‘বগুড়ার রহস্যময় সেই জোড়-পাথর মিলিত হচ্ছে ধীরে ধীরে’

0

ফিচার ডেস্ক:

অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে রহস্যময় জোড়-পাথর নিয়ে। গ্রামে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে এই রসহ্যময় জোড়-পাথরের কথা। যাতে মিশে আছে অলৌকিক বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসে জোড়-পাথর দিন দিন আরও রহস্যের ধূম্রজাল তৈরি করছে।

ঘটনাস্থল বগুড়া জেলা শহর থেকে আরও ৩৫ কি.মি. ভেতরে সোনাতলা উপজেলা। সেখান থেকে আরও ১০ কি.মি. ভেতরে গেলেই কাবিলপুর ও গড়ফতেহপুর এর মাঝামাঝি এই রহস্যময় জোড়-পাথরের অবস্থান। বাসে করে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তায় সকালের মনোরম দৃশ্য সবাইকে মুগ্ধ করে। বাস থেকে নামার পর এলাকায় জোড়-পাথরের কথা বলতেই সবাই দেখিয়ে দিল। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তা ডানে মাত্র ৩ মিনিটের রাস্তা হাঁটলেই সন্ধান মিলবে রহস্যময় সেই জোড়-পাথরের।

জনমানবহীন এলাকা দেখতেই গা ছমছম করছে। নিথর দাঁড়িয়ে থাকা এই জোড়-পাথরটিকে ঘিরেই বছরের পর বছর রহস্য তৈরী হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে নানান গল্প। জোড়-পাথর সম্পর্কে জানতে চাইলাম স্থানীয়দের কাছে। মতিবালা প্রাং এলাকার প্রবীণ নারী, তিনি বললেন, তালতলার ওই জোড়-পাথরের মাথা দুটি যেদিন এক সঙ্গে লেগে যাবে সেদিন দুনিয়া ধ্বং’স হবে।

ঠিক একই কথায় সুর মেলালেন গ্রামের আরেক নারী মালা বানু। তিনিও জানালেন, কেয়ামত হবে এ দুই পাথর একসঙ্গে লেগে গেলে। তারা নাকি তাদের দাদাদের কাছে এ কথা শুনেছে, আবার তাদের দাদারা শুনেছে তাদের দাদাদের কাছ থেকে।

প্রবীণ লোকজন বলেন, জোড়-পাথরের কাছেই অনেক বড় বাঁশঝাড় ছিল। ঝাড়ের পাশেই নাপিত সম্প্রদায়ের বসতি থাকায় পরিচিতি ছিল নাপিতের আড়া। সন্ধ্যার পর এই রাস্তায় একা চলাচল করতে অনেকেই ভ’য় পেতেন। কখনো শোনা যেত, জোড়-পাথরের ভিতর থেকে কালো বিড়াল বের হয়ে ছুটছে।

আশ্চর্য হলেও সত্য, এলাকার অধিকাংশ মানুষ এসব কথা বিশ্বাস করেন। দিন দিন নাকি এ পাথর দুটি এগিয়ে কাছাকাছি আসছে। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে ও উচ্চতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে পাথর দুটি। মাটি থেকে সমান্তরালভাবে ওপরের দিকে ওঠে যাওয়া দুটি পাথরের মধ্যে পূর্ব দিকের পাথরটির উচ্চতা সাড়ে ৫ ফুট এবং পশ্চিম দিকের পাথরটির উচ্চতা ৫ ফুট। প্রস্থের দিকে ১৪ ইঞ্চি দুটি পাথর।

তবে এদের প্রস্থ নাকি আগে ৬ ইঞ্চি করে ছিল জানালেন, আরেক বয়োজ্যেষ্ঠ ৭০ বছর বয়সী ইলিয়াস কবির। তিনি আরও জানালেন, জনশ্রতি আছে, জোড়-পাথরের স্থান ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বাঙালি নদী থেকে এক সময় কুমির এসে রহস্যময় পাথর দুটিতে শ্রদ্ধাভরে মাথানত করে চলে যেত। সে অনেক আগেকার কথা। তবে পাথরটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তিনিসহ অনেকেই জানালেন।

ছোট্ট একটি তালগাছের নিচে রহস্যময় পাথর দুটি অবস্থিত। তবে এদের সম্পর্কে কেউ সঠিকভাবে কিছু বলতে পারে না। কারও কারও মতে, এ পাথর দুটি পুরাকালে এ অঞ্চলের কোন অধিপতি হাতি বেঁধে রাখতেন। আবার অনেকে এ পাথর দুটিকে প্রকৃতি প্রদত্ত মঙ্গলের প্রতীক মনে করেন। অতীতে জোড়-পাথরের পাশেই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালীমন্দির। বর্তমানে কালীমন্দির অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিকট অতীতেও অনেকে পাথরের ওপর গাভীর দুধ ঢলে দিতেন।

বর্তমানে এ অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের অনেকেই এ পাথর দুটিকে ভক্তি করে থাকেন। কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফল হওয়ার জন্য অনেকেই এ পাথর দুটিকে উদ্দেশ্য করে মানত করেন। তারপর উদ্দেশ্য পূরণ হলে পাথরের পাদদেশে দিয়ে আসে সিঁদুর, ধূপধোঁয়া ইত্যাদি। এক সময় তালতলার নিচে অলৌকিক জোড়-পাথরের পাদদেশে পূজা হতো, মেলা বসত। দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ লোক এসে তাদের মনোবাসনা পূরণের জন্য এখানে জমায়েত হতেন।

গোরস্থানসংলগ্ন কিছুটা উঁচু জায়গায় খাড়াভাবে অবস্থিত ৫ ফুট উচু ২টি রহস্যময় পাথর ঠিক কত বছর আগে থেকে বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের জঙ্গলে আবিষ্কৃত হয়েছে তা অনুমান করে কেউ বলতে পারেন না। তবে জোড়-পাথরটির স্থান এ অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্মের লোকজনের কাছে একটি তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা জানালেন, সোনাতলা উপজেলায় বিক্ষিপ্তভাবে কিছু প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ রয়েছে। জোড়-পাথরের স্থানটি প্রায় ২ বিঘা পরিমাণ জমি নিয়ে বেষ্টিত হলেও এর বেশিরভাগ অংশজুড়ে রয়েছে কবরস্থান। আরেকটি আশ্চর্য বিষয় হলো, সেখানে রয়েছে দুটি ২৫ হাত লম্বা কবর। তারা নাকি স্বামী-স্ত্রী তবে তাদের সম্পর্কেও কেউ-ই সঠিক তথ্য দিতে পারলেন না। তাদের মতে, জোড়-পাথরটি প্রত্নতত্ত্ব সম্পদের একটি প্রাচীন নিদর্শনও হতে পারে।

আবার কেউ কেউ এ পাথর দুটি সম্পর্কে উল্লেখ করেন ভিন্ন একটা বিষয়। অনেক দিন আগের কথা। সে সময় সোনাতলা এলাকাটি ময়মনসিংহের দেওয়ানগঞ্জ থানার অধীনে ছিল। তখন বারভুঁইয়ারা বাংলা শাসন করতেন। বারভুঁইয়ার একজন ঈশা খাঁ বিদ্রোহ করেন দিল্লিশ্বরের বিরু’দ্ধে। বিদ্রোহ দ’মনে সেনাপতি মানসিংহ আসেন বাংলায়। ছাউনি ফেলেন সোনাতলায় কাবিলপুরে।

মানসিংহ যেখানেই যেতেন সেখানেই তার প্রিয় হাতিটা নিয়ে যেতেন। তাই এখানে ছাউনি ফেলার সময় হাতি বাঁধার জন্য দুইটি পাথর পুঁতে সেখানে হাতি বেঁধে রাখতেন এমনটাই নাকি শুনেছেন এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি সুশের দাশ।

তবে তার এ কথার সঙ্গে একমত নন এলাকার আরেক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ইউসুফ সরদার। তিনি বললেন, পীর ফতেহ আলী মতান্তরে ফতেহউল্লা সবসময় ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতেন বলে তিনি ঘোড়া পীর নামে পরিচিত ছিলেন। এই পীর সাহেব এখানেই ঘোড়া বেঁধে রাখতেন বলে জনশ্রতি আছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থানীয় প্রশাসন কিংবা এলাকার কোন সংগঠন থেকে পাথর দুটির ব্যাপারে কোন যত্ন নেয়া হয় না। আর সে কারণে প্রকৃতির এ আশ্চর্য দুটি পাথর অব’হেলায় শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। প্রত্নতত্ত্ব সম্পদের এই আশ্চর্য নিদর্শনসহ আশপাশ এলাকার অনেক সম্পদ সঠিক সংরক্ষণ করার ব্যাপারে অনেক সুধীজন দাবি জানিয়েছেন।

পাথর দুটি যেখানে অবস্থান করছে, সে এলাকাটি অরক্ষিত। এ ব্যাপারে এ এলাকার চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে পাথর দুটির রহস্য উন্মোচনের জন্য তা তোলার ব্যাপারে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এলাকার ধর্মভীরু লোকদের তা আর হয়ে ওঠেনি।

তবে গত ৬ বছর আগে বেলাল নিজেই পাথর দুটির রহস্য জানার জন্য পশ্চিম পাশের পাথরটি মাটি থেকে তুলে ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু পাথরটি কোথা থেকে শুরু তা গভীরভাবে মাটি খননের পরও জানা যায়নি। সেখানে অলৌকিক কিছু পাওয়া যায়নি তবে মাটির নিচে যত খোঁড়া হয়েছে পাথরটি অদ্ভুত লেগেছে সবার কাছে।

বগুড়ার সোনাতলা এলাকার শিক্ষাবিদ ইকবাল কবির লিমন জানান, ফতেহপুর সিক্রি ইতিহাস বিখ্যাত স্থান। প্রাচীন আমলের যু’দ্ধের সময় ব্যবহার হতো বড় কামান। জোড়-পাথর দেখে মনে করা হয় বড় কামান বসানো হয়েছিল সেখানে। সেই থেকে পাথর দুটি রয়ে গেছে। জোড়-পাথরের রঙ বর্তমানে কিছুটা বিবর্ণ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে কথা হয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানার সঙ্গে। তিনি জানান, সোনাতলায় গিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

শেয়ার করুন !
  • 80
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply