বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের পরিবার নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বাড়ি পেল

0

নোয়াখালী সংবাদদাতা:

মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করতে নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়া জাতির সূর্যসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের অসহায় পরিবারকে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে নতুন বাড়ি করে দেওয়া হয়েছে।

নৌবাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল এম আবু আশরাফ জানান, নৌবাহিনীর পক্ষে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫ কক্ষের একটি পাকা বাড়ি আসবাবপত্রে সাজিয়ে শুক্রবার সকালে হস্তান্তর করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ছোট ছেলে শওকত আলী বাড়ির চাবি বুঝে নেন এই নৌ কর্মকর্তার কাছ থেকে।

শওকত বলেন, নতুন পাকা বাড়ি পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছেন পরিবারের সদস্যরা, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। এজন্য সরকার ও নৌবাহিনীর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের জন্ম নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার রুহুল আমিন নগরে।

শওকত বলেন, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর খুলনার রূপসা নদীতে যুদ্ধজাহাজ পলাশে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন আমার বাবা বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন। এরপর রূপসা নদীর তীরে তার দাফন হয়। তাঁর স্মৃতিরক্ষায় ২০০৮ সালে সরকারিভাবে স্থাপন করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। তার পরিবারের দেওয়া ২০ শতক জমিতে নির্মাণ করা হয় স্মৃতি কমপ্লেক্স।

শওকত বলেন, আমরা পুরো পরিবার নিয়ে থাকতাম ১৯৮৫ সালে নৌবাহিনীর দেওয়া একটি ঘরে। পুরনো ঘরটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে অনেক দিন আগে। বিষয়টি নজরে আসার পর নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে পুরনো ঘরের জায়গায় তৈরি করে দেয়া হয় ১,৬৮০ বর্গফুটের এই পাকা বাড়িটি।

নৌ কর্মকর্তা আবু আশরাফ বলেন, জাতির এই বীর সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের পরিবারের জন্য কিছু করতে পেরে আমরা গর্বিত। তাঁর ছেলের চিকিৎসা ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হবে।

নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহে আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আবু ইউছুফ, সোনাইমুড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক কামাল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টিনা পালসহ নৌবাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন প্রর্যায়ের কর্মকর্তারা বাড়ি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ছিলেন।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন সম্পর্কে বিস্তারিত

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের জুন মাসের কোনো এক বর্ষণমুখর রাতে নোয়াখালীর বাঘচাপড়া গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি ছিলেন মোটামুটি স্বচ্ছল গৃহস্থ এবং মাতা জোলেখা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলায় তার পড়াশোনা শুরু হয় পাড়ার মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে, পরে বাঘচাপড়া প্রাইমারি স্কুলে। স্কুল পাশ করে ভর্তি হন আমিষাপাড়া হাইস্কুলে। এসময় তার পিতার আর্থিক স্বচ্ছলতা কমতে থাকে। রুহুল আমিনকে এবার জীবিকা নিয়ে ভাবতে হয়। হাইস্কুল পাশ করে ১৯৫৩ সালে তিনি নৌবাহিনীতে জুনিয়ার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য গমন করেন করাচীর অদূরে মানোরা দ্বীপে পি. এন. এস. কারসাজ-এ (নৌ বাহিনীর কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)।

১৯৫৮ সালে তিনি সফলভাবে পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৫ সালে মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। সফলভাবে কোর্স সমাপনান্তে তিনি ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে তিনি পি. এন. এস. বখতিয়ার নৌ-ঘাঁটি, চট্টগ্রামে বদলি হন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারের মায়া ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন এবং এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে ২নং সেক্টরে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বহু সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।

সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে প্রাক্তন নৌসেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌ বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গঠন করা হয়। পরে তাদের কোলকাতায় আনা হয়। সেখানে সবার সাথে রুহুল আমিনও ছিলেন।

ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে দুইটি টাগবোট উপহার দেয়। এগুলোকে কোলকাতার গার্ডেনরীচ নৌ ওয়ার্কশপে দুইটি বাফার গান ও মাইন পড লাগিয়ে গানবোটে রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। রুহুল আমিন নিয়োগ পান ‘পলাশের’ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার হিসেবে। ৬ ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পাকিস্থানি নৌ-ঘাঁটি পি. এন. এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে ‘পদ্মা’, ‘পলাশ’ ও মিত্র বাহিনীর গানবোট ‘পানভেল’ ভারতের হলদিয়া নৌ-ঘাঁটি থেকে রওনা হয়। ৮ই ডিসেম্বর সুন্দরবনের আড়াই বানকিতে বিএসএফের পেট্রোল ক্রাফট ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাদের বহরে যোগ দেয়। ৯ই ডিসেম্বর কোন বাধা ছাড়াই তারা হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করেন। পরদিন ১০ই ডিসেম্বর ভোর ৪টায় তারা মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকাল ৭টায় কোন বাধা ছাড়াই তারা মংলায় পৌছান।


ছবি: বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন এর সমাধি

পেট্রল ক্রাফট চিত্রাঙ্গদা মংলাতেই অবস্থান নেয় এবং পানভেল, পদ্মা ও পলাশ সামনে অগ্রসর হওয়া আরম্ভ করে। দুপুর ১২টায় তারা খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছান। এমন সময় তাদের অনেক উপরে ৩টি জঙ্গি বিমান দেখা যায়। পদ্মা-পলাশ থেকে বিমানের উপর গুলিবর্ষণ করার অনুমতি চাইলে বহরের কমান্ডার বিমানগুলো ভারতীয় বলে জানান। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বিমানগুলো পদ্মা ও পলাশের উপর গুলি ও ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। পলাশের কমান্ডার সবাইকে গানবোট ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু রুহুল আমিন পলাশেই অবস্থান নেন এবং আপ্রান চেষ্টা চালান গানবোটকে সচল রাখতে। হঠাৎ একটি গোলা পলাশের ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে এবং তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ মুহুর্তে রুহুল আমিন নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং আহত অবস্থায় কোনক্রমে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে পাড়ে অবস্থানরত পাকিস্থানি সেনা ও রাজাকাররা তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করে। পরে তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

শেয়ার করুন !
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply