❝ত্ব-হা ছিল আমার বাসায়❞

0

সময় এখন ডেস্ক:

তালেবানপ্রেমি উগ্রবাদী বক্তা মো. আফছানুল আদনান ওরফে আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান এর কথিত গুম নাটকের অবসান হয়েছে। তার অনুসারীরা গত ক’দিন নানা রকম গুজব-অপপ্রচার চালিয়েছিল, সরকারী একটি সংস্থা ত্ব-হাকে তুলে নিয়ে গেছে, প্রতিবেশি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের হাত আছে এতে, তাকে ট্র্যাক করে একটি সংস্থার অফিসে পাওয়া গেছে- ইত্যাদি।

নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে তিনি তার মাকে ঢাকায় আছেন বলে জানালেও পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে তার নিজের জেলা রংপুরেই তার প্রথম স্ত্রীর বাড়ি থেকে। তার সন্ধান চেয়ে দেশজুড়ে এত সংবাদ প্রচার এবং আলোচানার পরেও তিনি নিজের অবস্থানের জানান দেননি কাউকে।

মাস তিনেক আগে বিয়ে করা দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন নাহারের সাথে পারিবারিক সমস্যার কারণে কাউকে না বলে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কাজেও। যদিও তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমাগত অনুসন্ধানের পর তাকে বের করে আনে পুলিশ।

এরপর জানা যায়, ত্ব-হা তার ৩ সঙ্গীসহ আত্মগোপনে ছিলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের পশ্চিম পেয়ারাপুর গ্রামের বন্ধু ছিয়াম ইবনে শরীফের বাসায়। সেখানে ৭ দিন অবস্থানের পর গতকাল শুক্রবার (১৮ জুন) সকালে তারা রংপুরে ত্ব-হার শ্বশুরবাড়িতে চলে যান।

তবে ছিয়ামের মা নিশাদ নাহার বলেন, ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা ৭ দিন এই বাড়িতে থাকলেও আশপাশের কেউ জানত না। এমনকি তার ছেলে ছিয়ামও বিষয়টি জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ত্ব-হা এখানে এসে বলল, আমাকে দুজন লোক ফলো করছে, আমরা এখানে কিছুদিন থাকব। আমার ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো কারণ তারা রংপুরে এসএসসি পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছে। তারপর দুজন দুই কলেজে পড়ত। কিন্তু একসঙ্গে চলাফেরা করত। তারপর ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন দুজন একসঙ্গে চলত।

এদিকে আমরা গাইবান্ধায় চলে আসি। এখানে আসার পর আমার ছেলের চাকরি হয়। চাকরি সূত্রে সে রংপুরে থাকে। আর ত্ব-হা আমার বাসায় এর আগে অনেকবার এসেছে।

চারদিকে তাদের নিয়ে তোলপাড়, তারপরও আপনারা কেন জানেননি, এমন প্রশ্নে নিশাদ নাহার বলেন, আসলে এটা আমি ঠিকভাবে জানতে পারিনি কারণ আমার বাসার টিভিটা নষ্ট। আর আত্মীয়স্বজনরা আমাকে ফোনে বলেছে ও তো নিখোঁজ। তারাও বলেছে না জানাতে। আমার ছেলেরও নিষেধ ছিল।

কিন্তু পরে আমি ত্ব-হাকে বলেছি, যেহেতু মিডিয়ায় তোমাদের নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে, তোমরা কিন্তু এবার যেতে পারো। তারপর তারা চলে গেছে।

একই কথা বলেন ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপকমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন জানান।

তিনি বলেন, ১০ জুন রংপুর থেকে ঢাকার পথে রওনা হন আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানসহ আব্দুল মুহিত, ফিরোজ আলম ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন। ঢাকার গাবতলী পৌঁছালে ত্ব-হার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সেখান থেকে আবার গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে চলে যান তারা। সেখানে পূর্বপরিচিত বন্ধু ছিয়ামের বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় বন্ধু ছিয়াম বাসায় ছিলেন না।

এদিকে আবু ত্ব-হাকে রংপুরের শ্বশুরবাড়িতে যেতে দেখা খোকন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমি দেখলাম সে আমার বাড়ির সামনে দিয়া আসতেছে। তখন আমি কাজের মধ্যে ছিলাম। তাকে বললাম, কী ব্যাপার, আপনি এদিক থেকে যাইতেছেন? তখন তিনি বলেন, ‘চুপ কর, চুপ কর। কোনো কথা হবে না। পরে আলাপ হবে।’ এই কথা বলে তখন তিনি চলে গেলেন।

খোকন বলেন, আমি কিছু বললাম না। তখন আমি ওনার বাসায় (শ্বশুরবাড়ি) গেলাম। যাওয়ার পরে ওনার শ্যালিকা বললো, এখন কোনো কথা বলবে না। কালকে ব্রিফিং হবে তখন তিনি কথা বলবেন। এই পর্যন্তই আমি ছিলাম। পরে আমি চলে আসলাম।

আবু ত্ব-হার সঙ্গে আরও যারা নিখোঁজ হয়েছিলেন তারা হলেন আব্দুল মুকিত, মোহাম্মদ ফিরোজ ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজ। আদনানের পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্রে জানা গেছে আদনানের বিভিন্ন ইসলামিক অনুষ্ঠান ও মাহফিলে তারা থাকতেন। এই ৩ জনের সঙ্গে আদনানের সখ্যতা ছিল।

তবে বাড়ি ফেরার সময়ে নীরব ছিলেন আলোচিত আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান। মুখ খোলেননি তার সঙ্গী আব্দুল মুকিত ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজ। এ সময় তারা সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।

নিখোঁজের ৮ দিন পর আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় নিরাপদে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তার মামা আমিনুল ইসলাম। আর আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছেন মা আজেদা বেগম।

তবে ঘটনা পরিক্রমায় পুলিশ জানিয়েছে, আবু ত্ব-হা ও তার সঙ্গীরা নিখোঁজ হননি, তারা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন। এর নেপথ্যে আবু ত্ব-হার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কিছু কারণ রয়েছে। যা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করতে চাইছে না পুলিশ।

এর আগে শুক্রবার (১৮ জুন) দুপুরে তিনি রংপুরের শ্বশুরবাড়িতে উপস্থিত হন বলে জানান কোতোয়ালি থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রশিদ। পরে কোতোয়ালি থানা থেকে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয় থেকে তাদের মহানগর আমলি আদালতে (কোতোয়ালি) নেওয়া হয়। এরপর রাত সোয়া ৯টার দিকে মেট্রোপলিটন জুডিশিয়াল আদালতের বিচারক কে এম হাফিজুর রহমানের কাছে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ, তার সঙ্গী আব্দুল মুকিত ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজ।

কোর্ট ইন্সপেক্টর নাজমুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে জানান, আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানসহ ৩ জনকে রাত সোয়া ৯টার দিকে ডিবি কার্যালয় থেকে আদালতে আনা হয়। সেখানে মেট্রোপলিটন জুডিশিয়াল আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেন। পরে আদালত ‘স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে’ যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এদিকে ফেসবুক ও ইউটিউবে আলোচিত তালেবানপন্থী এই উগ্রবাদী বক্তা আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানসহ তার ৩ সঙ্গীর সন্ধানের দাবি জানিয়ে রংপুরবাসী রংপুর প্রেসক্লাব চত্বরের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন সমাবেশ করে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া না গেলে সারাদেশে গণ-আন্দোলনেরও হুম’কি দিয়েছিলেন তারা।

আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের সন্ধান দাবি করেন দেশের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী বিএনপি নেতা আসিফ আকবর। বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে আবু ত্ব-হার সন্ধান চেয়ে আবেগঘন এক স্ট্যাটাস দেন এই রাজাকারপুত্র।

আদনানকে খুঁজে বের করতে আইনি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। তিনি বলেন, আদনানের পরিবার চাইলে তাকে খুঁজে বের করতে হাইকোর্টে ‘হেবিয়াস কর্পাস’ রিট মামলা করতে চাই। বুধবার (১৬ জুন) ফেসবুক লাইভে এসে তিনি এ ঘোষণা দেন।

আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের সন্ধান দিতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় সোহরাওয়ার্দী শুভ। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও ক্রিকেটার হিসেবে ত্ব-হার নিখোঁজ হওয়ায় তিনি মর্মাহত বলেও জানিয়েছিলেন। বুধবার (১৬ জুন) রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে নিজের অফিসিয়াল ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সন্ধান দাবি করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ১০ জুন রংপুরে ওয়াজ মাহফিল শেষে ঢাকার বাসায় ফেরার পথে আবু ত্ব-হাসহ চারজন নিখোঁজ হন বলে অভিযোগ ছিল। আবু ত্ব-হার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, ঢাকার গাবতলী থেকে তারা নিখোঁজ হন। আবু ত্ব-হার সঙ্গে নিখোঁজ হয়েছিলেন আরও ৩ জন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

এ নিয়ে আবু ত্ব-হার মা আজেদা বেগম রংপুরে কোতোয়ালি থানায় এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন্নাহার সারা ঢাকার পল্লবী থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি করেন। এছাড়াও গাড়িচালক আমির উদ্দিন ফয়েজের ভাই ফয়সাল রংপুরে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

আদনান প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আরবি শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে দর্শন বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কোরআন শিক্ষার জন্য কিছুদিন স্থানীয় একটি মাদরাসায় তালিম নেন।

এ সময় তিনি আহলে হাদিস নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়াও লাইফ ফাউন্ডেশন, আলোর পথ এবং একাডেমিক কোরআন স্টাডিজ নামে সংগঠনে জড়িত রয়েছেন। ঢাকার মিরপুর আল ইদফান ইসলামী গার্লস মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

শেয়ার করুন !
  • 356
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!