‘হেফাজতকে রেলের ৩২ কোটি টাকার জমি সরকারের উপহার’ গুজবের নেপথ্যে

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

হেফজতে ইসলামকে হাতে রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩২ কোটি টাকা মূল্যের জমি উপহার দিয়ে দেয়া হয়েছে- এমন একটা রাজনৈতিক বক্তব্য বিরোধী মহলে ব্যাপক প্রচলিত। ১০ বার একটি মিথ্যাকে প্রচারের মাধ্যমে সত্যে পরিণত করার গোয়েবলসীয় পদ্ধতিটাই ব্যবহার করেছে সরকারবিরোধী পক্ষ। বিএনপি, জামায়াত তো বটেই, ৫/৭ জন বিশিষ্ট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাম-ডান সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো পর্যন্ত এমন মতবাদের প্রচারকারী।

মূলত সত্যকে ট্যুইস্ট করে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিমূলক কিছু তথ্যের সমন্বয়ে দৈনিক মানবজমিন, প্রথম আলোসহ বেশ কিছু পত্রিকা পরস্পরকে উদ্ধৃত করে প্রায়ই এমন প্রচারণা চালায়। আর সেসবকে রেফারেন্স হিসেবে বেছে নিয়ে সরকারের ‘হেফাজত তোষণ’ শীর্ষক একটি রাজনৈতিক ডিস্কোর্সের জন্ম নেয়। আসুন একটু তত্ব-তালাশ করি, আসল ঘটনা কী?

আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম ওরফে হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ রেলের জায়গা নিয়ম বহির্ভূতভাবে দখলে নেয়ার জন্য অনেক বছর ধরেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনকি এজন্য আদালতে মামলা দায়েরের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। চট্টগ্রাম আদালতের হাটহাজারী সহকারী জজ আদালতে ঘোষণা ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার জন্য অপর মামলা (নং- ২৫৪/২০১৩) দায়ের করা হয়েছিল। মামলাটি এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।

এই মামলার বাদী ছিলেন মাদ্রাসার মহাপরিচালক প্রয়াত শাহ আহমদ শফী। এ মামলার মাধ্যমে রেল কর্তৃপক্ষসহ ওই এলাকায় থাকা বৈধ লিজ গ্রহীতাদেরও বিবাদী করা হয়েছে। রেলওয়ে ভূসম্পত্তি লিজ প্রদান বিধিমালা অনুযায়ী রেলের ভূমি বরাদ্দ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অ’বৈধভাবে রেলভূমি দখলে রাখা ও লিজ প্রাপ্তির আবেদনটি সম্পূর্ণ অ’বৈধ বলে রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা ও প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

একটু পেছনে যাওয়া যাক। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে স্বল্প পরিসরে হাটহাজারী মাদ্রাসাটি পরিচালনা শুরু হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিত্যক্ত ভূমি হিসেবে উল্লেখ করে বাদী রেলভূমি অ’বৈধভাবে দখলে রাখার আবেদন জানিয়েছিল। মাদ্রাসার আবেদন অনুসারে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১ একর ৬০ শতক জায়গা হাটহাজারী মাদ্রাসার নামে রেজিস্ট্রি কবলায় (নং- ৭৩৯, তাং ১৫/৩/১৯৯৩) অনুযায়ী মাদ্রাসার নামে আহমদ শফীর নিকট ভূমিটি হস্তান্তর করেন।

তবে বাদী এই ১ একর ৬০ শতক জায়গার মধ্যে ১৯ শতক জায়গা বিভিন্ন ব্যক্তির ঘরবাড়ি ও অবস্থান রয়েছে বলে দাবি করেন। এমনকি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে এসব জমি থেকে অ’বৈধ দখলদার অপসারণ করে তারপর হস্তান্তর করার দাবিও জানান।

এদিকে, রেলের নিজস্ব লে আউট প্ল্যানের লাইসেন্স করা প্লট রয়েছে হাটহাজারীর আলীপুর এলাকায়। এখানে মোট জায়গার পরিমাণ ১ একর ৩১ শতক। এ জমি লিজ পাওয়ার জন্য রেলের নিকট আবেদন করা হয়। খাজনা পরিশোধ শর্তে বাংলা ১৪২০ এর ৩১ চৈত্র পর্যন্ত খাজনা রেলকে পরিশোধ করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, যা ভোগ দখলেও রয়েছেন মামলার বাদী আহমদ শফী।

একই এলাকার রেলের আরেকটি লে আউট প্ল্যানে ১ একর ৭৩ শতক জায়গা কৃষিভূমি এবং ৮০ শতক জায়গা জমি ও পুকুর বিদ্যমান রয়েছে।

উল্লেখিত এ জায়গাগুলো রেলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির উদ্দিন আহমেদের নামে লিজকৃত ছিল ২০১০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু অ’বৈধভাবে কবির উদ্দিন আহমদ রেলের এ লিজকৃত জায়গা মাদ্রাসার কাছে ছেড়ে দিয়ে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

