কবিরাজের বুদ্ধিতে প্রেম রুখতে মেয়েকে মাদ্রাসা শিক্ষক পিতা ২ বছর অন্ধ কুঠুরিতে বন্দি রাখে‍!

0

দিনাজপুর সংবাদদাতা:

প্রেম এতটাই নিষিদ্ধ বস্তু বিবেচিত হলো যে, কারো সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে সন্দেহ করে তার শাস্তি হিসেবে কবিরাজ ও স্বপ্নে দেখা এক ব্যক্তির পরামর্শে নিজের স্নাতকপড়ুয়া মেয়েকে (২২) অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করে রাখে মাদ্রাসা শিক্ষক পিতা দীর্ঘ ২ বছরের বেশি সময় ধরে।

শুধু তাই নয়, মেয়েকে ৬ মাস ধরে গোসলও করতে দেয়া হয়নি। আলো বাতাসহীন অন্ধকার ঘরে বন্দি থাকায় তার হাত পায়ের আঙুলগুলো গেছে কুঁকড়ে। অপুষ্টির শিকার জীর্ণ-শীর্ণ শরীর, রক্তশূন্যতা, চর্মরোগসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে মেয়েটি। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মেয়েটিকে সেই বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মশিউর রহমান।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বলেন, যে কোনো মুহূর্তে মৃত্যু হতে পারত মেয়েটির।

মেয়েটির মা জানায়, কবিরাজ ও এক স্বপ্ন দেখা পরামার্শদাতার বুদ্ধিতে মেয়েকে ওইভাবে ঘরে আবদ্ধ করে রেখেছিল তার পিতা।

প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই পরিবারের সঙ্গে বিরোধ আছে এমন এক পরিবারের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক হয়েছে সন্দেহে প্রায় আড়াই বছর ধরে ওই ছাত্রীকে তার পরিবার আটকে রেখেছিল। বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকলেও যে ঘরে মেয়েটিকে আটকে রাখা হয়, সেই ঘরে কোনো বিদ্যুৎ–সংযোগ ছিল না। এমনকি ঘরের দরজা-জানালাও তালা দিয়ে রাখা হতো।

ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে, ছাত্রীটির মুখ ও পা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হাতের আঙুলগুলো কুঁকড়ে গেছে। কিছুতেই বসে থাকতে বা দাঁড়াতে পারছেন না। কথা বলতে গেলে শরীর কাঁপুনি হচ্ছে। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছে মেয়েটির শরীর থেকে।

নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন অপচিকিৎসায় ও বদ্ধ ঘরে থাকায় ছাত্রীটির রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সূর্যের আলোয় না আসায় এবং হাঁটাচলা না করায় দেখা দিয়েছে হাড়ক্ষয় রোগ। পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে চর্মরোগ, আর মুখে ফাঙ্গাস। ছাত্রীটি শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। তবে মেয়েটির চিকিৎসা চলছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক নার্স নাসরিন বলেন, ওই তরুণী তাকে জানিয়েছেন, ছয় মাস ধরে তাকে গোসল করতে দেয়া হয়নি।

নবাবগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা ছাত্রীটির খালাতো বোন বলেন, এক বছর ধরে চেষ্টা করেও তিনি তার খালাতো বোনের (ছাত্রীটির) সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, ওই ছাত্রীর চাচা ২ বছর আগে ছাত্রীকে আটক রাখার বিষয়টি জানান। তখন তিনি ওই ছাত্রীর বাড়িতে গেলে তার সঙ্গে কেউ কথা বলেননি।

বন্দিদশা থেকে মুক্তির পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই তরুণী বলেন, রংপুরের একটি স্কুলে মানবিক বিভাগ থেকে তিনি ২০১১ সালে এসএসসি ও নবাবগঞ্জের একটি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষক হতে চান তিনি।

নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মশিউর রহমান বলেন, ২ বছরের বেশি সময় আটকে রাখার খবর পেয়ে ওই ছাত্রীর মাদ্রাসা শিক্ষক বাবাকে ডেকে পাঠাই।

ছাত্রীর বাবা ইউএনওকে জানান, ছাত্রীর মা একক কর্তৃত্বে ছাত্রীটিকে আটক রেখেছেন। এরপর ইউএনও পুলিশ পাঠিয়ে ছাত্রীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। এই সভ্যসমাজে কোনো পরিবার তার সুস্থ–স্বাভাবিক সন্তানকে এভাবে বন্দি করে রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে, তা ভেবে অবাক হয়েছি। মেয়েটিকে সুস্থ করার পর লেখাপড়া শুরু করাবেন তিনি।

মেয়েটিকে উদ্ধারে যাওয়া নবাবগঞ্জ থানার এসআই আতিকুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারে গেলে প্রতিবেশীরা জানান, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ওই ছাত্রীকে আটকে রাখা হয়েছিল। ওই মেয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শেয়ার করুন !
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply