এক যুগ আগে সৃষ্ট কাদের-একরাম দ্বৈরথ, সেতুমন্ত্রীর বই থেকে

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

কাদের মির্জা আর একরাম চৌধুরীকে নিয়ে টালমাটাল আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে একরাম চৌধুরী তার বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তবে কাদের মির্জা আর একরাম চৌধুরীর বিরোধ আসলে ওবায়দুল কাদের-একরাম বিরোধেরই ধারাবাহিকতা।

ওবায়দুল কাদের এবং একরাম চৌধুরীর বিরোধ অনেক পুরনো। ওবায়দুল কাদের তার লেখা ‘যে কথা বলা হয়নি’ গ্রন্থে খোলামেলা এ নিয়ে লিখেছেন। পাঠকের আগ্রহের কথা বিবেচ্য করে বইটির সংশ্লিষ্ট অংশ তুলে ধরা হলো:

মন্ত্রী না হতে পেরে ফেনীর জয়নাল হাজারী আমার উত্থানকে কখনো সুনজরে দেখেননি। একুশের বইমেলায় তার ‘বাঁধনের বিচার চাই’ বইটি বাংলা একাডেমীর কোনো স্টলে বিক্রির অনুমোদন না পাওয়ায় জয়নাল হাজারী তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমার সামান্যতম যোগসূত্র ছিল না। তবু জয়নাল হাজারী আমাকে ভুল বোঝেন এবং আমার বিরু’দ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে বিষো’দগার করেন।

তার সিদ্ধান্তে আমার নির্বাচনী এলাকায় (কোম্পানীগঞ্জ-সদর পূর্বাঞ্চল) ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১১ দিন বাস চলাচলে বি’ঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এলাকার হাজার হাজার লোক সীমাহীন দু’র্ভোগের সম্মুখীন হন। আমি বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেও জয়নাল হাজারীর আক্রো’শ থেকে রেহাই পাইনি।

ইতোমধ্যে আমার এলাকায় আঞ্চলিকতার হাওয়া তুলে প্রতিদ্ব’ন্দ্বিতায় নামানো হয় একরামুল করিম চৌধুরীকে। ঢাকায় ক্ষমতাবান একটি মহলের ইন্ধনে আমি এলাকায় পরবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই। শুনেছি, নোয়াখালীর দুই নেতা ভেতরে ভেতরে একরামকে আমার বিরু’দ্ধে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেন। ফেনী থেকে জয়নাল হাজারীও নাকি তাকে সমর্থন করে উজ্জীবিত করে তোলেন।

এরকম পরিস্থিতিতে এক পর্যায়ে নির্বাচন করার ইচ্ছাই পরিত্যাগ করি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছাকে আমি উ’পেক্ষা করতে পারিনি। আমার সহকর্মী ও বন্ধু আবুল হাসান চৌধুরী অবশ্য শেষ পর্যন্ত নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

সেই থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হাসান চৌধুরী সক্রিয় রাজনীতি থেকেও সরে পড়েন। পয়লা অক্টোবরের পর আমিও কিছুদিন রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনায় ডুবে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার পক্ষে এই সিদ্ধান্তেও অনড় থাকা সম্ভব হয়নি নেত্রীর কারণে।

নির্বাচনের পরের দিন হঠাৎ করে একরামের ফোন। অপরপ্রান্ত থেকে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে বলল, কাদের ভাই, সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বললাম, ভুল তোমারও হয়েছে, আমারও হয়েছে। কাজেই এখন আর ওসব কথা বলে লাভ নেই। পরে অবশ্য সাবের চৌধুরী, বীর বাহাদুর, টুটুল ও আলাউদ্দিন নাসিমসহ কয়েক দিন বৈঠক করার পর একরামের সঙ্গে সমস্যার অবসান ঘটে।

বৈঠকে হানিফ ভাই ও বেলায়েত ভাই সক্রিয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে একরামকে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার মতো বিরল ঘটনাও ঘটে যায়। এতে নেত্রীর প্রথমটা আপ’ত্তি থাকলেও পরবর্তী নির্বাচনী এলাকায় আমার ভবিষ্যৎ নি’ষ্কণ্টক হবে মনে করে সম্মতি দেন।

এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যদিও সঠিক হয়নি। তবুও ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে শেখ হাসিনা বীর বাহাদুরসহ আমাদের অনেকের অনুরোধে সায় দেন। বিষয়টি শুধু নোয়াখালী নয়, অন্যান্য জেলার এ ধরনের সং’কটও নেত্রীর জন্য খুবই বিব্র’তকর বিষয় হয়ে পরে।

একরাম মানুষ হিসেবে বেশ ইমোশনাল ও সেন্টিমেন্টাল। তবে ডায়নামিকও, সেই সাথে ভালো সংগঠক। উচ্চাভিলাষ, হঠ’কারিতা ও আবেগ সংযত করতে পারলে ওর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে।

জেলায় দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমি ঐক্যের এক ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করি। এর ফলে আমাকে কিছু মূল্যও দিতে হয়। কোম্পানীগঞ্জে আমার ছোট ভাই মির্জা দলীয় রাজনীতিতে বেশ ক্ষমতাধর, তবে কর্তৃত্ববাদী। একরামের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে সে ভীষণ ক্ষু’ব্ধ হয়।

একপর্যায়ে থানা আওয়ামী লীগ দ্বিধাবি’ভক্ত হয়ে পড়ে। পরে অবশ্য মির্জা কাদের ও বাবুলসহ সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনকে (২০০৭) সামনে রেখে জেলা আওয়ামী লীগে সং’কট ঘনীভূত হয়ে ওঠে।

নোয়াখালী সদর আসনে একরাম প্রার্থী হওয়ায় দলের একটি অংশ তৎকালীন এলডিপির মেজর (অব.) মান্নানের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। আমি একরামের পক্ষ নিতে গিয়ে জেলা সদর দপ্তরে বিত’র্কে জড়িয়ে পড়ি। জেলা নেতৃত্বের কো’ন্দলের কারণে আমার নিজস্ব এলাকায় নির্বাচনের ওপর প্রভাব না পড়লেও জোট সরকারের ব্যর্থতার পর বিজয়ের অনিবার্য ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে সারাদেশের মতো বৃহত্তর নোয়াখালীতেও বেশ কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্ব’ন্দ্ব ও কোথাও কোথাও প্রার্থী মনোনয়নে ভুল আমাদের বিজয়ের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

শুধু নোয়াখালীর কেন, সারাদেশেই মহাজোট করতে গিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় বেশকিছু এলাকায় আমরা ‘উইনেবল ক্যান্ডিডেট’ দিতে পারিনি। নির’ঙ্কুশ বিজয় নব জোয়ারের মুখে ঠেকানো না গেলেও কাঙ্খিত দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটি পাওয়া বড় কঠিন হতো।

মহাজোটের মধ্যেও প্রার্থী বাছাইপ্রক্রিয়া নি’র্বিবাদে সম্পন্ন করা একরকম অ’সম্ভবই ছিল। কিছু আসন বাদ দিয়ে দেশের অধিকাংশ আসনে মনোনয়নপত্র জমাদানকারীর অতিরিক্ত সংখ্যা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (যে কথা বলা হয়নি : পৃষ্ঠা ১২১-১২২, সময় প্রকাশনী: ২০০৯)। বাংলাইনসাইডার।

শেয়ার করুন !
  • 185
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply