পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে এসে অভিভূত পর্যটকরা

0

চট্টগ্রাম ব্যুরো:

সৌন্দর্য্যের রাণী বলা হয় চট্টগ্রামকে। তবে সেটা নামে থাকলেও দৃশ্যত চোখে পড়ে না খুব একটা। সেই ধারণাকে বদলে দিতে এগিয়ে এসেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে আমূল বদলে দিয়ে নগরবাসী এবং অবশ্যই পর্যটকদের টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে কর্তৃপক্ষ। উপচে পড়া ভীড় তারই সাক্ষ্য দেয়।

পর্যটক ও সৌন্দর্যপিপাসুদের তৃষ্ণা মেটাতে ঢেলে সাজানো হয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে। আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সমুদ্রের তীরে পর্যটকদের হাঁটার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে সাড়ে ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে। তীরজুড়ে করা হয়েছে ফুলের বাগান। দর্শনার্থীদের জন্য বসানো হয়েছে ছোট ছোট বিশ্রাম চেয়ার এবং রঙ-বেরঙের পাথর। চলছে শিশুদের জন্য রাইড নির্মাণের কাজ। বসার স্থান, হাঁটার পথ ও সবুজ বাগান করা হয়েছে ফাঁকে ফাঁকে। দর্শনার্থীদের ভিড়ও বেড়েছে আগের তুলনায়।

সৌরশক্তিচালিত আলোর কল্যাণে রাতের আলো ঝলমল পরিবেশে এ এক অপরূপ দৃশ্য। পুরোপুরি বদলে গেছে ইতোপূর্বেকার পরিবেশ। নতুন চেহারা ভ্রমণপিপাসুদের মনে জাগাচ্ছে এক নতুন পরিবেশের অনুভূতি। সব মিলিয়ে আধুনিকতা ও নান্দনিকতার ছোঁয়ায় নতুন রূপে সেজেছে পতেঙ্গা সৈকত। একদিকে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নির্মিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম টানেল। এ টানেল সন্নিহিত এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ১৭ কিলোমিটারব্যাপী সিটি আউটার রিং রোড।

আনুষ্ঠানিকভাবে এই রিং রোড এখনও খুলে দেয়া না হলেও সমুদ্রের অপরূপ দৃশ্য উপভোগে ইতোমধ্যে সৌন্দর্যপিপাসুদের ভিড় জমজমাট রূপ নিচ্ছে এই সমুদ্র সৈকত। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে থাকছে ঠাসা। অথচ মাত্র ১ বছর আগেও এমন রূপে দেখা যায়নি সৈকতে। হাঁটার পথ ছিল না। ঢোকার মুখে ছিল ঝুপড়ি। বসার কোনো স্থান ছিল না। বড় বড় বোল্ডারের কারনে সৈকতে নামতেও পোহাতে হতো ভোগান্তি।

ছুটির দিনগুলোতে দেখা যায়, নতুন রূপে সাজা পতেঙ্গা সৈকতে দর্শনার্থীদের ভিড় উপচে পড়ছে। এ যেন হাজারো মানুষের মিছিল চলছে। দুই ভাগে সৈকতের ৫ কিলোমিটারজুড়ে দুপাশে যত দূর চোখ যায় কেবল মানুষ আর মানুষ। তাদের কোলাহলে ছাপিয়ে যাচ্ছিল ঢেউয়ের গর্জন। পরিবার-পরিজন, বন্ধু ও প্রিয় মানুষকে নিয়ে দর্শনার্থীরা চষে বেড়াচ্ছে আধুনিক পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে।

কেউ ব্যস্ত সুসজ্জিত বাগানের ফুলের সঙ্গে মিলেমিশে ছবি তুলতে। কেউ বা বসার আসনে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন আয়েশ করে। অনেকেই আবার হাঁটাপথ (ওয়াকওয়ে) ধরে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। অনেকে একটু নিচে নেমে সমুদ্রের বালুচরে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। অনেকে আবার সমুদ্রের ঢেউয়ের পানিতে গোসল করছেন মনের আনন্দে। কেউ বাগানে ফোটা ফুলের ঘ্রাণ উপভোগ করছেন, মুগ্ধ হচ্ছেন সমুদ্রের বিশালতায়। কেউ স্পীডবোটে চড়ে চক্কর দিচ্ছেন সমুদ্রে। আগে শুধু ছুটির দিনে এমনটা দেখা গেলেও এখন প্রতিদিনই উপচেপড়া ভীড় হয়। পতেঙ্গার বর্তমান রুপ সেটাই বলছে। দিন দিন বাড়ছে লোক সমাগম।

অন্যদিকে সমুদ্র দেখতে আসা দর্শণার্থীদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ ও বিচ কমিউনিটি পুলিশ কাজ করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত দর্শণার্থীদের নিরাপত্তায় বিষয়টি মাথায় রেখে সাদা পোশাকে ডিউটি ও ফোর্স পুলিশও থাকে বলে জানা গেছে।

এদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা থেকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসা রাজীব বড়ুয়া, সৌভিক বড়ুয়া, ছোটন দাশ, উচ্ছ্বাস ও তাদের বন্ধুরা জানান, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অভুতপূর্ব পরিবর্তন সত্যিই অবিশ্বাস্য। গত ১ বছর আগেও এর চিত্র ছিল ভিন্ন। আগে যেখানে সন্ধ্যা হলেই নিস্তব্ধ হয়ে যেত, সেখানে বর্তমানে রাতের পরিবেশও বেশ চমৎকার।

তারা আরো বলেন, বর্তমান নতুন রূপে সজ্জিত বাকি অবকাঠামোগত উন্নয়নগুলো শেষ হলে ভবিষ্যতে সৌন্দর্য্যের দিক দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারকেও ছাড়িয়ে যাবে এ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত…।

তারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় আরো বলেন, ‘আঁরা সিডিএ চেয়ারম্যান আব্দুল ছালাম’র অসামান্য অবদান উপলব্দি গরিবেল্লাই আইস্সি। যারা আইস্সে এইতেরা বুঝিবে দেখিবে, ক্যান গরি পেলাইয়্যি আঁরার পতেঙ্গারে। আর যারা এহনো পতেঙ্গাত নো’আইয়ো, তোঁয়ারা পস্তাইবে’…।

অর্থাৎ- আমাদের সিডিএ চেয়ারম্যান আব্দুল ছালামের অসামান্য অবদান উপলব্ধি করার জন্য পতেঙ্গায় এসেছি। যারা এসেছে তারা বুঝবে, দেখবে, কেমন পরিবর্তন করা হয়েছে আমাদের পতেঙ্গাকে। আর যারা নতুন রুপে গড়ে ওঠা পতেঙ্গায় এখনও আসেনি, তারা পস্তাবে।

এদিকে পত্রিকা সুত্রে জানা গেছে, ৫ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ ওয়াকওয়েতে একসঙ্গে ৫০ হাজার মানুষ হাঁটতে পারবে। এলাকাটিকে দুটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। জোন ওয়ান ও জোন টু। জোন ওয়ান হচ্ছে সমুদ্র সৈকতের অংশটি। আর জোন টু হচ্ছে ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে শেষে রিং রোড। সেখান থেকে আসা-যাওয়া করার জন্য ক্যাবল কারের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে পাঁচ তারকা হোটেল, কনভেনশন হল, শপিং মলসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এলাকা গড়ে তোলা হবে।

ইতোমধ্যে জোন ওয়ান জনসাধারণের জন্য বিনোদনের উপযোগী হয়ে ওঠেছে। জোন ওয়ানের মধ্যে ৩০ ফিট চওড়া সাড়ে ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে রয়েছে। এছাড়া এ জোনে একটি বিশাল প্লাজা থাকবে। ৭০০ গাড়ি রাখার জন্য পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গাড়ি পার্কিংয়ের রাস্তাটি হবে টানেল এবং বিচ রোডের মাঝামাঝি। এখন বিচের প্রধান সড়ক যেটি আছে, সেটিকে ৮০ ফিট প্রশস্ত করা হচ্ছে। এ রোড দিয়ে মূলত সব গাড়ি প্রবেশ করবে এবং বের হবে।

বিচ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করা হবে। বিচ এলাকায় ছোট ও বড়দের জন্য বিভিন্ন রাইড থাকবে। শিশুদের জন্য কিছু সিম্পল রাইড থাকবে। এছাড়া সাড়ে ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ের ওপরে ক্যাবল কার থাকবে। এ প্রজেক্টের জন্য বর্তমানে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। জোন ওয়ানের কাজ শেষ করতে আরও প্রায় ২০ কোটি টাকা লাগবে।

পতেঙ্গায় ভ্রমন পিপাসুদের জন্য কিছু টিপস

পতেঙ্গা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরের সমুদ্র সৈকত। যা কর্ণফুলী নদী মোহনার বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। পতেঙ্গা চট্টগ্রাম শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি বিএনএস ঈসা খান পতেঙ্গার সন্নিকটে অবস্থিত। চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক জেটি এখানে অবস্থিত। এছাড়া নেভাল একাডেমিও এখানে অবস্থিত।

এখানে সবচেয়ে ভালো লাগবে সন্ধ্যার পরিবেশ। সন্ধ্যার দিকে সূর্যাস্তের দৃশ্য মনকে আরো বেশি পুলকিত করবে। সুতরাং থাকতে পারেন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত। এখানে রয়েছে ২০ টাকায় ঘোড়ার পিঠে চড়ার সুযোগ। সমুদ্র ভ্রমণের জন্য রয়েছে অর্ধশতাধিকেরও বেশি স্পিডবোট ও সাম্পান। এসবে চড়ে সমুদ্রের চক্কর দিতে পারেন প্রতিজন মাত্র ৩০ টাকা করে।

জাহাজ চলাচল কিংবা নিকটস্থ বিমানবন্দর থেকে অনেক নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া বিমান দেখবেন ক্ষণে ক্ষণে। ডিজিটাল ক্যামেরা (ডিএসএলআর) দিয়ে ছবি তোলার জন্য রয়েছে অসংখ্য পেশাদার ফটোগ্রাফার। চাইলে টাকার বিনিময়ে চমৎকার চমৎকার ছবিও তুলতে পারবেন তাদের মাধ্যমে।

সাধারণত বিকেল গড়াতে থাকলে জোয়ার আসতে শুরু করে। জোয়ার শুরুর আগে বাঁধ অনেকটা তলিয়ে যায়। তীরে এসে আছড়ে পড়ে ঢেউ। সৈকতে আছে বার্মিজ মার্কেট। সেখানেও ঘুরে ফিরে পছন্দের কেনাকাটা সেরে নিতে পারেন।

এক কথায় বলা যেতে পারে, একবার পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে পা রাখলে আপনার আর ফিরতে ইচ্ছে করবে না।

প্রতিবেদন: মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন

শেয়ার করুন !
  • 21
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply