এত ইস্যু থাকলেও আন্দোলন গড়তে পারছে না কেন সরকারবিরোধীরা?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন রকম চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু আন্দোলন যেন কিছুতেই জমাতে পারছে না বিরোধী দলগুলো। বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকটি বিরোধীদল বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে, কিন্তু আন্দোলনের পালে বাতাস পাচ্ছে না।

তার মানে এই না, সরকারের বিরু’দ্ধে কোনো ইস্যু নেই। অনেকগুলো ইস্যুই তাজা, যা নিয়ে আওয়ামী লীগ যদি এখন বিরোধীদলে থাকতো, তাহলে অনায়াসে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পাড়তো। অনেকেই ঘরোয়া আলোচনা বা চায়ের আড্ডায় বলেন, এরকম ঘটনা যদি আওয়ামী লীগের আমলে ঘটতো তাহলে কী হতো!

যেমন, ধরা যাক মুশতাকের ঘটনাটি। এটি নিয়ে বাম দলগুলো যে আন্দোলনের চেষ্টা করছে, তাতে লোকসংখ্যা দিনকে দিন কমছে। প্রথম দিন যত লোক হয়েছিলো, তার অর্ধেক লোক হয় দ্বিতীয় দিন এবং কমতে কমতে এখন হাতে গোনা ৫/৭ জন এই আন্দোলন করছে। অথচ এটি একটি গুরুতর বিষয়। যে কোনো সরকারের জন্যই এটি বিব্রতকর ইস্যু। কিন্তু বিরোধীদল এটিকে কাজে লাগাতে পারেনি।

আল-জাজিরার প্রতিবেদন নিয়েও বিএনপি ধরি মাছ নাই ছুঁই পানি গোছের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আন্দোলন করবে কি করবে না এ নিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ইস্যুটি ঠান্ডা হয়ে গেছে। জিয়ার বীর উত্তম খেতাব বাতিল নিয়ে বিএনপির আন্দোলনও জমে ওঠেনি। দুই-একদিন প্রেসক্লাবের সামনে জমায়েত করেই বিএনপি আন্দোলন শেষ করতে চেয়েছে।

বিএনপি যেভাবে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে, যেভাবে নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করছে, সেই তুলনায় যদি নূন্যতম আন্দোলন করতে পারত, তাহলে হয়ত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কিছুটা হলেও ভরসা পেতেন।

কিন্তু নির্বাচন নিয়েও বিএনপি কোনাে আন্দোলন করতে পারেনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই প্রশ্ন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতিসহ নানান ইস্যু থাকার পরও কেন বিরোধীদলগুলো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে, নেতৃত্বের সংকট।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তিনি জেল খেটে, নির্যা’তন সহ্য করে পাকিস্থানবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এই আন্দোলনে তিনি আপোষহীনই শুধু ছিলেন না, তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে পেরেছিলেন। জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা অর্জন করে তিনি বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতায় পরিণত হয়েছিলেন।

স্বৈ’রাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় দুই নেত্রীই জনগণের কাছে নেতৃত্বের ইমেজ এবং আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন। আর সে কারণেই হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে ৯ বছরের আন্দোলনের মাধ্যমে হঠাতে সক্ষম হন এই দুই নেত্রী। এখানে কার ক্ষমতা কতটুকু ছিলো, সেটি ভিন্ন বিষয়। তবে এই আন্দোলনে দুই নেত্রীই একটি ব্র্যান্ড হিসেবে জাতির সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন।

খালেদা জিয়াকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছিলো। শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া দাবি পূরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

কাজেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইস্যুর চেয়ে নেতৃত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ। উপুক্ত নেতার নেতৃত্বেই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। নেতার প্রতি আস্থা রেখেই জনগণ আস্থাশীল হতে চায়, আর নেতাকে যখন মানুষ বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে তখনই জনগণ রাজপথে নেমে আসে।

বাংলাদেশে গত ১২ বছরের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে নেতৃত্বের সংকট। খালেদা জিয়া ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাইরে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি তার নিজের ইস্যু ছাড়া অন্য কোনো জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলন করতে পারেননি। তাকে মনে করা হয়েছে, তিনি পুত্রদের ব্যাপারে অন্ধ। এছাড়া যেন তার কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা নেই।

বিএনপি ছাড়া বিভিন্ন ছোট বড় দলের নেতারা কেউই জনগণের কাছে আস্থাশীল ব্যক্তি নন। জাতীয় নেতা বা জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা ইত্যাদি মাফকাঠিতে তারা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নন। আর এই নেতৃত্বের সংকটের কারণেই জনগণ করো ওপর আস্থাশীল হচ্ছে না।

সাম্প্রতিক সময়ে যে কোনো জরিপে দেখা যায়, জনপ্রিয়তার দিক থেকে শেখ হাসিনা এককভাবে সবার ওপরে। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সমালোচনা আছে, ব্যার্থতা আছে। কিন্তু জনগণের মধ্যে শেখ হাসিনার ব্যাপারে আস্থা আকাশচুম্বি। তিনি এখন নেতা হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছেন।

তাঁকে চ্যালেঞ্জ করার মতো উপযুক্ত মানের একজন রাজনৈতিক নেতার অনুপস্থিতির কারণেই সরকারবিরোধী আন্দোলন জমে না। নানান ইস্যুতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের চেষ্টা করা হলেও তাতে জনগণের সাড়া নেই।

অনেকের মতে, জনগণ এখন তাদের জীবন জীবিকার নিয়ে ব্যস্ত। ফলে আন্দোলন হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আসলে আন্দোলনের প্রধান সংকট হলো নেতৃত্বের সংকট। জনগণের আস্থাভাজন নেতার কারণেই দেশে কেনো আন্দোলন নেই। বাংলাইনসাইডার।

শেয়ার করুন !
  • 13
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!