আগে ফাঁসি, পরে তদন্ত: অক্টোবর বিদ্রোহ এবং জিয়ার রূঢ়তার বিমূর্তরূপ

0

ফিচার ডেস্ক:

‘আগে ফাঁসি, পরে তদন্ত’- সরকার যে রাতে ঐ বক্তব্য প্রচার করে সে রাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অভিযুক্তদের ফাঁসি কার্যকর শুরু হয়ে যায়। অবশ্য জেনারেল জিয়া ১৪ অক্টোবর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এর ইঙ্গিত দেন।

তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডসহ ট্রাইব্যুনালের সব রায় কার্যকর হচ্ছে। একই ভাষণে তিনি জাসদ, ডেমোক্রেটিক লীগ ও মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন সিপিবি- এই তিনটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন।

এদিকে ঢাকা ও বগুড়ার অভ্যুত্থানের বিষয়ে সরকার ১৭ অক্টোবর বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে।

১৮ অক্টোবর আইএসপিআর-এর মাধ্যমে সরকার জানায়, ঢাকায় বিদ্রোহীদের মধ্যে স্থল ও বিমানবাহিনীর ৪৬০ জন ব্যক্তির বিচার হয়েছে। ৩৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ২০ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, ৬৩ জন খালাস পেয়েছে, বিচার চলছে। অপর ৩৪০ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানানো হয়নি।

অপরদিকে ২৬ অক্টোবর সরকার ইতিপূর্বে গঠিত তদন্ত কমিটি বাতিল করে দিয়ে বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি এ টি এম মাসুদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। ঐসব কমিটি-কমিশন মূলত আন্তর্জাতিক চাপে করা হয়েছিল।

ঐ কমিশন একটি রিপোর্টও দেয়, কিন্তু জেনারেল জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেন। ঐ কমিশন গঠনের আগেই তথাকথিত বিচারের মাধ্যমে অভিযুক্তদের ফাঁসি কার্যকর প্রায় শেষ হয়ে যায়।

অভ্যুত্থানের পরেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া নিজের নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর ওপরতলায় দ্রুত রদবদল ঘটান। পাশাপাশি তিনি তার ক্ষমতার ভিত্তি সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরশীলতার বাইরে রাজনৈতিকভাবে সম্প্রসারণে মনোযোগী হন।

এ পর্যায়ে জেনারেল জিয়া তার ‘ঢাকা নিরাপদ করো’ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে অক্টোবর মাসেই ডিজিএফআই প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল আমিনুল ইসলামকে অবসর দিয়ে ব্রিগেডিয়ার মহব্বতজান চৌধুরীকে ঐ পদে নিয়োগ দেন।

জেনারেল শওকতকে যশোর ৫৫ ডিভিশনের জিওসি এবং জেনারেল মঞ্জুরকে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি করে চট্টগ্রামে বদলি করেন।

ঐ সময়ে এ দুই জেনারেলের মাঝেও বিরোধ চরমে পৌছেছিল। আবার দুজনেই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ঘটনার জন্য জেনারেল জিয়াকে দায়ী করেছিলেন।

এছাড়া ব্রিগেডিয়ার এম নূরউদ্দীনকে কুমিল্লা ব্রিগেডে এবং জেনারেল এইচ এম এরশাদকে ঢাকা ডিভিশনের জিওসি নিযুক্ত করেন। ৪৬ ব্রিগেডকে নবম ডিভিশনের অধীন করা হয়। বগুড়ায় অবস্থানরত ২২ বেঙ্গল বিলুপ্ত করা হয়। বিমানবাহিনীর প্রধান এ জি মাহমুদের গতিবিধিও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দিন তার ‘মিলিটারি রুল অ্যান্ড দ্য মিথ অব ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেছেন, অক্টোবরের অভ্যুত্থানের পরপর জেনারেল জিয়া ‘ঢাকা নিরাপদ করো’ পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক শক্তিগুলোয় তার ক্ষমতার ভিত্তি দৃঢ় করার উদ্যোগ নেন।

সে ধারাবাহিকতায়ই তিনি পরে বিএনপি গঠন করেন।

সূত্র- রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি (পৃষ্ঠা- ২৩, ২৪)

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!