ধুঁকতে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলোকে বাঁচিয়েছে হেফাজতে ইসলাম

0

সময় এখন ডেস্ক:

হেফাজতে ইসলামের অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতাকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর আদালতের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদেরকে রিমান্ডে নিয়েছে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা। জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে ভয়াবহ সব তথ্য। হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বিভিন্ন দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, ২৬ এবং ২৭ মার্চ ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং চট্টগ্রামের যে তা’ণ্ডব চালিয়েছিলো হেফাজতে ইসলাম, তার পেছনে হিজবুত তাহরীর এবং আরো কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সরাসরি ভূমিকা ছিলো। বিএনপি এবং জামায়াতের ক্যাডার বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জঙ্গিরাও নেমেছিল মাঠে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো হেফাজতের আটক নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা ছাড়াও অর্থায়নের জড়িত বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং ব্যক্তি সম্পর্কেও তথ্য পাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩১৩ জনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, শুধুমাত্র বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারাই নয়, ইন্ধন দিয়েছেন দেশের তথাকথিত সুশীল গোষ্ঠীও। হেফাজতের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জঙ্গি সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণ মিলেছে। পাকিস্থানের একটি জঙ্গি সংগঠনের আদলে নিজেদের সংগঠনকে গড়ে তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশকে পাকিস্থান ও আফগানিস্তানের মত উগ্রবাদী রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছিল হেফাজতের লক্ষ্য।

তবে সরকারি সংস্থাগুলো হেফাজতে ইসলামের সাথে আন্তর্জাতিক অন্তত দুটি জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে। সংগঠন দুটোর নাম অফিসিয়ালি প্রকাশ না করলেও একজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন আইএস এবং তালেবান সম্পর্কে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ২০১০ সালে সংগঠনের শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে জঙ্গিদের যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা ছিলো। তবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির কারণে বিষয়টা প্রকাশ্য ছিল না। ২০১৩ সালের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থানের কারণে এই যোগাযোগ কমে আসে।

হেফাজতের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী এবং তার অনুসারীদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ সেভাবে লক্ষ্যণীয় ছিল না। যার ফলে তারা জঙ্গিবাদের চর্চা এবং প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চিন্তাও তাদের ছিল না। তবে জুনায়েদ বাবুনরগী, হারুন ইজহার, মামুনুল হক, নুরুল ইসলাম জেহাদিসহ সমমনারা সব সময়ই জঙ্গিবাদী চিন্তা ভাবনা পোষণ করতেন এবং তাদের নিয়ন্ত্রনাধীন মাদ্রাসাগুলোতেও সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত করা হয়।

২০১৫ সাল থেকেই জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আল্লাহর দল, হুজিসহ বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলো হেফাজতের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে এবং হেফাজতের অনেক নেতাই এই সব জঙ্গি কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হন। হারুন ইজহার এবং তার পিতা ইজহারুল ইসলাম এই উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষ জঙ্গি প্রশিক্ষক। আফগানিস্তান এবং পাকিস্থান থেকে হাতে তৈরী না’শকতার সরঞ্জাম বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন হাজার হাজার জঙ্গিকে।

তার পুত্র সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত হারুন ইজহারও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে হয়ে উঠেছেন শীর্ষ প্রশিক্ষক। চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় তার মাদ্রাসায় ২০১৩ সালে ভারতীয় এবং পাকিস্থানি জঙ্গিরা মিলে প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় বি’স্ফোরিত হয়ে মাদ্রাসার দেয়াল এবং ছাদ উড়ে যায়।

মূলত হেফাজতে ইসলামের এই উগ্রবাদী অংশটার সাথে বিরোধ ছিল আহমদ শফীপন্থীদের। আর সেজন্যই দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তাকে। বাবুনগরী এবং মামুনুল হকরা সংগঠনের ক্ষমতা দখল করার পর সেদিকে পরিচালিত করে মাদ্রাসার লাখ লাখ এতিম অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছাত্রদের। যারা এ পথে নামবে না, তাদের খাবার বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বলছে, হেফাজতের আটক অন্তত ৫ জন নেতার সঙ্গে সরাসরি জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাদের কেউ কেউ জঙ্গি সংগঠনগুলোতে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে, কেউ কেউ জঙ্গি সংগঠনগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা নিয়েছে। আর এই জঙ্গি সংগঠনগুলোই হেফাজতকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আন্দোলন করার জন্য উসকানি দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গি সংগঠনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিলো দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমাগত অভিযানে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো যখন প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে, সে সময় হেফাজতে ইসলামই নিজেদের কাছে আসা ফান্ড এবং জনবল দিয়ে সেই জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পুনরায় জীবন দান করেছে। হেফাজত নেতারাই এই জঙ্গি সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষক এবং মদদদাতা। জঙ্গি সংগঠনগুলোকে আড়ালে রেখে নিজেরাই নেতৃত্ব নিয়েছেন।

২০২০ সালে জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে গঠিত হেফাজতের কমিটিটিতে ছিলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। যারা উগ্র মৌলবাদী, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। সেই নেতারা হেফাজতের ছায়াতলে এসেছিলেন দুটি কারণে। প্রথমত, হেফাজতের সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কাজেই হেফাজতে থাকলে তাদের কর্মকাণ্ডের দিকে নজর যাবে না।

আর দ্বিতীয়ত, হেফাজতের সঙ্গে থাকলে হেফাজতে যে বিপুল পরিমাণ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কর্মী আছে তাদেরকে ওয়ার্কিং ফোর্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, জঙ্গিবাদী কাজে যুক্ত করা যাবে। মাদ্রাসাগুলোতেও উগ্রবাদী তত্ত্বের চর্চা হবে। আর এসব কারণেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতে, হেফাজতকে যথাযথভাবে দমন করা গেলে দেশে জঙ্গিবাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!