বাবুল বনাম বনজ: নার্ভের লড়াইতে কে জিতবে?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

বাবুল আখতার পুলিশের সাবেক কর্মকার্তা। বর্তমানে স্ত্রী মিতু হ’ত্যামামলার প্রধান আসামি। ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে মিতুকে হ’ত্যারপর স্বামী বাবুল আখতার ছিলেন এই মামলার বাদি। বাদি থেকে তিনি এখন আসামিতে পরিণত হয়েছেন। পুলিশের চাকরির ক্যারিয়ারজুড়ে ঈর্ষণীয় সাফল্যের রেকর্ডধারী, রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত দুঃসাহসী কর্মকর্তা বাবুল আখতারের এই চেহারা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।

আর অন্যদিকে পুলিশের অনুসন্ধান ও দক্ষতার বেঞ্চমার্ক প্রতিষ্ঠান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবআই) প্রধান- ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার, যার হাত ধরে পুলিশের এই সংস্থাটি আজ দেশের আস্থার প্রতীক, ক্লুলেস মামলাগুলোর প্রধান ভরসা।

সাবেক এসপি বাবুল আখতার এবং ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারের নার্ভের লড়াইয়ের হার-জিতের ওপর নির্ভর করছে এই মামলার সমাধান। ৫ দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে বাবুল আখতারের।

কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল আখতার তেমন কোনো তথ্য দেননি বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তারা। একবারের জন্যও বাবুল আখতারের মনোবলে চিড় ধরাতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। তদন্তে অগ্রগতি হয়- তেমন কোনো তথ্যও বেরিয়ে আসেনি ৫ দিনে।

বরং এই সময়ে বাবুল আখতার তার ইস্পাত দৃঢ় নার্ভের পরিচয় দিয়েছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ এনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।

যেমন ২০১৬ সালে ঘটনার সময় তার কান্না দেখে দেশের মানুষ বিচলিত হয়েছিলেন, তার প্রতি সহানুভূতি জেগে উঠেছিল সবার। ঠিক তেমনি এখন তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরকে তিনি তার সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে- এ নিয়ে সংশয় এবং উৎকণ্ঠা দেখাচ্ছেন।

এই মামলায় তার নামে উত্থাপিত অভিযোগ নিয়ে তিনি তেমন কোনো কথাই বলেননি। বরং তিনি বারবার শুধু বলছেন, আপনারা (তদন্তকারী দল) সবই জানেন। তাই মামলার সমাধানও আপনাদের হাতে।

তবে পিবিআইসহ অপর কয়েকটি সংস্থার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, বাবুল আখতার আগের বার পার পেলেও এবার তিনি এত কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। পিবিআই বাবুল আখতারের এই মেন্টাল গেমে পরাস্ত হবে না। তাদের মতে, বাবুল অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা। মেধাবী, দক্ষ ও পুলিশি তদন্তের নাড়ী-নক্ষত্রের সব কিছুই জানা একজন সেরা পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল। আর এ কারণেই তিনি নার্ভের খেলা খেলছেন।

পিবিআই’র একজন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, বাবুল আখতারের নার্ভ অত্যন্ত শক্ত। জিজ্ঞাসাবাদের কোনো পর্যায়েই কোনো তথ্য প্রকাশ করছেন না। সেই সাথে স্বীকারোক্তিমূলক কোনো কিছুতেও আগ্রহী নন। এটিই তার ইস্পাত দৃঢ় নার্ভের প্রমাণ।

অন্যদিকে ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদারও তুখোড় কর্মকর্তা। পুলিশি সেবা এবং কর্মদক্ষতার বিচারে তিনিও দেশসেরা পুরস্কার পেয়েছেন। রসায়ন এবং প্রকৌশল- দুই শাখার পাশাপাশি গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি অদ্বিতীয়। তিনিও জানেন, বাবুল আখতারকে এত সহজে চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলা যাবে না। সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই চলবে।

তবে পিবিআই’র কর্মপদ্ধতি অপর দুটি পুলিশি তদন্তকারী সংস্থা- ডিবি এবং সিআইডি’র চেয়ে ভিন্ন। বহু বছর পুরনো ক্লুলেস অনেক মামলার জট খুলেছে বনজ কুমার মজুমদারের হাতেই। তাই তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিটি সূত্র নিয়ে কাজ করছে তদন্তকারীরা। তাদের মতে, এই ধাঁধাঁর ছোট ছোট টুকরোগুলো একসূত্রে গাঁথতে পারলেই বাবুল আখতারের নার্ভ নার্ভ তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে।

গতকাল ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, তারা প্রয়োজনে সুইজারল্যান্ডে থাকা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনইচসিআর-এ কর্মরত গায়েত্রী অমর সিংয়ের সঙ্গেও কথা বলবে। গায়েত্রী ইস্যুটি বাবুলের জন্য অত্যন্ত সেনসিটিভ এবং আবেগময়। আর গায়েত্রীর কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গায়েত্রীর যদি তেমন কিছু সরবরাহ করতে পারে, তবে বাবুল আখতার চাপে পড়বেন।

এছাড়াও পিবিআই জোর দিচ্ছে বাবুল-মিতুর দুই সন্তানের ওপর। তাদের বক্তব্য এই মামলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ মুহূর্তে তারা নানার বাড়িতে আছে। বাবুলের শ্বশুর এই মামলার বাদী এবং জামাতার সাজা দাবি করছেন। তাই শিশুদের বক্তব্য হয়ত ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম।

সব মিলিয়ে পিবিআই’র হাতে অনেকগুলো তাস রয়েছে, যাতে বাবুলকে হারিয়ে দেয়া যায় এই নার্ভের খেলায়। এমনটাই আশা করছে তদন্তকারী সংস্থাটি। তবে বাবুল আখতারও নিশ্চয় সবদিক গুছিয়ে রেখেছেন, তার আস্তিনে লুকানো কোনো তাস রয়েছে কি না, কে জানে‍! এই নার্ভের খেলায় কে জেতে, সেটাই দেখার বিষয় এখন।

শেয়ার করুন !
  • 261
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!