শিবিরের সেই হাছান এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতির শীর্ষস্থানে!

0

সময় এখন ডেস্ক:

তার বেড়ে ওঠা শিবির ক্যাডারের বডিগার্ড হিসেবে, এখন নিজেকে দাবি করেন চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির একজন নিয়ন্ত্রক! গত বুধবার কথা বলার সময়ও তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনে সক্রিয় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ছিলেন। নাম তার মোহাম্মদ হাছান।

রাউজানের উত্তর সর্ত্তা গ্রামে ৩ তলা বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। কক্ষগুলো সাজানো দামি টাইলস ও আসবাবপত্রে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের পেছনে আম্বিয়া সেরিন নামের ভবনে রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ওই ভবনেরই পার্কিংয়ে তার দৃষ্টিনন্দন অফিস। ২য় তলায় গড়েছেন ব্যায়ামাগার। আছে ৩টি দামি গাড়ি- একটি ল্যান্ড ক্রুজার জিপ, একটি হুন্দাই জিপ ও অন্যটি প্রিমিও কার। অথচ দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা বা চাকরি নেই মোহাম্মদ হাছানের।

চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা হাছানকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বলে জানালেও কেন্দ্রে তার ব্যাপক কদর! শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বোঝাতে তাদের সঙ্গে তোলা একগাদা ছবি দিয়ে সাজিয়েছেন নিজের ফেসবুক পেজ, ফ্ল্যাট ও অফিস কক্ষ।

কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারণ করেন সেলফিতে। এর বাইরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন,

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদ, চসিক মেয়রপ্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এমএ সালাম, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথ,

চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান, কেন্দ্রীয় নেতা আমিনুল ইসলামসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক অনেক নেতা এবং ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও রয়েছে তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি।

শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, কোনো একসময় হজে গিয়ে আমার বাবার (এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী) সঙ্গে একটি ছবি তুলেছিল হাছান। পরে সেটি দেখিয়ে সে কাছে আসে। কোমরে একটি পি’স্তল নিয়ে একসময় আমাদের চশমা হিলের বাসায় আসত। কিন্তু তার ব্যাপারে সবকিছু জানার পর তাকে আমার কাছে আসতে, সব ধরনের যোগাযোগ রাখতে মানা করে দিয়েছি।

সে মূলত একজন ধূর্ত প্রকৃতির মানুষ। আমি শুনেছি নাজিরহাট কলেজের প্রিন্সিপ্যাল অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীর হ’ত্যাকারীদের সে ট্যাক্সি চালিয়ে পালাতে সাহায্য করেছিল। চট্টগ্রামে টিংকু (প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু) ভাইয়ের সব ব্যবসাই হাছান হাতিয়ে নিয়েছে।

থানাসূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ হাছানের আছে দুটি বৈধ ফায়ারার্মস। একটি পিয়েত্রো বেরেতা ব্র্যান্ডের ইতালির তৈরি হ্যান্ডগান; লাইসেন্স নম্বর- ৮২১৪/কোতোয়ালি, বডি নম্বর- ৯২৫১০। অন্যটি শটগান; লাইসেন্স নম্বর- ৯২৭৪/কোতোয়ালি, বডি নম্বর- ৬০৩২৫৬৪। তবে একসময় নিজের ফেসবুক ওয়ালে আর্মস হাতে তার একটি ছবি দিয়েছিলেন, যেটি ২০১৫ সালে কেনা লাইসেন্সকৃত দুটির কোনটিই নয়। সেটি মূলত ওয়ালথার পিপিকে ব্র্যান্ডের একটি অত্যাধুনিক হ্যান্ডগান।

ফায়ারার্মস লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬-এর ৩(ঘ) ধারা অনুযায়ী, একটি হ্যান্ডগানের লাইসেন্স পেতে গেলে কমপক্ষে পূর্ববর্তী ৩ করবর্ষে টানা ৩ লাখ টাকা এবং শটগানের জন্য ১ লাখ টাকা আয়কর দিতে হয়। সে ক্ষেত্রে টানা ৩ বছর মোহাম্মদ হাছানের সব মিলিয়ে কমপক্ষে ৪ লাখ টাকা করে আয়কর দেওয়ার কথা।

অথচ ক্রয়ের করবর্ষে অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তিনি সব মিলিয়ে ৮৮ হাজার ৮৯৬ টাকা, ২০১৫-১৬ করবর্ষে ১ লাখ ৯ হাজার ১৮৬ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৯ হাজার, ২০১৭-১৮ করবর্ষে কর দেন ৯৫ হাজার ১৪৮ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হাছান কর দিয়েছেন ৮১ হাজার ৪৪৮ টাকা। যদিও আয়করের কোনো পর্যায়েই ৩টি বিলাসবহুল গাড়ি ও অফিসের কথা উল্লেখ নেই।

চট্টগ্রামের কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রণেরও অভিযোগ রয়েছে সাবেক শিবির ক্যাডার হাছানের বিরু’দ্ধে।

এলাকায় রীতিমতো শক্তি সঞ্চয় করে তা আশপাশের লোকজনকে নিয়মিত জানানও দেন। ২০১৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কলেজের সামনে একদল যুবক প্রকাশ্যে আর্মস নিয়ে মিছিল করে। ওইদিন সন্ধ্যায় পুলিশ সদরঘাটের শাহজাহান হোটেল থেকে ঘটনায় ব্যবহৃত বিদেশি ওই হ্যান্ডগানসহ ইমরান ও শফিউল আজম নামে ২ যুবককে গ্রেপ্তার করে। পরে তারা পুলিশকে জানিয়েছিল, মিছিলে ব্যবহৃত অ’বৈধ হ্যান্ডগানটি মোহাম্মদ হাছানের।

