জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: পর্ব-৩

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: পর্ব-২

২য় ঘটনাঃ দেশ ও জাতির প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ছিল খুলনা শহরের প্রদ্যুৎ রুদ্র চৈতীর। সেই বোধই মুক্তিযু-দ্ধের বিরোধিতাকারীদের প্রতি তার অন্তরে তৈরি করেছিল ব্যাপক ঘৃণা। তাই সে খুলনা অঞ্চলে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন নিয়মিত।

কিন্তু জামায়াত-শিবির চক্রও প্রতিনিয়ত সেখানে তাদের শক্তি প্রদর্শন করত, কোনো ধরনের কর্মসূচি তারা সফল হতে দিত না। লাঠি, দা, কুড়াল, কিরিচ, তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত ঘাতকের দল। ফলে কোনো ধরনের কর্মসূচি নিয়ে এগুতে পারত না নির্মূল কমিটি। চৈতী এর প্রতিবাদ করতেন। কর্মসূচিতে গেলেই তিনি শিবিরের বাধার বিরুদ্ধাচরণ করতেন এবং কখনো কখনো তাদের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়তেন। এরই রেশ ধরে ঘাতক শিবির ক্যাডাররা চৈতীকে চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে। চৈতীকে হ-ত্যার উদ্দেশ্যে দু’দুবার তার ওপর হাম-লা চালালেও তখন তারা ব্যর্থ হয়।

এরপর চৈতী চলে আসেন রাজশাহীতে। ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে মাস্টার্স কোর্সে। সেখানে এসেই তিনি বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী রাবি শাখার হাল ধরেন। ছাত্রমৈত্রীর কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি এবার শিবিরের আরো বড় শত্রুতে পরিণত হন। ’৯৪ সালের ২০ ডিসেম্বর ছিল রাবিতে চৈতীর শিক্ষাজীবনের শেষ দিন। তখন তিনি ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক। ক্যাম্পাসে তখন শীতকালীন ছুটির মধ্যবর্তী সময়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি, তীব্র শীত। রাজশাহীতে সেদিন তাপমাত্রা ৫/৬ ডিগ্রি। রিকশায় করে তিনি যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবনের সামনে হঠাৎ মাথার পেছনে কিসের যেন ছোঁয়া লাগল। ঘুরে তাকাতেই দেখেন পিস্তল। গু-লিও বের হলো সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু ততক্ষণে কিছুটা সরে গেছেন চৈতী। গু-লিটা তার কোনো ক্ষতি করতে পারল না। রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে তিনি রাস্তার বাঁ দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। শিবির ক্যাডাররা তখন আর তাকে গু-লি করতে পারছিল না। কারণ সামনে-পেছনে, চতুর্দিকে তাদের (শিবিরের) নিজেদের লোক। তাছাড়া শিবিরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, পিস্তল-গু-লির চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কুপি-য়ে যন্ত্রণা দিয়ে কাউকে মারাটা তাদের কাছে অনেক বেশি পছন্দসই। একই ঘটনা ঘটল চৈতীর বেলায়ও। আগে থেকে প্রস্তুত শিবির ক্যাডাররা তখন চারদিক থেকে বো-মা ফাটাতে শুরু করে। যাতে এদিকে কেউ এগিয়ে আসতে সাহস না পায়।

পরিকল্পনা মাফিক চতুর্দিক থেকে তারা ঘিরে ফেলে চৈতীকে। তারপর সমস্বরে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে তাকে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। ইঞ্চি মেপে মেপে যেন তাকে আঘাত করা হয়। তার সারা শরীরে প্রতি এক ইঞ্চি পরপর দেখা গেছে লম্বা-গভীর কোপের দাগ। এখনও তিনি সারা শরীরে সেই ক্ষতের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। শিবির প্রথমে তার পায়ে যে কোপটি দিয়েছিল, তাতে ডান হাঁটুর একটু ওপর থেকে পুরো পা’টিই প্রায় আলাদা হয়ে গিয়েছিল, কোনোমতে এক পাশে একটু চামড়ার সাথে ঝুলেছিল পা’টি। এক সময় কোপা-কুপি-র মধ্যেও কোনো একজন গু-লি চালায় তার ওপর। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেই গু-লিটি না ফোটায় তখনই তাকে মরতে হয়নি। তার সারা শরীর থেকে তীব্র রক্তের স্রোত বেরিয়ে আসছিল। মাথা মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে নাকের ছিদ্রটাও প্রায় বুজে গিয়েছিল। চৈতীর বক্তব্য মতে, তার কানে যেন দূর পরবাস থেকে তখন ভেসে আসতে থাকে তাদের বাক্য বিনিময়। তার মধ্যে একটি বাক্য এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে। যেন খুব দূর থেকে কেউ একজন বলছে, “ভালো করে চেক করে দেখ, মারা গেছে কি-না?” চৈতীর কাছে সারা পৃথিবী তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। তার পরও সজাগ হয়ে ওঠে মস্তিষ্ক। নিশ্বাস-প্রশ্বাস কিছুক্ষণের জন্য হলেও জোর করে বন্ধ রাখার চেষ্টা চালায় সে। শিবির ক্যাডাররা তাই তখন তার হাল্কা প্রশ্বাস নির্গমনটা ধরতে পারেনি। মৃ-ত্যু নিশ্চিত মনে করে তারা বো-মা ফাটাতে ফাটাতে উল্লাস করে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুলে ফিরে গিয়েছিল।

সেদিন তার ওপর হাম-লায় জড়িত ছিল শিবিরের তৎকালীন অনেক পরিচিত মুখ। তাঁদের মধ্যে ছিল – রাবি-র শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, জামায়াতের রোকন, শিবিরের সাথী সহ আরো প্রায় শতাধিক শিবির ক্যাডার।

এর কিছুক্ষণ বাদেই বাইরে থেকে রাবিতে আসা একটি ট্যুর গাড়ি এগিয়ে আসতে থাকে ঘটনাস্থলের দিকে। এতক্ষণ বো-মার জন্য আটকা পড়ে থাকা গাড়িটি শিবির ক্যাডারদের বেরিয়ে যেতে দেখে দ্রুত এলাকা ছাড়তে চাইছিল। গাড়িতে বসা নারীরা প্রথম লক্ষ্য করে লা-শটির দিকে, মৃ-ত্যু নিশ্চিত জেনেও তবু তারা চৈতীর অচেতন দেহটি গাড়িতে তুলে রাজশাহী মেডিকেলে নিয়ে যায়।

ইতোমধ্যে রাবিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সাধারণ ছাত্ররা তখন এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিবির সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেয়া হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য। রাবির সেই দিনের পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ছাত্ররা দলে দলে ছুটতে থাকে মেডিকেলের দিকে। শক্তিহীনতার জন্য বর্বরতার বিরু-দ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে না পারলেও টাকা-পয়সা সহ যার যা ছিল; তা নিয়েই ছুটে যায় চৈতীর চিকিৎসার জন্য। রক্ত দেয়ার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে থাকে ছাত্ররা। ভাগ্য প্রসন্নই বলা যায়। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। অর্থোপেডিক্সের ডাক্তাররা সবাই অপারেশন থিয়েটারে তৈরি ছিল তাদের নিজস্ব রুটিন অনুসারে। চৈতীকে হাসপাতালে নেয়া মাত্র ডাক্তাররা তার জীবন বাঁচানোর জন্য একযোগে কাজে নেমে পরে। রাত ১০টার দিকে একবার ঘোষণা করা হয় – চৈতী মারা গেছে। কিন্তু না, নিজের অদম্য প্রাণশক্তির জোরে তিনি বেঁচে থাকেন বুকে দ্রোহের বীজ নিয়ে। দুই দিন পর জ্ঞান ফেরে তার।

