যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিএনপির সাবেক এমপি মোমিনের ফাঁসির রায়

0

আইন আদালত ডেস্ক:

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য বগুড়ার আব্দুল মোমিন তালুকদার ওরফে খোকা রাজাকারের ফাঁসির রায় দিয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারকের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বুধবার এ মামলার রায় ঘোষণা করে।

পলাতক আব্দুল মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে আনা ৩টি অভিযোগেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মোমিন তালুকদার। তিনি বগুড়া-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন দুইবার।

রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সিমন ও রেজিয়া সুলতানা চমন মামলাটির শুনানি করেন। আসামিপক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আবুল হাসান।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন সাংবাদিকদের বলেন, এ মামলার ৩টি অভিযোগের একটিতে বলা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল শান্তাহারে পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে হিন্দু জমিদার সুরেন্দ্রনাথ দাসের বাড়িতে আক্রমণ করেন মোমিন।

সেখানে তাকে এবং তার স্ত্রীসহ পরিবারের ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই দিনই আরও ৪ জন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করে তারা।

ট্রাইব্যুনাল এটিকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে রায় দিয়েছেন। গণহত্যার এই অভিযোগসহ ৩টি অভিযোগই আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ৩টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।

আসামির পক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, আব্দুল মোমিন তালুকদার যদি আত্মসমর্পণ করে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন, আমি মনে করি তিনি খালাস পাবেন।

কী অভিযোগ, কী শাস্তি

>> ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে আসামি আব্দুল মোমিন তালুকদারসহ ৫ থেকে ৬ জন স্বাধীনতাবিরোধী ও ২০ জন পাকিস্থানি সেনাসদস্যকে নিয়ে বগুড়া জেলার আদমদিঘী থানার কলসা বাজার, রথবাড়ী এবং তিয়রপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে হত্যা করতে অপারেশন চালান।

ওই দিন আসামি নিজে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে কলসা গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ইসলাম উদ্দিন প্রামানিকসহ হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে ১০ জনকে গুলি করে হত্যা করেন।

এ ঘটনায় আটকে রেখে নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যার অভিযোগে আব্দুল মোমিন তালুকদারকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল।

>> ১৯৭১ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে একই থানার কাশিমালা গ্রামের ১৬ থেকে ১৭টি বাড়ি লুট করেন মোমিন। সেদিন ৫ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, হত্যাসহ সাত ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে মোমিনকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত।

>> ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর রাতে আব্দুল মোমিন তালুকদার রাজাকার ও পাকিস্থানি বাহিনীকে নিয়ে আদমদিঘী থানার তালশন গ্রামে গিয়ে ৪ জনকে হত্যা করেন।

এ ঘট্নায় অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, হত্যাসহ চার ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধে মোমিনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

কে এই মোমিন

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল মোমিন তালুকদার ওরফে খোকার বয়স এখন ৬৯ বছর। তার বাবা আব্দুল মজিদ তালুকদার ছিলেন আদমদীঘি থানা মুসলিম লিগের সভাপতি।

১৯৭১ সালে পাকিস্থানের পক্ষে শান্তি কমিটি গঠিত হলে মজিদ তালুকদার আদমদীঘি থানাতেও শান্তি কমিটি গঠন করেন এবং চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।

এ মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোমিন তালুকদার নিজেও একাত্তরে মুসলিম লিগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। মজিদ তালুকদার স্থানীয় পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী গঠন করলে তার ছেলে মোমিনই প্রথম তাতে যোগ দেন এবং থানার কমান্ডারের দায়িত্ব নেন।

সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতায় বগুড়া ও আদমদীঘিতে যেসব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তার বিবরণ উঠে এসেছে এ মামলার শুনানিতে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে বিএনপিতে যোগ দেন মজিদ তালুকদার। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে তিনি দুই দফা এমপি হন।

বাবার মৃত্যুর এক বছর আগেই ১৯৭৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন মোমিন তালুকদার খোকা। পরে আদমদীঘি উপজেলা বিএনপির সভাপতি হন।

তিনি ২০০১ ও ২০০৮ সালে দুইবার বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোমিন। সে সময় তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির সহসভাপতি এবং রাজশাহী বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও তিনি পেয়েছিলেন।

মামলা বৃত্তান্ত

আদমদীঘি থানার কায়েত পাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ সুবেদ আলী ২০১১ সালের অগাস্টে আব্দুল মোমিন তালুকদার খোকার বিরুদ্ধে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের এ মামলা দায়ের করেন। মোমিন তখনও বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের এমপি।

বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজেস্ট্রেট আদালতে এ মামলা হওয়ার পর তা ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো জয়। ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি তদন্ত শুরু করেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা জেডএম আলতাফুর রহমান।

যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রসিকিউশন মামলাটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করলে ২০১৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

পরে ২০১৯ সালের ১১ এপ্রিল আব্দুল মোমিন তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তার বিচার শুরু হয়।

এ মামলায় জব্দ তালিকা ছাড়াও ২৯ জনকে ঘটনার স্বাক্ষী করা হয়। বিচারের সময় তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ১৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ৩১ অক্টোবর মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।

এটি ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে গত ৮ বছরে আসা ৪৩তম মামলার রায়।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!