৮০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়া নীলগাই ফিরছে!

0

ফিচার ডেস্ক:

এক সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে নীলগাইয়ের অবাধ বিচরণ ছিল। ১৯৪০ সালের আগ পর্যন্ত দেশে অহরহ নীলগাই পাওয়া যেত। বনাঞ্চল উজাড় হওয়া, বসবাসের পরিবেশ হারানো, খাদ্য সংকট ও শিকারের কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমতে কমতে এখন নীলগাইয়ের নাম উঠেছে বিলুপ্ত প্রাণীর তালিকায়। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্থান ও নেপালে নীলগাই পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে বিলুপ্তির তালিকায় থাকা দুটি নীলগাই গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে রয়েছে। এর মধ্যে একটি পুরুষ ও একটি মাদী নীলগাই। এর বাইরে দেশে আর কোথাও নীলগাই নেই।

আশার খবর হচ্ছে, গত ১ আগস্ট সাফারি পার্কে থাকা নীলগাই জুটি থেকে আরোও দুটি নীলগাইয়ের জন্ম হয়েছে। তবে নবজাতক দুটি মাদী না পুরুষ তা এখনও নির্ণয় করা যায়নি। আর নতুন জন্ম নেওয়া শাবক দুটি থেকেই পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮০ বছর আগের বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া নীলগাইয়ের প্রকৃতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখছে।

নতুন জন্ম নেওয়া শাবকের নিরাপত্তা ও প্রকৃতিতে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ থাকায় কর্তৃপক্ষ শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তবিবুর রহমান জানান, ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা গ্রামের মামুদপুর-ঠুঠাপাড়া বর্ডার এলাকার বাসিন্দারা একটি নীলগাই ধরে জবাই করার প্রস্তুতি নেন।

পরে বিজিবি-৫৩ (মামুদপুর বিওপি) এর সদস্যরা ওই মাদী নীলগাইটিকে উদ্ধার করে রাজশাহীর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগে হস্তান্তর করলে নীলগাইটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে আনা হয়।

অপরদিকে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি নওগাঁর মান্দা উপজেলার জোতবাজার এলাকায় অপর একটি নীলগাই আটক করে জবাই করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পরে রাজশাহীর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ স্থানীয় উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় জবাই করার প্রস্তুতির সময় একটি পুরুষ নীলগাই উদ্ধার করে।

পরে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দিয়ে ২০১৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যানে স্থানান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে পুরুষ নীলগাইটি প্রজননের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে আনা হয়।

পার্কের ওয়াইল্ডলাইফ সুপারভাইজার মো. সারোয়ার হোসেন খান জানান, হেমন্ত থেকে শীতকালের শুরুর দিক পর্যন্ত সময়ে তুলনামূলক বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন পুরুষ নীলগাই সম্মতিসূচক লেজ নাড়াচাড়ার পর মাদী নীলগাইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরুষ নীলগাই একাধিক মাদী নীলগাইয়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকে।

গর্ভধারণ কাল গড়ে ২৪৩ দিন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যমজ বাচ্চা প্রসব করে। ক্ষেত্র বিশেষে একটি থেকে ৩টি বাচ্চাও প্রসব করে থাকে। জন্মের ৪০ মিনিটের ভেতর দাঁড়াতে পারে। পুরুষ শাবক ৩ বছর এবং মাদী ৩ বছরে প্রজননক্ষম হয়ে উঠলেও এদের গড় আয়ু ২১ বছর।

তিনি আরও জানান, পুরুষ নীলগাইয়ের বর্ণ গাঢ় ধূসর। অনেকটা কালচে রঙের। অনেক সময় নীলচে আভা দেখা যায় বলে এদের নীলগাই নামকরণ করা হয়েছে। শুধুমাত্র পুরুষ নীলগাইয়ের দুটি কৌণিক, মসৃণ ও সামনের দিকে কিঞ্চিত বাকানো দুটি শিং আছে।

পুরুষের উচ্চতা ৫২-৫৮ ইঞ্চি, শিংয়ের দৈর্ঘ্য ৮-১২ ইঞ্চি। মাদী নীলগাই এবং শাবকের রঙ লালচে বাদামী। কিন্তু খুরের ওপরের লোম সাদা। ঠোঁট, থুতনি, কানের ভেতরের দিক ও লেজের নিচের তলদেশ সাদা।

নীলগাই ছোট ছোট পাহাড় আর ঝোপ-জঙ্গলপূর্ণ মাঠে চরে বেড়াতে ভালোবাসে। ঘন বন এড়িয়ে চলে। সচরাচর ৪ থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়েই নীলগাই ঘুরে বেড়ায়। দলে কখনও ২০ বা তার বেশি সদস্যও থাকতে পারে।

নীলগাই সম্পর্কে সারোয়ার হোসেন খান আরও জানান, নীলগাই গাছে ঢাকা উঁচু-নিচু সমতলে বা তৃণভূমিতে যেমন স্বাচ্ছন্দে বিচরণ করতে পারে, তেমনি আবার শস্যক্ষেত্রে নেমে ব্যাপক ক্ষতি করতে পটু।

সকাল আর বিকেলে খাওয়ার পাট চুকিয়ে দিনের বাকি সময়টা গাছের ছায়ায় বসে কাটায়। মহুয়া গাছের রসালো ফুল এদের দারুণ পছন্দ। পানি ছাড়া এরা দীর্ঘসময় কাটিয়ে দেয়। এমনকি গরমের দিনেও এরা নিয়মিত পানি খায় না।

এদের আত্মরক্ষার প্রধান উপায় দৌড়ে পালানো। দ্রুতগামী ও শক্তিশালী ঘোড়ার পিঠে না চড়ে নীলগাই ধরা প্রায় অসম্ভব। প্রচন্ড দ্রুতগতিতে এরা বন-জঙ্গল, কাঁটাঝোপের ভেতর দিয়ে সুচতুরভাবে দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম। আর গায়ের বর্ণের কারণে এরা সহজেই প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে পারে বলে আশপাশে লুকিয়ে থাকলেও চোখে পড়ে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিউল আলম চৌধুরী বলেন, এই স্ত্রী ও পুরুষ নীলগাইকে জবাই করার পূর্ব মুহূর্তে উদ্ধার করা হয়। সেহেতু বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়ার কারণ সহজেই অনুমান করা যায়।

প্রায় দীর্ঘ ৮০ বছর পর ভারত থেকে চরতে চরতে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে পড়া নীলগাইকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করার পর গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে আনা হয়। এরা জুটি বাঁধার ১১ মাস ১১ দিন পর গত ১ আগস্ট দুটি ফুটফুটে বাচ্চা জন্ম দেয়। বর্তমানে সবাই সুস্থ আছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ নীলগাই শূন্য হলেও ভারতে বিভিন্ন জঙ্গলে লাখের ওপর নীলগাই রয়েছে। সাফারি পার্কে সংরক্ষিত নীলগাই দুটি ভারত সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করার পর সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। আর যদি ১০/২০ মিনিট দেরী হতো তাহলে মাংসের জন্য নীলগাই দুটি জবাই হয়ে যেত।

আক্ষেপ নিয়ে এই প্রকৃতিপ্রেমিক বলেন, বাংলাদেশের শেষ নীলগাইটিকে এভাবেই হত্যা করা হয়েছিল, প্রায় ৮০ বছর আগেই আমরা প্রকৃতি থেকে নীলগাইয়ের সমাপ্তি টেনেছিলাম। ৮০ বছর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের দুটি নীলগাই বাচ্চা জন্ম দিয়েছে।

আমরা আশা করছি বিলুপ্তির তালিকায় থাকা নীলগাই গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের মাধ্যমে আবারও প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে আসবে। বিএনবিডি।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!