাংলাদেশে কী ঘটেছে? শিশু, মেয়ে, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সবাইকে ওরা হ’ত্যা করেছে। ৩০ লাখ বাঙালিকে ওরা হ’ত্যা করেছে। অন্ততপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ঘরবাড়ি ওরা জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং তারপর সব কিছুকে ওরা লু’ট করেছে। খাদ্যের গুদামগুলোকে ওরা ধ্বং’স করেছে।

ফ্রস্ট: ওরা কী চেয়েছিল?

শেখ মুজিব: ওরা চেয়েছিল, আমাদের এই বাংলাদেশকে একেবারে উপনিবেশ করে রাখতে। আপনি তো জানেন, মিস্টার ফ্রস্ট, ওরা বাঙালি পুলিশ বাহিনীর লোককে, বাঙালি সশ’স্ত্র বাহিনীর সদস্যদের হ’ত্যা করেছে। ওরা বাঙালি শিক্ষক, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, বাঙালি ডাক্তার, যুবক, ছাত্র সবাইকে হ’ত্যা করেছে।

ফ্রস্ট: আমি শুনেছি, যু’দ্ধের শেষ অবস্থাতেও ঢাকাতে ওরা ১৩০ বুদ্ধিজীবীকে হ’ত্যা করেছে।

শেখ মুজিব: হ্যাঁ, সারেন্ডারের মাত্র একদিন আগে। কেবল ঢাকাতেই ১৩০ নয়, ৩০০ মানুষকে ওরা হ’ত্যা করেছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, মেডিকেল কলেজে, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে। কারফিউ দিয়ে মানুষকে বাড়ির মধ্যে আটক করেছে। আর তারপর বাড়িতে বাড়িতে হা’না দিয়ে এসব মানুষকে হ’ত্যা করেছে।

ফ্রস্ট: ইতিহাসের কোন নেতাদের আপনি স্মরণ করেন, তাদের প্রশংসা করেন?

শেখ মুজিব: অনেকেই স্মরণীয়। বর্তমানের নেতাদের কথা বলছিলেন…।

ফ্রস্ট: না, বর্তমানের নয়। কিন্তু ইতিহাসের কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন?

শেখ মুজিব: আমি আব্রাহাম লিংকনকে স্মরণ করি। স্মরণ করি মাও সে-তুং, লেনিন, চার্চিলকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট জন কেনেডিকেও আমি শ্রদ্ধা করতাম…।

ফ্রস্ট: মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

শেখ মুজিব: মহাত্মা গান্ধী, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, কামাল আতাতুর্ক এদের জন্য আমার মনে গভীর শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। আমি ঔপনিবেশিকতার বিরু’দ্ধে সংগ্রামী নেতা ড. সুকর্নকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতাম। এসব নেতাই তো সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নেতা হয়েছিলেন।

ফ্রস্ট: আজ এ মুহূর্তে অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সবচেয়ে সুখী করেছিল?

শেখ মুজিব: আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেদিনটিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন।

ফ্রস্ট: মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার, পৃথিবীর মানুষের জন্য কী বাণী আমি আপনার কাছ থেকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি?

শেখ মুজিব: আমার একমাত্র প্রার্থনা, বিশ্ব আমার দেশের মানুষের সাহায্যে অগ্রসর হয়ে আসুক। আমার হতভাগ্য স্বদেশবাসীর পাশে এসে বিশ্বের মানুষ দাঁড়াক। আমার দেশের মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য যেমন দুঃখ ভোগ করেছে, এমন আত্ম-ত্যাগ পৃথিবীর খুব কম দেশের মানুষকেই করতে হয়েছে। মিস্টার ফ্রস্ট, আপনাকে আমি আমার একজন বন্ধু বলে গণ্য করি। আমি আপনাকে বলেছিলাম, আপনি আসুন। নিজের চোখে দেখুন। আপনি নিজের চোখে অনেক দৃশ্য দেখেছেন। আরও দেখুন। আপনি আমার এই বাণী বহন করুন সবার জন্যই আমার শুভেচ্ছা। আমি বিশ্বাস করি, আমার দেশের কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে এসে বিশ্ব দাঁড়াবে। আপনি আমার দেশের বন্ধু। আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।

ফ্রস্ট: জয় বাংলা! আমিও বিশ্বাস করি, বিশ্ববাসী আপনাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। আপনাদের পাশে এসে আমাদের দাঁড়াতে হবে। নয়তো ঈশ্বর আমাদের কোনো দিন ক্ষমা করবেন না। (সংক্ষেপিত)

শেয়ার করুন !
  • 117
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply