জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: পর্ব-২

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: পর্ব-১

জ-ঙ্গিবাদ সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে গত জোট সরকারের সময়ে। জামায়াত জ-ঙ্গিবাদকে মিডিয়ার সৃষ্টি বলে দাবি করলেও পরে জ-ঙ্গিবাদের সঙ্গে জামায়াতেরই সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। অল্প কিছু জ-ঙ্গি হাম-লা পর্যালোচনা থেকেই উঠে আসে যে, জামায়াত জ-ঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। এভাবেই এগিয়ে চলছে জ-ঙ্গিবাদ।

মুফতি হান্নানের জবানব-ন্দি থেকে জানা যায় বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির এক কালো অধ্যায়ের কথা। ২১ আগস্টে গ্রেনেড হাম-লার পরিকল্পনা নিয়ে হাওয়া ভবনে মিটিংয়ের কথা, জড়িতদের কথা। এসব অস্বীকার করছে বিএনপি।

আর এসব সংশ্লিষ্টতার বিভিন্ন প্রমাণাদি বেরিয়ে আসার কারণে বিএনপির এখন তা আর শক্তভাবে অস্বীকার করতে পারছে না। অবস্থাদৃষ্টে শুধু জোটের রাজনীতি ধরে রাখার জন্যই বিএনপি জ-ঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে জড়িয়ে পরেছে বলে মনে হলেও সর্বোপরি এরা ফেঁসে গেছে জামায়াতেরই পেতে রাখা ফাঁদে। গত নির্বাচন গুলোতে ভোটারদের কাছ থেকে বিএনপি এর সমুচিত জবাব পেয়ে গেলেও তাতে বিএনপির রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং বিএনপিতে প্রতিক্রিয়াশীলদের আধিপত্য বাড়ছে, বাড়ছে জামায়াত নির্ভরতা। এভাবে চলতে থাকলে বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনি ভেবে দেখা দরকার। জামায়াতী গ্রাস মুক্ত হতে না পারলে বিএনপি নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সামনে চরম হুম-কির মুখে পরবে নিশ্চিত।

তাদের এই হ-ত্যা ও রগকাটা রাজনীতি, সন্ত্রা-সী ও জ-ঙ্গিবাদী কার্যকলাপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সন্ত্রা-সী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অধিভুক্ত ন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর স্টাডি অব টেরোরিজম অ্যান্ড রেসপন্স টু টেরোরিজমের তৈরি ফাইলে ছাত্রশিবিরের ব্যাপারে বলা হয়, ভয়ংকর জ-ঙ্গি সংগঠন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জ-ঙ্গি তৎপরতা চালানো ছাড়াও শিবির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জ-ঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিজেদের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

শিবির তার প্রতিষ্ঠালগ্নের আগে থেকেই এদেশের মানুষের বিরু-দ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির নাম ধারণ করে পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে পুনরায় এদেশের মানুষের বিরু-দ্ধে তারা তাদের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই রক্তপিপাসু হায়েনারা সততা, ন্যায়, প্রজ্ঞা, প্রগতি, মননশীলতা, মুক্তচিন্তার বিরু-দ্ধে হাম-লে পড়েছে অসংখ্যবার। তাদের হাতে এ পর্যন্ত জাতির অসংখ্য শ্রেষ্ঠ সন্তান প্রাণ হারিয়েছেন।

শুধু ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এদের বো-মা হাম-লাগুলো পর্যবেক্ষণ করলেই তাঁদের হিংস্রতা, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা আর প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পাওয়া যায়। ২০০১ নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ অফিসে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ২১, আহত শতাধিক। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০০১ বাগেরহাটে আওয়ামী লীগের নির্র্বাচনী প্রচার সভায় বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৯, আহত শতাধিক। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী আলোচনা সভায় বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৪, আহত ১৫। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০০২-এ সাতক্ষীরার গুরপুকুরের রক্সি সিনেমা হলে এবং সার্কাস প্রাঙ্গণে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৩, আহত ২শ। ৭ ডিসেম্বর ২০০২ ময়মনসিংহের তিনটি সিনেমা হলে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ১৯, আহত ৪৫। ১৭ জানুয়ারি ২০০৩-এ টাঙ্গাইলের সখীপুরের ফালুচাঁদ ফকিরের মাজারের মেলায় বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৭, আহত হয় ৮। ১ মার্চ ২০০৩ খুলনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় কর্তব্যরত পুলিশের ওপর বো-মা হাম-লা হয়, তাতে নিহ-ত হয় ১ এবং কিছু সংখ্যক আহত হয়। ১২ জানুয়ারি ২০০৪ সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজারে আর্জেস গ্রেনেড বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৭, আহত ৭০।

১ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ খুলনায় সাংবাদিক মানিক সাহা বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয়। ২১ মে ২০০৪ সিলেটে হজরত শাহজালালের মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর আর্জেস গ্রেনেড হাম-লা হয়, তাতে নিহ-ত হয় ২ এবং হাইকমিশনারসহ আহত হয় ৭০। ২৭ জুন ২০০৪ খুলনায় দৈনিক জন্মভূমির অফিসে বো-মা বি-স্ফোরণে সাংবাদিক হুমায়ুন কবির বালু নিহ-ত হন। ৭ আগস্ট ২০০৪ সিলেটে গুলশান হোটেলে আর্জেস গ্রেনেড বি-স্ফোরণে ১ জন নিহ-ত ও ৪০ আহত হয়। ২১ আগস্ট ২০০৪ আওয়ামী লীগের জনসভায় আর্জেস গ্রেনেড ও বো-মা হাম-লায় কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমান সহ নিহ-ত হন ২৪, শেখ হাসিনা সহ আহত হয় ৫শ’র অধিক। ১৬ নবেম্বর ২০০৪ মৌলভীবাজারে যাত্রা প্রদর্শনীতে বো-মা বি-স্ফোরণে আহত হয় ১০ জন। ১৭ জানুয়ারি ২০০৫-এ গোপালগঞ্জে এনজিও ‘ব্র্যাক’-এর অফিসে বো-মা বি-স্ফোরণে আহত হয় ২১ জন। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ খুলনা প্রেসক্লাবে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হন ১ জন সাংবাদিক এবং আহত হন ৩ জন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালোবাসা দিবসের অনুষ্ঠানে বো-মা বি-স্ফোরণে আহত হয় ৮ জন।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী আলোচনাসভায় বো-মা বি-স্ফোরণ ২০০৫-এর ১৭ আগস্ট জ-ঙ্গিরা সারা দেশের তেষট্টিটি জেলায় একসঙ্গে পাঁচ শ বো-মা বি-স্ফোরণ ঘটিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল তারা কত শক্তিশালী। ৩ অক্টোবর ২০০৫ সালে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং চট্টগ্রামের কোর্টে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হয় ৩ জন, লক্ষ্মীপুর কোর্টের ১ জন বিচারক সহ আহত হন ৩৮ জন। ১৪ নবেম্বর ২০০৫ সালে ঝালকাঠি জেলা কোর্টে বো-মা বি-স্ফোরণে নিহ-ত হন ২ জন বিচারক এবং আহত হন ৩ জন। এভাবে ২৯ নবেম্বর ২০০৫, ১ ডিসেম্বর ২০০৫, ৮ ডিসেম্বর ২০০৫ এর তিনটি বো-মা হাম-লায় নিহ-ত হন ১৯ জন আর আহত হন ১৫৮ জন।

প্রায় সূচনা লগ্নে শিবির ঢাকাতে নিজেদের কর্মকাণ্ড সাধ্যমত চালিয়ে বিস্তৃত হতে চট্টগ্রামে চলে যায়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে শুরু হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের হ-ত্যার রাজনীতি। শিবিরের হাতে ১৯৮১ সালে প্রথম খু-ন হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচিত এজিএস ও ছাত্রলীগ নেতা তবারক হোসেন। ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ এক মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্রমৈত্রী। মৌ-লবাদমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতেই এই শান্তিপূর্ণ মিছিল। শুরু হয় মিছিলে শিবিরের গু-লিবর্ষণ। নিহ-ত হন ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুক। ফারুক হ-ত্যার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের খু-নের রাজনীতির শুরু। ১৯৯৩ সালে শিবির ক্যাম্পাসে তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এনামুল হকের ছেলে ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ মুছাকে নৃশং-সভাবে হ-ত্যা করে। ২২ আগস্ট ১৯৯৮ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী সঞ্জয় তলাপাত্রকে নি-র্মমভাবে হ-ত্যা করে শিবির ক্যাডাররা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তারের পর আশির দশকের মাঝামাঝিতে শিবিরের টার্গেটে পরিণত হয় চট্টগ্রামের খ্যাতনামা কলেজগুলো। তাদের টার্গেটে প্রথম চট্টগ্রাম কলেজ, দ্বিতীয় সরকারি মহসীন কলেজ ও তৃতীয় চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। সন্ত্রা-স ও হ-ত্যার রাজনীতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম কলেজ ও সরকারি মহসীন কলেজ পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় ছাত্রশিবির। নিয়মিত মিছিল-মিটিং করে কলেজে আতঙ্ক সৃষ্টি করে শিবির। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট দখল করার জন্য ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা ছাত্র সংসদের ভিপি মোহাম্মদ জমির ও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ফরিদউদ্দিনকে গু-লি করার পর তাদের হাত-পায়ের রগ কেটে হ-ত্যা করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নৃশং-স হ-ত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের ‘বহদ্দারহাট ট্যাজেডি’। ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শিবির চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট মোড়ে একটি মাইক্রোবাসে থাকা ছাত্রলীগের আটজন নেতা-কর্মীকে ব্রাশফায়ারে হ-ত্যা করে। এরপর ২০০১ সালে ২৯ ডিসেম্বর ফতেয়াবাদের ছড়ারকুল এলাকায় শিবির ক্যাডাররা ব্রাশফায়ারে হ-ত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আলী মর্তুজাকে। ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নগরীর ষোলশহর রেলস্টেশনে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এএম মহিউদ্দিনকে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের ইতিহাসে আরেকটি নৃশং-স হ-ত্যাকাণ্ড গোপালকৃষ্ণ মুহুরী হ-ত্যাকাণ্ড। ২০০১ সালের ১৬ নভেম্বর শিবির ক্যাডাররা গোপালকৃষ্ণ মুহুরীকে নি-র্মমভাবে হ-ত্যা করে। দুর্গম এলাকা ফটিকছড়িতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে তারা পর্যায়ক্রমে ছাত্রলীগের বেশ ক’জন নেতা-কর্মীকেও হ-ত্যা করে।

এদিকে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়েও শিবির নৃশং-সতার পথ বেছে নেয়। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ প্রথমবারের মতো শিবির ক্যাডাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসভর্তি বহিরাগত সন্ত্রা-সী নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের ওপর হাম-লা চালায়। এই সহিংস ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের রাজনীতি নিষি-দ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৮৮ সালের ৩ মে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে শিক্ষার্থীদের সামনে ছাত্রমৈত্রী নেতা ডাক্তার জামিল আক্তার রতনকে কুপি-য়ে ও হাত-পায়ের রগ কেটে হ-ত্যা করে শিবিরের ক্যাডাররা। ১৯৮৮ সালে রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাসদ নেতা জালালকে তার নিজ বাড়ির সামনে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে শিবির। ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই ভোররাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা যখন ঘুমিয়ে, ঠিক সে সময়ে বহিরাগত শিবির ক্যাডাররা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাম-লা চালিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি ও সিনেট সদস্য আইয়ুব আলী খান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আহসানুল কবির বাদল এবং হল সংসদের ভিপি নওশাদের হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়। একই বছরের আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসের বাসভবনে শিবির বো-মাহাম-লা করে। ১৯৯২ সালের ১৭ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্ত্রা-সীদের হাতে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত খু-ন হন। এ দিন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হল আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

১৯৯২ সালের ১৯ জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে রাজাকারদের অন্যতম প্রধান গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে হরতাল কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে জাসদের মিছিলে শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রা-সীরা হাম-লা চালায়। শিবিরের হাম-লায় ওই দিন সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে জাসদ নেতা মুকিম মারাত্মক আহত হন এবং ২৪ জুন তিনি মারা যান। একই বছরের আগস্ট মাসে শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী নতুন বুধপাড়া গ্রামে শিবির ক্যাডার মোজাম্মেলের বাড়িতে বো-মা বানানোর সময় শিবির ক্যাডার আজিবরসহ অজ্ঞাতনামা অন্তত আরো তিনজন নিহ-ত হয়।

১৯৯৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিবির সবচেয়ে বড় তাণ্ডবলীলা চালায় শিবিরের ক্যাডাররা। ছাত্রদল ও সাবেক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মিলে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ওপর শিবিরের হাম-লায় ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নতুন এবং ছাত্র ইউনিয়নের তপনসহ ৫ জন ছাত্র নিহ-ত হন। একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর বহিরাগত সশস্ত্র শিবিরকর্মীরা শেরেবাংলা হলে হাম-লা চালিয়ে ছাত্রমৈত্রী নেতা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের সদস্য জুবায়েদ চৌধুরী রিমুকে হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশং-সভাবে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে। ১৯৯৫ সালের ১৩ ফেব্র“য়ারি শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী চৌদ্দপাই নামক স্থানে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে হাম-লা চালিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীষ ভট্টাচার্য রূপমকে বাসের যাত্রীদের সামনে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে। ১৯৯৬ সালে জাসাস বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আমানউল্লাহ আমানকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মো. ইউনুসকে ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় কুপি-য়ে হ-ত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ২০০৬ সালের ৬ ফেব্র“য়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থি শিক্ষক মহিউদ্দিন এবং ছাত্রশিবির সভাপতি মাহবুব আলম সালেহীসহ আরো দু’শিবির ক্যাডার একযোগে হাম-লা চালিয়ে রাবির ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহেরকে হ-ত্যা করে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্র“য়ারি রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাম-লা চালিয়ে ছাত্রলীগকর্মী ফারুক হোসেনকে কুপি-য়ে হ-ত্যা করে তার লা-শ ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবিরের ক্যাডাররা।

শিবিরের নি-র্যাতন নিপী-ড়নের শিকা-র হয়ে এখনো অনেকেই পঙ্গু আর অসহায় জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজপথের টগবগে অনেক প্রতিবাদী যুবক এখন মাথা ঠুকছেন অন্ধকার ঘরের দেয়ালে। রাষ্ট্রযন্ত্র শিবিরের বিরু-দ্ধে মাঝে মাঝে কিছু হম্বিতম্বি ছাড়া আজ পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। শিবিরের কুখ্যাত ক্যাডাররা বরাবরের মত সবসময়ই রাজপথে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এমন কি প্রায়ই তারা হুঙ্কার দেয়, তাদের বিরু-দ্ধে এসব অভিযোগ নাকি মিথ্যা। মিথ্যা নাকি সত্যি তা প্রমাণ হয়ে যায় ঘটনা বাস্তবে কি ঘটেছিল; তা জানা গেলেই। শিবিরের হাজারো নৃশং-স-ভয়ঙ্কর কিলিং মিশন থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দুজন ছাত্রনেতার নিজের ভাষ্য থেকে জানা যায়ঃ-

১ম ঘটনাঃ সময়টা ৯০ দশকের মাঝামাঝি। রাবিতে শিবির তখন বর্ধিষ্ণু শক্তি। ঈমানী জোর দিয়ে শিবির অন্যদের মোকাবেলা করে বলা হলেও ক্যাম্পাসে ক্ষমতা সংহত করার জন্য তারাই সবচেয়ে বেশি ছল-চাতুরি, দু’নম্বরি করেছে। বাংলাদেশের অন্য কোনো সংগঠনকে নিজেদের বিকাশের জন্য এত ছলা-কলা ষড়যন্ত্র পাকাতে হয়নি। তখনকার দিনে শিবির নানাভাবে অপরাপর সংগঠনের কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাতো। যেমন, রাজনীতিতে নতুন সক্রিয় হওয়া ছেলেদের দেখিয়ে দেখিয়ে শিবির ক্যাডাররা তরবারি ধার দিত। রাতে হয়ত তার মাথার কাছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা রেখে গেল। কিংবা বাইরে দু’একজন আড্ডায় থাকলে তখন শিবির ক্যাডাররা বোরখা পরে হাতে কুড়াল কিরিচ-তরবারি নিয়ে তাদের সামনে হঠাৎ করে উদয় হত। কিছুক্ষণ পর আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যেত তারা। এরকম ভীতি ও আতঙ্কের সময়ে রাবিতে অর্থনীতি বিভাগে তৃতীয় বর্ষে পড়তেন মাহবুবুল আলম ফরহাদ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। যোগ্যতাবলে হবিবুর রহমান হল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে পরবর্তীতে রাবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছিলেন। সবশেষে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হন।

১৯৯৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শিবির রাবি ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। ছাত্রদলকে তখন ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়া হয়। ২২ জুলাই ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নেতৃবৃন্দের বৈঠক হয়। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা জানান, ক্যাম্পাস প্রত্যেকের। প্রত্যেক ছাত্রেরই ক্যাম্পাসে থাকার, রাজনীতি করার অধিকার আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ আলোচনা সেরে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নেতা কর্মীরা। দীর্ঘদিন পরে হলে ঢুকে সবাই যে যার কক্ষে চলে যায়। হাবিবুর রহমান হলের ৮৮নং কক্ষে থাকতেন ফরহাদ। ছাত্রদলের ঐতিহ্যবাহী এই কক্ষটিতে ইতোপূবর্বে ফজলুর রহমান পটল, হারুনুর রশীদ হারুন সহ অনেক বড় বড় নেতার সিট ছিল।

কক্ষে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর হাত মুখ ধুয়ে একটু আরাম করে ফরহাদ যখন বসতে গিয়েছিল তখনই শিবির ক্যাডাররা তার ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। সেই সময় তিনি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বড় নেতা না হলেও প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন। এজন্য তিনি ছিলেন শিবিরের বিশেষ টার্গেট। ফরহাদ ঘুণাক্ষরেও জানতেন না শিবির ক্যাডাররা সংঘবদ্ধভাবে হলের ভেতর ওৎ পেতে বসে আছে। হঠাৎ শিবির ক্যাডাররা কক্ষের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং তারা ‘ফরহাদকে পেয়েছি’ বলে উল্লাস ধ্বনি দিতে থাকে। ফরহাদ তখন তার বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আবিভূত হন। চেষ্টা করেন সময় পার করার। যাতে তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করতে আসতে পারে। তিনি তাদের সঙ্গে আলাপ জড়াতে থাকেন। কিন্তু শিবির ক্যাডাররা তার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তার ওপর হাম-লে পড়ে।

প্রথমেই তাকে হ-ত্যার উদ্দেশ্যে মাথায় কতগুলো আঘাত করে তারা। ফরহাদের মাথায় দেখা গেছে অনেকগুলো গভীর ক্ষতচিহ্ন। মাথায় আঘাতের পরই ফরহাদ চেতনা হারিয়ে ফেলেন। ঠিক এ সময় শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। শিবির ক্যাডাররা ফরহাদকে হল থেকে বের করে হাবিবুর রহমান হলের পেছনে নিয়ে যায়। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে তার সারা দেহ। সবশেষে তারা ফরহাদের বাম হাতের কব্জি পুরোটা কেটে নিয়ে যায়। তার মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তারা পরখ করে সে বেঁচে আছে কি-না। মৃ-ত্যু নিশ্চিত জেনেই তারা নারায়ে তকবির- আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিতে দিতে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর বাংলা চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যের মতো সব ঘটনার শেষে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিএনপি তখন ক্ষমতাসীন দল। তবু শিবির ক্যাডাররা তাকে হ-ত্যার উদ্যোগ নিতে পিছ পা হয়নি। এ ঘটনার পর মামলা করা হয়েছিল ফরহাদের পক্ষ থেকে। মামলা পরিচালনা করা হয়েছিল দলীয়ভাবে। আর সব রাজনৈতিক মামলার মতোই এ মামলারও একই অবস্থা হলো। রাজনৈতিক মামলাগুলো সাধারণত ২-৪ বছর চলে। সাক্ষী হয় না। বাদী থাকে না। অবশেষে এক পর্যায়ে মামলাটির অপমৃ-ত্যু হয়। সোহরাওয়ার্দী হলের সভাপতি তুষার, রাবি শিবিরের সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ, সেক্রেটারি নূরুল ইসলাম বুলবুল মাইনুল, শাহদাৎ, জব্বার সহ আরো অনেককেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই মামলার আসামি করা হয়। যদিও তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত অনেকেই জানতো, আসলে এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিল – শিবির ক্যাডারদের অ-স্ত্র প্রশিক্ষণদাতা ও অসংখ্য মামলার আসামী ডাসমারি এলাকার বাসিন্দা কুখ্যাত ক্যাডার জাফর বাবু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও শিবিরের কিলার বাহিনীর সদস্য খুশী, মেহেরচণ্ডী এলাকার শিবিরের মেসগুলোর নিয়ন্ত্রক জামায়াতের রোকন ও রাবি সংলগ্ন বুধপাড়া এলাকার আলোচিত শিবির ক্যাডার সামাদ, শিবিরের তৎকালীন সাথী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর মসজিদ মিশন একাডেমির পাশের বাসার অধিবাসী কুখ্যাত শিবির ক্যাডার শাহীন, শিবিরের রাবি শাখার সভাপতি জব্বার, মাইনুল, বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা শিবির ক্যাডার সালেকীন এবং সাবেক রাবি ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীরসহ আরো নাম না জানা অনেক শিবির ক্যাডার। উল্লেখ্য যে, মাইনুল বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আর জব্বার ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

তখন শিবিরের তেমন কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। বরং বিএনপি ক্ষমতা ছাড়লেও হাবিবুর রহমানের আমলে ফরহাদকেই জেলে যেতে হয়। এমনকি ফরহাদের চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে বরাদ্দ দেয়া ১ লাখ টাকাও তসরূপকৃত বলে অভিযোগ এনে ফরহাদকে অপমানিত করা হয়েছিল। অসুস্থতার সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাদেক হোসেন খোকা, আমানউল্লাহ আমান, ফজলুল হক মিলনসহ অনেকেই তাকে হাসপাতালে দেখতে যান। প্রধানমন্ত্রীর দৈনিক কার্যতালিকাতেও তাকে দেখতে যাওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পাটির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ডাকা হরতালের কারণে প্রধানমন্ত্রী আর তাকে দেখতে যেতে পারেননি! ফরহাদ আহত হওয়ার পর বিবিসি ও ভয়েজ অব আমেরিকা টানা ৪ দিন ধরে একের পর এক সিরিজ প্রতিবেদন প্রচার করে। অচল এক হাত নিয়ে ফরহাদ এখনো স্বপ্ন দেখেন পরিশুদ্ধ রাজনীতির।

জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: পর্ব-৩
জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: শেষ পর্ব

লেখক: সায়দুল ইসলাম
পরিচিতি: প্রবাসী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!