কে এই হাছান: প্রথম যৌবনে রাউজান এলাকায় বেবিট্যাক্সি চালাতেন মোহাম্মদ হাছান। বাবা শামসুল আলম ছিলেন চান্দের গাড়ির লাইনম্যান। ওই সময়েই হাছানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে কু-খ্যাত শিবির ক্যাডার তসলিম উদ্দিন মন্টুর সঙ্গে। এর পর বেবিট্যাক্সি ছেড়ে মন্টুর আশ্রয়ে চলে আসেন হাছান। জড়িয়ে পড়েন শিবিরের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতিতে কর্মকাণ্ডে।

মন্টু ১৯৯৭ সালে ৫টি একে-৪৭, ২টি জিথ্রি রা’ইফেল, একটি এসএমজিসহ মোট ৮টি অ’স্ত্রসহ শিবির নিয়ন্ত্রিত চকবাজার থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী হ’ত্যামামলায় আপিল বিভাগের রায়ে খাটছেন যাবজ্জী’বন জেল। নিম্ন আদালত অবশ্য তাকে ফাঁ’সির আদেশ শুনিয়েছিলেন।

এদিকে মন্টু গ্রেপ্তারের পর হাছান চকবাজার ছেড়ে শরণ নেন রাউজানের আরেক কি’লার শরণ বড়ুয়ার। একদিন তারা দুজন মিলে নিউমার্কেট মোড়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হোসাইন মোহাম্মদ আবু তৈয়বকে শ্যুট করেন। কিন্তু লক্ষ্যভ্র’ষ্ট হয়ে লাগে আবু তৈয়বকে বহনকারী রিক্সাচালকের শরীরে। ঘটনাস্থলেই তার তিনি মা’রা যান।

এ ছাড়া ১৯৯৮ সালে রাউজানে যুবলীগ নেতা কাজল হ’ত্যামামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি ছিলেন মোহাম্মদ হাছান। তদন্ত শেষে পুলিশ তার নামে আদালতে অভিযোগপত্রও দেয়। তবে প্রধান আসামি শরণ বড়ুয়া খু’ন হওয়ায় পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনায় মামলাটি ক্রমেই গুরুত্ব হারায়। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আসামিদের বেকসুর খালাস দেন আদালত।

ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হোসাইন মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন, হাছান ছিল এক কু-খ্যাত শিবির ক্যাডার। এই বেবিট্যাক্সিচালক মূলত শিবিরের কি’লার তসলিম উদ্দিন মন্টুর সহযোগী। দুজন মিলে অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে খু’ন করে। কাজ সেরে পালানোর সময় হাছান নিজেই বেবিট্যাক্সি চালিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। যুবলীগ নেতা কাজল হ’ত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তিনি সরাসরি জড়িত।

১৯৯৮ সালের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবু তৈয়ব বলেন, সেদিন হাছান আমাকে খু’ন করার লক্ষ্যে খুব কাছ থেকে শ্যুট করেছিল। কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিলেন বলে প্রাণে বেঁচে যাই। কিন্তু ঘটনাস্থলেই মা’রা যান আমাকে বহন করা রিক্সাচালক।

জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ১১ ডিসেম্বর নগরীর সদরঘাট ডিলাইট রেস্তোরাঁ থেকে মার্ক-ফোর কাটা রা’ইফেল ও ৮টি গু’লিসহ গ্রেপ্তার হন মোহাম্মদ হাছান। পরবর্তী সময়ে জামিনে বের হয়ে তসলিম উদ্দিন মন্টু, গিট্টু নাছিরসহ শিবির সন্ত্রা’সীরা ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নাজিরহাট কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে নগরীর জামালখানের বাসায় হ’ত্যা করেন।

এই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ২০০২ সালের ২০ আগস্ট নগর গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা থেকে গ্রেপ্তার করে হাছানকে। এ নিয়ে পরদিন স্থানীয় ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ছবিসহ সংবাদও প্রকাশিত হয়।

হাছানের বক্তব্য: নিজেকে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর অনুসারী দাবি করে মোহাম্মদ হাছান বলেন, একসময় রাজনৈতিক প্রতিহিং’সা থেকে কিছু মানুষ আমার পেছনে লেগেছিল। তারাই আমাকে কখনো গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী বা কখনো কাজল হ’ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা করে। আমি বেবিট্যাক্সি চালাতাম, এটা তো অপরাধ হতে পারে না।

ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তৈয়বের ঘটনা প্রসঙ্গে হাছান বলেন, তিনি এ কথা বললে তো আমার কিছু করার নেই। তখন তো তিনি আমার বিরু’দ্ধে মামলা করেননি? অ’বৈধ হ্যান্ডগানসহ ছবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা ঢাকার একটি আর্মসের দোকানে তোলা। কিন্তু ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওটা কোনো বাসার ড্রইংরুম- সে কথার জবাব না দিয়ে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দেন।

রাউজানের এক শীর্ষ নেতা জানান, হাছান উল্টো লাইনের মানুষ। তাই তার রাউজানে প্রবেশ নিষে’ধ। অন্যদিকে জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর এক ঘনিষ্ঠজন জানান, হাছান ছিলেন টিংকুর বাড়ির দারোয়ান। পরে সেই বাড়ি থেকে তিনি সোনাদানা লোপাট করেন। আমাদেরসময়।

শেয়ার করুন !
  • 1.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply