বিএনপি কি পারবে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী বলে তারেককে দল থেকে বহিষ্কার করতে?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

সামরিক বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই একজন সামরিক শাসকের তৈরি রাজনৈতিক দল এই বিএনপি। অর্থাৎ জন্মলগ্ন থেকেই দলটি সমস্ত বিধিমালা, আইন বা নীতি থেকে হাজার ক্রোশ দূরে। স্বৈরাচারী শাসকের হাতে তৈরি দলটির নেতারা নিজেদেরকে গণতান্ত্রিক বলে গলাবাজিও করেন। এই দলে গণতন্ত্র চর্চার লেশমাত্র নেই। স্বৈরাচারী শাসকের দলটিতে চলে শুধু স্বেচ্ছাচার। দলীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা, দ্বিমত পোষণ করলেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বিএনপির রাজনীতি করতে হলে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের সামনে হাত কচলাতে হবে, জি হুজুর বলে তোষামোদ করতে হবে, এমনকি দলীয় ফোরামে মুক্ত আলোচনাতেও দ্বিমত করা যাবে না। তাই শুধুমাত্র খালেদা-তারেককে গদিতে সমাসীন রাখতে বদলে ফেলা হয়েছিল দলের গঠনতন্ত্রের একটি ধারা। অর্থাৎ, জনস্বার্থের রাজনীতি নয়, ব্যক্তিস্বার্থই প্রাধান্য পায় এই দলটিতে।

দেখা যাক, কী ছিল সেই সেই ধারায় এবং কেনই বা বদলাতে হয়েছিল ধারাটি-

বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭নং ধারার ‘কমিটির সদস্য পদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা ছিল, ‘নিন্মোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্য পদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তারা হলেন- (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি, (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।

খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমানের মামলার কার্যক্রম যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং রায় ঘোষণার দিন সন্নিকটে, ঠিক তখনই বিএনপির থিংকট্যাংক টের পায়, রায়ে যদি খালেদা এবং তারেক সাজা পান, তবে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে তারা আর দলীয় পদে থাকতে পারবেন না, নির্বাচন করতে পারবেন না। এর অর্থ হলো, বিএনপি যে দুই ‘প্রতিমা’ সামনে রেখে রাজনীতি করে, তারা অযোগ্য বিবেচিত হবেন, ফলে বিএনপির রাজনীতির অপমৃত্যু ঘটবে। এটা বুঝতে পেরে রাতারাতি তারা দলের গঠনতন্ত্রের ৭নং ধারার ওপর খড়গ চালান, ধারাটি বাতিল করেন।

অনেকেরই মনে থাকবে, সে সময় মোজাম্মেল হোসেন নামে বিএনপির এক কর্মী নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন— এই সংশোধনীতে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, তা যেন গ্রহণ করা না হয়। একই সঙ্গে তিনি হাইকোর্টেও সংশোধনী বাতিলের আবেদন করে বলেন, এর ফলে দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য ব্যক্তিরা বিএনপির নেতৃত্বে আসার সুযোগ পাবেন।

কিন্তু কোনো কিছুই বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে চাটুকারিতা এবং একটি অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

খালেদা-তারেক একইসঙ্গে মাইনাস– বিএনপির ইতিহাসে এমন দুঃসময় আর আসেনি। দুর্নীতির দুই মামলায় ১০ এবং ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে খালেদা জিয়ার। তারেকেরও দুর্নীতির দুটি মামলায় ৭ ও ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এছাড়া ২১শে আগস্টে গ্রেনেড ছুড়ে বহু মানুষ হত্যার মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে তার। এসব দণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে তিনি পালিয়ে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় বিএনপিকে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প ছিল না বিএনপির। আর সেজন্যই দলীয় গঠনতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবদান নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দলটি সবদিকেই ব্যর্থ। শুধুমাত্র পকেটের স্বার্থে রাজনৈতিক সাইনবোর্ড টিকিয়ে রেখেছে। মনোনয়ন, কমিটিসহ সব কিছুতেই তারা বাণিজ্য করেন। সেই টাকা যায় লন্ডনে। সেখানে বসে তারা বিদেশি প্রভূদের হয়ে ভাড়ায় খাটেন দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য, ফুলে-ফেঁপে ওঠে তাদের পকেট। করেন বিলাসী জীবন-যাপন। অন্যদিকে এই দলের কর্মী-সমর্থকরা বছরের পর বছর নেতাদের মিথ্যা আশ্বাসের পেছনে ছুটে ছুটে হচ্ছেন হয়রান।

হতাশ নেতা-কর্মীদের সামনে ঝুলছে অদৃশ্য মূলা, বর্তমান সরকারকে কোনোভাবে হঠিয়ে দিতে পারলেই তারেক রহমান দেশে এসে শাসনভার হাতে নেবেন, আর দলের নেতা-কর্মীদের সুদিন ফিরবে। তারা সেই ২০০১-২০০৬ আমলের মত হাওয়া ভবন খুলবেন, লালে লাল হয়ে যাবেন, দুই হাতে ‘মাল’ কামাবেন। এই স্বপ্নে বিভোর নেতা-কর্মীরা ব্যস্ত টিকটক আর ইউটিউবে। গুজব, অপপ্রচার, প্রোপাগান্ডা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলে একটা ম্যাসাকার ঘটানোর অপেক্ষায় আছেন। যদি তা ঘটে, তবেই ক্ষমতায় বসার সুযোগ মিলবে।

কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তো আর নেতা-কর্মীরা গদিতে বসবেন না, বসবেন খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। বাকিরা লাভের বখরা পাবেন বড়জোর। তাই এই দুজনকে দলে টিকিয়ে রাখতে হলে গঠনতন্ত্র তো সামান্য ব্যাপার, অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে মরিয়া এই দলটি।

করোনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ দেশের বিভিন্ন ক্রাইসিস মোমেন্টে বিএনপিকে দেখা যায়না জনগণের পাশে। সিলেটের একটি গ্রামে একটি কলা ও এক বাটি মুড়ি বিতরণের নামে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দুস্থ মানুষের সাথে মশকরা করা এবং বন্যা চলে যাওয়ার পর শুকনো মাঠে-ঘাটে নেমে ত্রাণের নামে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে চাঁদা তুলে তা হজম করে ফেলা বিএনপির আসল চেহারা এই দেশের মানুষ দেখেছে। অবশ্য তাদের কাছে কারো কোনো প্রত্যাশা ছিল না, এখনো নেই।

সাধারণ মানুষ বলেন, গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বিএনপি সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেছে। যে দল দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে, সে দল জনগণের কল্যাণে কী কাজ করবে, তা দেশের মানুষ ধারণা করতে পেরেছে। যে দল লুটপাট করতে ব্যস্ত থাকে তারা মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারবে না- এটাই হলো বাস্তবতা। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দুই শীর্ষ নেতা কীভাবে দল চালাবেন, জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন- তা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। এছাড়া পরবর্তী পর্যায়ে যারা নেতৃত্ব পাওয়ার মত, তারাও প্রত্যেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত। তাদের ছত্রছায়ায় দলকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করা হয়েছে।

এই খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা পায়। দশ ট্রাক অস্ত্র আমদানি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভয়ঙ্কর সব জঙ্গি সংগঠনের জন্ম দিয়েছিল তারেক। বিএনপি সুশাসনের পরিবর্তে দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। তাদের আমলে এদেশ ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবেও অনেক বছর ধরে বিএনপি জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের ভিত্তিতে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে।

সুবিধাবাদ জিন্দাবাদে বিশ্বাস করে বলে বিএনপি দুর্নীতিবাজ দলের প্রশ্রয়ে অপরাধ এবং দুর্নীতি প্রমাণ করেছে তাদের গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে। গঠনতন্ত্র থেকে তারা রাতের অন্ধকারে কলমের এক খোঁচায় ৭নং ধারা বাতিল করেছে। যে ধারায় বলা ছিল চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা বিএনপির নেতা হতে পারবে না, জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন না। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিএনপির নেতা হতে পারবে না। দেউলিয়া ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হতে পারবে না। এই ধারা তারা বাতিল করে প্রমাণ করেছে বিএনপি একটি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজ দল।

দেশবাসী আশা করে বিএনপি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ পরিহার করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। তবে তারা সেটা না করে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। দেশের কল্যাণের চিন্তা বাদ দিয়ে গুজব, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারকেই তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা গঠনতন্ত্র থেকে ৭নং ধারা বাতিল করে দুর্নীতিবাজদের নেতৃত্বে এনেছে, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। যারা ক্ষমতায় থাকতে দুর্নীতির বিচার করেনি- তারাই দুর্নীতি প্রসঙ্গে কথা বলে, জাতিকে সবক দেয়।

বিএনপির এই এলোমেলো, দ্বিধাগ্রস্ত ও অসহায় অবস্থান কেন এবং কীভাবে তৈরি হয়েছে? কে বা কারা এই দলীয় অধঃপতনের জন্য দায়ী, সেই প্রশ্নগুলো ঘুরেফিরে আসছে।

বিশ্লেষকদের মত হচ্ছে, খালেদা জিয়া এবং বিএনপির আজকের এই পরিণতির জন্য দায়ী তারেক রহমান। মা হিসেবে সন্তানকে শাসন করার ব্যর্থতাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। লোভ, ক্ষমতার মদেমত্ত বিপথগামী সাবালক সন্তানকে তিনি শাসন করতে পারেননি। আর তাই তিনি নিজেও করুণ পরিণতির সম্মুখীন। তারেক ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের পরিকল্পনায় ২০০৪ সালে ২১শে আগস্ট জঘন্যতম গ্রেনেড হামলা করে শেষ করে দিতে চেয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের।

এই ঘটনা ক্ষমার অযোগ্য জেনেও খালেদা জিয়া ছেলেকে বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন বেআইনি পন্থার। নিজের শাসনামলে বিচার করেননি এ অপরাধের। বরং উল্টো দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন আক্রান্ত আওয়ামী লীগের ওপরেই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার নোংরা খেলায় ছেলের অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেছেন। এতিমের টাকা লুটপাটের খেলায়ও ছেলের সঙ্গী হয়েছেন। পরিণতিতে শেষ জীবনে নানা রোগব্যাধি নিয়ে নরকযন্ত্রণায় ভুগছেন। ভোগ-বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবনে এরচেয়ে নির্মম পরিণতি আর কী হতে পারে? তবে ভুক্তভোগীরা একে ‘কর্মফল’ বলছেন।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!