রাবির প্রগতিশীল শিক্ষকরা তখন আতঙ্কে কাঁপছেন। অনেক শিক্ষক রাজশাহী মেডিকেলে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন চাদর মুড়ি দিয়ে। শিবিরের ভয়ে প্রকাশ্যে অনেকেই তখন তার পাশে দাঁড়াতে পারেননি।

এদিকে অনেকে চৈতীকে আর রাজশাহী থাকাটা নিরাপদ মনে করছিলেন না। দ্রুত তাকে সরিয়ে আনা হয় ঢাকার পিজি হাসপাতালে। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। বিদেশি ডাক্তারদের একটি দল তার হাড়ে অপারেশন চালায়। ইতোমধ্যে তার শরীরে হাজার খানেক সেলাই করা হয়েছে। শত শত সেলাই বিহীন ব্যান্ডেজ মোড়া ক্ষত ঢেকে ফেলেছে তার সারা দেহ। কৃত্রিম রগ জুড়ে দেয়া হয়েছে শরীরের অনেক জায়গায়। মৃ-ত্যুর মুখোমুখি চৈতীকে এরপরও শিবিরের নিয়োগকৃত এজেন্টরা হাসপাতালের মধ্যে বার দুয়েক হ-ত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু বন্ধুদের অক্লান্ত রাতজাগা পাহারা শিবিরের নূতন করে হাম-লার সব প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করে। পরে তাকে ঢাকায় আনা হলে পান্না কায়সার, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, হায়দার আকবর খান রনো, ভাষা মতিনসহ আরও অনেকেই দেখতে গিয়েছিলেন।

ঠিক এই সময়টাতেই ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেননের অনুরোধে ভারতের কমিউনিস্ট পাটি (সিপিএম) চৈতীর চিকিৎসার দায়ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতলে। টানা ২ বছর হাসপাতালে থাকতে হয় তাকে। এরপর তিনি দেশে ফেরেন। কিন্তু এখনো প্রতি ৬ মাস অন্তর তাকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়ে রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার জন্য ইলেকট্রোথেরাপি গ্রহণ করতে হয়। আর ভারতে চিকিৎসার সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মাদার তেরেসা, জ্যোতি বসু প্রমুখ দেশি-বিদেশি নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হাসপাতালে গিয়ে তাকে সমবেদনা জানান।

আমারও কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে – খ্রীষ্টান মিশনারী কতৃক পরিচালিত দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজটিতে রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষি-দ্ধ হওয়া সত্ত্বেও একমাত্র শিবির-ই এখানে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পুরোদমে চালিয়ে যেত। উদ্দেশ্য একটাই – দেশের সেরা মেধাবীদের মগজধোলাই করে তদের দলে ভিড়িয়ে জামায়াত – শিবিরপন্থী বুদ্ধিজীবি তৈরি করা। নটর ডেম কলেজেটি মতিঝিল থানার অন্তর্গত হলেও শিবির তাদের এই মহান (!) উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাতে শুধু নটর ডেম কলেজ-এ রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা একটি সাংগঠনিক থানা প্রতিষ্ঠা করেছিল! সাংগঠনিক থানার নামটিও ছিল বেশ চমকপ্রদ – ‘আদর্শ থানা’!!

মফস্বল থেকে আসা মেধাবী ছাত্রদের বাসস্থান সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা নটর ডেম কলেজ সংলগ্ন আরামবাগে মেস ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছে। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মরছে – মগজধোলাইও হয়েছে আবার বেশ ‘টু-পাইস’ ইনকামও করেছে। বেশ কয়েকটা ভবনের পুরোটা তারা ভাড়া নিয়ে নিয়েছিল। নটর ডেম কলেজের ছাত্ররা কেউ বাসস্থান সংকটের কারণে উপায়ন্তর না পেয়ে অথবা কেউ কেউ না জেনে এই মেসগুলোতে উঠত। প্রতি বছরই তাদের এই ব্যবসার প্রসার ঘটাত, ফলে তারা নতুন নতুন ভবন কিংবা ফ্লাট ভাড়া নিত।

এই ছোট ছোট মেসগুলো উদ্বোধন করতে শিবিরের মহানগর সভাপতি কিংবা সেক্রেটারী আসত, দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সাথে তুলনা করলে যেটা অবিশ্বাস্যই মনে হবে। ওই যে বড় বড় নেতাদের আসা-যাওয়া শুরু হয়, সেটা কিন্তু ওখানেই সমাপ্তি নয়; তাদের আসা-যাওয়া চলতেই থাকে। আর সাথে চলে মগজধোলাই পলিসির বাস্তবায়ন, আর কৈ-এর তেলে কৈ ভাজা। এই যে এত বড় বড় নেতারা পদধূলি দিবে তাদেরতো আপ্যায়ণ করাতে হত। আর এই আপ্যায়ণের খরচটাও বেশ বেশি। ভাবতে অবাক লাগবে, এই টাকা আসে ছাত্রদের মাসিক খাবারের জন্য জমা করা টাকার ‘কমন ফান্ড’ থেকে। তার উপর একরকম জোর করেই ‘বায়তুল মাল’ নামক মাসিক চাঁদা নেওয়া হয় প্রত্যক ছাত্রের কাছ থেকে। অনেক বাবার কষ্টার্জিত এই টাকার এভাবেই শ্রাদ্ধ করা হয়।

যাহোক, এরপর উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের এই ছাত্রদের শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য – এই সদ্য কৈশোর পেরুনো ছাত্রদের মন কাঁদামাটির মত নরম থাকতেই শিবিরের বীজ বুনে দেওয়া। এদের বোঝানো যে, তারা শিবিরের কাছে কতটা গুরুত্বপুর্ণ! দেশের অন্যকোন রাজনৈতিক দল এত কম বয়সের কাউকে যে এত গুরুত্ব দিবে না সেটাও কৌশলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ব্যাস, কেল্লা ফতে! বেশিরভাগ কোমলমতি মেধাবী ছাত্ররা এই ফাঁদে পা দেয়। আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবিরের মগজধোলাই পদ্ধিতর বর্ণনা দিলাম মাত্র।

যে হারে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবিরের সদস্য বৃদ্ধি ও কার্যক্রম বেড়ে চলেছে তাতে ২০২০ সালের বাংলদেশে ‘নন-শিবির’ কিংবা ‘এন্টি-শিবির’ বুদ্ধিজীবির অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. আবুল বারকাতের ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও জ-ঙ্গিবাদঃ মমার্থ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গবেষণায়ও এমন তথ্যই উঠে এসেছে। তিনি বর্ণনা করেছেন – ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হ-ত্যার পর থেকে গত ৪০ বছরে মৌ-লবাদী দের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিট মুনাফা করেছে কমপক্ষে ২ লাখ কোটি টাকা। সাতটি বড় খাতে বিনিয়োগ থেকে প্রতিবছর তাদের মুনাফা আসছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। চার দশকে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রয়েছে ইসলাম নামধারী রাজনৈতিক দল জামায়েতে ইসলামী বাংলাদেশ। মুনাফার একটি অংশ ব্যয় করা হচ্ছে জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতায় নামে-বেনামে গড়ে উঠা ১৩২ জ-ঙ্গি সংগঠনের পেছনে। আর বার্ষিক মুনাফার ১০ শতাংশ ব্যয় করে ৫ লাখ দলীয় সদস্যকে বিভিন্ন প্রকল্পে পূর্ণকালীন নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে।

জেএমবি, জেএমজেবি, হুজি, শাহাদত-ই-আল হিকমা ও হিযবুত তাহরীর নিষি-দ্ধ ঘোষণা হলেও এরা নতুন নামে বিভিন্ন জ-ঙ্গি সংগঠন কার্যক্রম চালাচ্ছে। আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্স (এআরসিএফ), আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাওহীদ, তামীরউদ্দীন, লস্কর-ই-তৈয়বা, জয়স-ই-মোহাম্মদসহ অন্তত ২০টি জ-ঙ্গি সংগঠন এখন সক্রিয়। এরা সবাই কোন না কোন ভাবে জামাতের সাথে সম্পৃক্ত। সচেতন ভাবে একটু ঘাটাঘাটি করলে দেখা যায়, এই সব সংগঠন যারা পরিচালনা করছে; তাদের সবাই জামায়াতের সাথে সম্পৃক্ত ছিল এবং তাদেরই মন মানুষিকতা লালন করে। আসলে জামায়াতের থিংক ট্যাংকার নীতিনির্ধারকরা খুব কৌশলে এদেরকে জামায়াত থেকে সরিয়ে অন্য সংগঠন তৈরি করে তা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে নিজেদেরই (জামায়াত) ব্যাকআপের জন্য।

এরা জঘন্য রকমের কোন সন্ত্রা-সী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নিজেদের আত্ম প্রকাশের জানান দেয়। এখনো এমন কয়েকটা খু-নের পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ঘটা করে একটা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এদেরকে অবাঞ্ছিত করে নিজেদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে! মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়কেও এইসব সংবাদ সম্মেলনে বেশ তৎপর দেখা যায়। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায় – ঐসব জ-ঙ্গি সংগঠন গুলো ঠিকই আত্মগোপনে থেকে নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়েই যাচ্ছে।

এইতো কয়েকদিন আগেও খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় নিজেই ঢাকঢোল পিটিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জইশ-ই-মোহাম্মদ, আল্লার দল, হিযবুল মুজাহিদিন, কালেমা-ই-জামাত, আনছারুল্লাহ বাংলা টিম ও হিযবুল মাহাদীর মত জঘন্য জ-ঙ্গি গ্রুপগুলোকে নিষি-দ্ধ করেছিল কিন্তু বাস্তবে তারা আন্ডার গ্রাউন্ডে থেকে নিজে-রা আগের থেকে যেমন বেশি সংগঠিত হচ্ছে তেমনি চালিয়ে যাচ্ছে তাদের তৎপরতা।

ইতোমধ্যে হিযবুত তাহরীর, শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জামায়াতে মুজাহেদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি)- এই পাঁচটি সংগঠনকে জ-ঙ্গি তৎপরতায় জড়িত থাকায় নিষি-দ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু থেমে নেই অ-পকর্ম।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর জ্বালাও পোড়াও সহিং-সতার ঘটনায় বিপুল সংখ্যক জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীর বিরু-দ্ধে মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয়। অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দেয়। জামিনে বেরিয়ে বেশ কিছু নেতাকর্মী বিদেশেও পালিয়ে যায়। বর্তমানে যারা সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় রয়েছে তারাও এখন কোন না কোন ভাবে জ-ঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।

মজার ব্যাপার – জামায়াতের কোনো নেতার ছেলে এখন আর শিবির করে না, আবার প্রকাশ্যে সরকার দলেও যোগ দেয় না। কিন্তু কৌশলে দাড়ি টুপি বাদ দিয়ে টি-শার্ট আর জিন্স প্যান্ট তাদের পোশাক হিসেবে বেছে নেয়। পাশাপাশি সাবেক কয়েকজন শিবির নেতাকে রাজধানীর বিভিন্ন মদের বারে উঠতি বয়সী তরুণদের নিয়ে মগজ ধোলাই করতে দেখা গেছে।

জামায়াত শিবিরের আদি-অন্ত: শেষ পর্ব

লেখক: সায়দুল ইসলাম
পরিচিতি: প্রবাসী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!