লিজ বলবত থাকা পর্যন্ত মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এ ভূমির খাজনা পরিশোধ করেছে। ২০১০ সাল পর্যন্ত কবির উদ্দিন আহমেদ এ লিজ গ্রহণ করলেও অ’বৈধভাবে মাদ্রাসার কাছে হস্তান্তরের পর মা’রা যান। যেহেতু ২০১০ সাল পর্যন্ত পুকুর ও জায়গা লিজ বলবত থাকলেও লিজ গ্রহীতার মৃ’ত্যুর কারণে ও রেলের বিধান অনুযায়ী লিজ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই জমির দখল ছাড়েনি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১ নভেম্বর আহমদ শফী এই ভূমি লিজের জন্য আবেদন করেন। ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি রেলের পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে অ’বৈধভাবে মামলার বাদী দখলে থাকার বিষয়টি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই আহমদ শফী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা পাহাড়তলীর দপ্তরে যোগাযোগ করে উল্লেখিত আবেদনের পক্ষে লিজ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।

পাহাড়তলীর বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রেল যে কোন ভূমি লিজ দেয়ার সময় পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়া কার্যকর করে লিজ গ্রহীতাদের নিকট হস্তান্তর করেন। উল্লেখ্য, মৎস্যচাষের জন্য জলাশয় বা পুকুর পাড় ৫ বছর মেয়াদে লিজ প্রদান করার বিধান রয়েছে।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুলাই মাহবুবুল আলম তালুকদার ও মো. মুসার নামে ১ একর ৩০ শতক জায়গা লিজ দেয়া হয়। বাংলা ১৪১৫ থেকে ১৪১৯ সাল পর্যন্ত এবং বাংলা ১৪২০ থেকে ১৪২১ সাল পর্যন্ত প্রত্যেকের নামে ১১ হাজার ৮০১ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে গ্রহণ করে হাটহাজারী স্টেশন এলাকার এই ভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই এবং ২৬ আগস্ট লিজকৃত জায়গার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার চেষ্টা চালান আহমদ শফী। অবশেষে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে রেল ভূমি দখলে রাখতে এই অপর মামলাটি করা হয়েছিল।

এ মামলায় হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক প্রয়াত আহমদ শফী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা/ পূর্ব, প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা/ পূর্ব, রেলের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক, হাটহাজারীর আলীপুর এলাকার প্রয়াত মো. সুলতানের ছেলে আবুল কালাম, হাটহাজারী রেল স্টেশনের দক্ষিণ পাশের খান মনজিলের শাহ আলম,

হাটহাজারি ফটিকা এলাকার অলি মিয়ার পুত্র মুসা মিয়া ও উত্তর মার্দাশা বদিউল আলম হাট এলাকার প্রয়াত সুলতান আহমদ তালুকদারের পুত্র মাহবুবুুল আলম তালুকদারের নামে এ মামলাটি দায়ের করেছেন।

মূলত এই পুরো ঘটনায় এটাই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, উল্লেখিত রেলের জায়গাগুলো বৈধভাবে লিজ নিতে পারেননি হাটহাজারী মাদ্রাসার পরিচালক আহমদ শফী। বরং তিনি রেলেরই একজন কর্মকর্তার লিজ নেয়া জমি অনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নিজের দখলে নেন। রেলে কর্মরত একজন কর্মকর্তা কীভাবে রেলের জমি লিজ পেলেন সেটা আরেক অত্যাশ্চর্য বিষয়; সেই ব্যক্তির জমি ভোগ দখল করছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সরকারি সংস্থা রেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বছরের পর বছর এভাবে জমি বেদখল হয়ে আছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের হাতে। কেন সংস্থাটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বিরু’দ্ধে, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এখনই সময়।

দেশজুড়ে না’শকতা চালানোর দায়ে একে একে হেফাজতের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। দেশবিরোধী চক্রান্তের তথ্য প্রমাণও ইতিমধ্যে উঠে এসেছে। সে সময় জানা গেছে হাটহাজারী মাদ্রাসায় ৪০০ রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে গোপনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। তাদেরকে মেস, ডাইনিংসহ বিভিন্ন জায়গায় চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কেউ রাত বিরাতে পুরো এলাকা ঘিরে পাহারার কাজ করছে, আর কিছু রোহিঙ্গা সেখানে পড়ালেখাও করছে।

রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার এই সুদূরপ্রসারী এবং দেশবিরোধী চক্রান্তের মূলোৎপাটন করা জররী। কওমি মাদ্রাসাগুলোতে সরকারে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এখানে উগ্রবাদী সিলেবাস এবং পাঠ্যসূচিতে পাঠদান করা হয়। যেখানকার অধিকাংশ বই-ই পাকিস্থানের বিভিন্ন লেখকের লেখা।

হেফাজত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী, মামুনুল হক, হারুন ইজহারদের পাকিস্থান সংশ্লিষ্টতা, পাকিস্থান ও ভারতসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সাথে সখ্যতা, বিভিন্ন থানা দখল করে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া, তালেবান শাসনের মত দেশে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালানোর নীল নকশা, বিদেশ থেকে বিপুল অংকের অর্থায়ন- এ সবই যখন তদন্তে পরিস্কারভাবে বেরিয়ে এসেছে, সে সময় হেফাজতে ইসলামকে জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেমগণ।

সরকারের হেফাজত তোষণ- অপপ্রচারের আড়ালে হেফাজতকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টাসহ সকল ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন !
  • 412
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!