তারেক-মামুনদের খোয়াব ভবনে রাত কাটাতে শিল্পারা আর আসেনা (ভিডিও)

0

স্পেশাল করেসপন্ডেন্স:

২০০৪ সালের ডিসেম্বর মাস। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ফোনে জরুরি এত্তেলা পেয়ে ‘জি ভাইয়া, জি ভাইয়া’ করতে করতে এক বৈঠক থেকে বের হয়ে ছুট দিলেন এয়ারপোর্টের উদ্দেশে।

ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে যখন ঢুকছেন বাবর, তখনই এমিরেটসের প্লেন ল্যান্ড করল। দৌড়ে বোর্ডিং ব্রিজের কাছে দাঁড়ালেন, একজনকে নির্দেশ দিয়ে দ্রুত ফুল আনালেন। বলিউডের তৎকালীন হার্টথ্রব নায়িকা শিল্পা শেঠিকে অভ্যর্থনা জানাতেই ভাইয়া ওরফে তারেক রহমানের নির্দেশে বাবরের আকস্মিক এই দৌড়ঝাঁপ।

অবশেষে শিল্পী শেঠিকে নিরাপত্তা দিয়ে মার্সিডিজ গাড়িতে করে বাবরের নেতৃত্বে গাজীপুরের বিলাসবহুল এক প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়ির নাম ‘খোয়াব ভবন’। গাজিপুরবাসী এই ভবনকে চেনেন জলসা ভবন নামে।

জলসা ভবনের গেটের ভেতরে ফুল হাতে অপেক্ষারত ছিলেন তারেক রহমান স্বয়ং এবং তার জিগরি বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুন ওরফে খাম্বা মামুন। তাদের বিশেষ আমন্ত্রণ এবং উপঢৌকন পেয়ে শিল্পা শেঠির ৪৮ ঘন্টার এই ঝটিকা সফর। ২ দিন ২ রাতের এই সফরে সূর্যের আলো কারো চোখে পড়েনি।

দুদিন তারেক এবং মামুন শিল্পাকে নিয়ে সেই রং মহলে কাটান আনন্দময় সময়। এই সময়ে বাংলাদেশের মিডিয়া এই সফরের বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রাখেন। তবে বিমানবন্দরে কর্মরত লোকজনের বরাতে খবর চাপা থাকেনি, সাধারণ মানুষ উৎসুক হয়ে ওঠেন শিল্পা শেঠি বাংলাদেশে সিনেমার শ্যুটিং করছেন ভেবে। যদিও পরে জানা যায়, এটা ছিল শিল্পার ব্যক্তিগত সফর।

পরের বছর, ২০০৫ সালে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ খ্যাত বিশিষ্ট ভারতীয় সঙ্গীত শিল্পী আলিশা ঢাকায় আসেন একটি কনসার্টের প্রোগ্রামে। ঢাকার একটি ৫ তারকা হোটেলে পৌছানোর পরই বাংলাদেশি মিডিয়া তাকে নিয়ে সংবাদ করতে ব্যাপক ভিড় জমান সেখানে।

এমন সময় কনসার্ট আয়োজনকারী সংস্থার কর্ণধারকে বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জানানো হয়, শিল্পী আলিশাকে খোয়াব ভবনে একবার যেতে হবে, সেখানে ‘ভাইয়া’ মিট করবেন।

চার দলীয় জোট সরকার আমলে ‘ভাইয়া’ নামটিকে সাক্ষাৎ উপরওয়ালার ‘আশীর্বাদ’ মনে করা হতো। কিন্তু সংস্কৃতিমনা এবং রাজনীতি বিমুখ আয়োজক বেচারা বুঝতে পারেনি ‘ভাইয়া’টা কে? ফোনের বিষয়টিকে পাত্তাই দেননি। যার ফল মিলল করুণভাবে।

১ ঘণ্টা পর পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় সেই ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে। অভিযোগ, অনুমতি ছাড়া কনসার্টের আয়োজন। এরপর আলিশাকে বলা হয় গাজীপুরে ‘খোয়াব’ ভবনে যেতে।

এমন প্রস্তাবে তো আলিশা পুরোপুরি অপ্রস্তুত! সেই সাথে চরম অপমানিত মনে করলেন তিনি নিজেকে। ঘটনা বেশিদূর গড়ানোর আগেই তিনি শরণাপন্ন হন ভারতীয় দূতাবাসের। ভারতীয় দূতাবাস তোলপাড় হয়ে যায়। সেখানকার নিরাপত্তা কর্মকর্তারা খোঁজ-খবর নিয়ে ঘটনা বুঝতে পারেন।

তারা তখনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরকে কঠোরভাবে জানিয়ে দেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে, তা না হলে বিষয়টি অনেক দূর গড়াবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুঝতে পারেন, ভারতকে চটানো হবে আত্মঘাতী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আর পরদিন সকালে আলিশা এবং কনসার্টের অন্য অংশগ্রহণকারীরা ভারতে ফিরে যান।

জয়দেবপুর শহরের দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকার সি ব্লকে খাম্বা মামুনের মালিকানাধীন এবং তারেকের অর্থায়নে নির্মিত প্রমোদ ভবনখ্যাত বাড়ি এই খোয়াব ভবন। যদিও কাগজে কলমে বাড়ির মালাকানা মামুনের স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিনের নামে।

চারদিকে ১২ ফুট উঁচু দেয়াল। তার উপর আড়াই ফুট উঁচু গ্রিলের মাথায় ত্রিশূলের মতো চোখা। নিচ্ছিদ্র প্রধান ফটক। দেয়ালের সঙ্গে বেড়ে ওঠা উঁচু দেবদারু গাছের ফাঁকে দেখা যায় বাড়িটি। খালি চোখেই বোঝা যায় বাড়িটি আশপাশের অন্য বাড়ি থেকে আলাদা। বিশেষ কারো বাসভবন।

তারেক-মামুনরা প্রায়ই এখানে আসতেন। আবার ভোরের সূর্য ওঠার আগেই চলে যেতেন। রাতভর চলত উদ্দাম পার্টি, আসতেন শোবিজ জগতের শীর্ষ তারকারা। তবে এখন আর নেই সেই জৌলুস কিংবা মানুষের আনাগোনা। এলাকাবাসীর কাছে খোয়াব ভবন এখন এক দুঃস্বপ্নের ঠিকানা।

এই খোয়াব ভবনে বসেই গাজীপুর আওয়ামী লীগের প্রাণ বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী শামিম জানান, হাওয়া ভবনের মতো খোয়াব ভবনও বিএনপির ষড়যন্ত্রের আখড়া ছিল। ওই সময় গভীর রাতে প্রায়ই পতাকাবাহী গাড়ি খোয়াব ভবনে আসা-যাওয়া করত।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত খোয়াব ভবন কঠোর প্রশাসনিক নিরাপত্তা বলয়ে ছিল। যখনই মামুন বা তারেক রহমান এসেছেন, তখন আশপাশের এলাকায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা মোতায়েন দেখা গেছে।

তারেক ও মামুন গং- এর প্রমোদ ভবন হিসেবে খোয়াব ভবন ব্যবহৃত হয়েছে। ভাওয়াল বীর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে এই খোয়াব ভবনে কুচক্রীরা ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে বলে তিনি জানান। তার জের ধরে ২০০৪ সালের ৭ মে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দিন বিক্ষুব্ধ জনতা খোয়াব ভবনে ভাঙচুর করে আগুন দেয়। পরে আবার নতুনভাবে সংস্কার করান তারেক রহমান।

বহুল আলোচিত এই খোয়াব ভবন এখন অনেকটা গুরুত্বহীন আর দশটা সাধারণ বাড়ির মতো পড়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। বাড়ির নাম খোয়াব হলেও নির্ধারিত জায়গায় ‘খোয়াব’ ফলকটি আর নেই। কৌশলে সাবেক পৌরসভা নির্ধারিত হোল্ডিং প্লেট, ঠিকানা ও বাড়ির মালিকের নাম মুছে দেয়া হয়েছে।

বাইরে থেকে দেখা যায় বাড়ির দেয়ালে শেওলা পড়েছে। অনেকদিন চুনকাম করা হয়নি। গাছগুলো ছাঁটা হয় না নিয়মিত। দূর থেকে অনেকটা জঙ্গল বাড়ি মনে হয়। বাড়ির বর্তমান বাসিন্দারা কেউই বহিরাগত বা অপরিচিত কারও সাথে কথা বলতে চান না।

কেয়ারটেকার দেলোয়ার হোসেন জানান, বাড়ির ৩ তলায় দুটি পরিবার ৭ বছর ধরে ভাড়ায় থাকেছে। ভাড়া তুলে মাস শেষে ঢাকায় তারেক জিয়ার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বাসায় তার স্ত্রীর কাছে দিয়ে আসেন। মামুনের স্ত্রী শাহিনা ইয়াসমিন বছরে কয়েকবার বাড়ির খোঁজ-খবর নেন।

খোয়াব নিয়ে এখনও স্থানীয়দের মাঝে আলোচনা থেমে নেই। এখনও তারা খোয়াব-এর অতীত নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।

ভিডিও:

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!