বাংলাদেশে পাকিস্থানের অপতৎপরতা: সতর্ক অবস্থানে ভারত

0

কূটনৈতিক ডেস্ক:

বাংলাদেশের নতুন করে পাকিস্থান অপতৎপরতা শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, পাকিস্থানের কেন্দ্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে গোপনে বিভিন্ন রকম অপতৎপরতা চালাচ্ছে। আর এই খবরের প্রেক্ষিতে ভারত বিষয়টিকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দেশটির কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ভারতীয় দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তাদের মতে, পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশকে ঘিরে অপতৎপরতা চালাচ্ছে প্রধানত দুটি বিষয় নিয়ে।

১. তারা বাংলাদেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের প্রসারের মাধ্যমে দেশে ঘাপটি মেরে থাকা উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে উসকে দিতে চায়। এজন্য তাদেরকে গোপনে মদদ দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি এবং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়।

যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে দেশের ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর। এতে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্থ হবে, দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতি এবং জনমনে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। আর যা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাবে বিএনপি-জামায়াতসহ পাকিস্থানপন্থী রাজনৈতিক মহল।

অতীতেও বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের উত্থানের পেছনে পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। বিএনপি-জামায়াতের আমলে বাংলাদেশের কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদেরকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্থান রাষ্ট্রীয়ভাবে মদদ দেয়। পাকিস্থানি সামরিক বাহিনীর কয়েকটি প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নেয় তারা। এছাড়াও অনেকে আফগানিস্থানে তালেবালদের হয়েও যুদ্ধ করেছে। সেখান থেকে আরও কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ পায় তারা।

পাকিস্থান ও আফগানিস্থান থেকে ফিরে এসে তারা বাংলাদেশে নিজেরা প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলে হাজার হাজার জঙ্গি। যারা দেশকে করে তুলেছিল অস্থিতিশীল এবং ভয়ানক এক জনপদে। সে সময় পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে বিস্তর প্রতিবেদন হলেও খালেদা জিয়া সরকার সবই অস্বীকার করে বলে, জঙ্গি বলে কিছু নাই, সবই মিডিয়ার সৃষ্টি।

ক্রমেই এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো বিকশিত হয়ে অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন নির্বাচনে তারা পাকিস্থানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা দেয়, পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং জেতানোর জন্য অর্থও দেয়। পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান আদালতে জবানবন্দি দিয়ে বলেছিলেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা বিএনপিকে অর্থ যোগান দিয়েছিল।

২. পাকিস্থান বাংলাদেশের মাটিতে বসে অপতৎপরতা চালাতে চায় ভারতকে অস্থিতিশীল করার জন্য। ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সবসময় মদদ দেয় পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত জায়গা।

২০০৮ সালের আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আশ্রয় নিত এবং সেখানে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো, অস্ত্র সরবরাহ করা হতো। সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা ভারতে গিয়ে বিশৃঙ্খলতা তৈরি করার চেষ্টা করত।

যার একটা বড় উদাহরণ হলো উলফার জন্য আনা ১০ ট্রাক অস্ত্র। যা খালাস করার চেষ্টা করা হয় চট্টগ্রামের সিইএফএল সার কারখানার জেটিতে। বিএনপি-জামায়াত সরকারের শিল্পমন্ত্রী ফাঁ’সির সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর নিয়ন্ত্রণাধীন সার কারখানার জেটিতে রাতের আঁধারে নামানো হয়েছিল বিদেশ থেকে আনা ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র। যদিও দেশপ্রেমিক এক পুলিশ কর্মকর্তার কারণে সব আটক হয় সেই রাতে। পরে জানা যায়, পাকিস্থানের অর্থায়নে কেনা এবং বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে এসব অস্ত্র আনা হয়েছিল ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের মাটি কখনই ভারতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের জন্য ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শিকড় উপড়ে ফেলা হয়েছে। এটিই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মূল ভিত্তি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি কারণেই বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করে ভারতের যেকোনো রাজনৈতিক দল এবং যেকোনো সরকার। কারণ ভারত তার নিজের স্বাধীনতা, অখণ্ডতার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যতই মতপার্থক্য থাকুক না কেন ভারতের কোনো রাজনৈতিক দলই বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয় না, মদদও দেয় না।

তাই যখন বিজেপি ক্ষমতায় এলো, তখন এই ঐক্যর সূত্র ধরেই ঐতিহ্যবাহী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো প্রগাঢ় হয়েছিল। আর এখানেই পাকিস্থান আঘাত হানতে চায়, পাকিস্থানের অপশক্তি চায় বাংলাদেশে তাদের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে, যেখানে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিয়ে ভারত সরকারকে চাপে ফেলা যাবে।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই পরিকল্পনায় চীনেরও অংশীদারিত্ব রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার তাদের অবস্থানে অটল। বাংলাদেশ কখনই কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী অপশক্তিকে বাংলাদেশের মাটিতে স্থান দিবে না, এটাই ভারতের স্বস্তির জায়গা। পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থার অপতৎপরতা যাতে বেশি দূর না যায়, সে জন্য ভারতও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেই কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!