১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং রহস্যময় ড. কামালের সাথে খুনিদের সুসম্পর্কের নেপথ্যে

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডকে হালকা করে দেখতে এবং কাউকে আড়াল করার মানসে ঘটনার বিবরণ সম্পর্কে দীর্ঘ ৫ দশক পর এখনো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, বইতে, প্রবন্ধে-নিবন্ধে লেখা হয়- “সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য” এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। যেন হঠাৎ করেই কিছু সেনা সদস্যের মনে হলো এমন কিছু ঘটিয়ে ফেলি, তারপর ঘটে গেল সব কিছু। এর আগে-পেছনে যেন কেউ নেই!

নিঃসন্দেহে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অনেককে দায়মুক্ত করার মানসে “সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য” এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়। একলাইনে, একবাক্যে অতি সূক্ষ্মভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয় সেই ষড়যন্ত্রের দোসরদের নাম-পরিচয় উল্লেখ না করে। যেভাবে এক সময় আমরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়তাম- ‘হানাদার’ বাহিনীর সাথে ৯ মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এখানে হানাদার কে, কীভাবে তাদের সাথে যুদ্ধ হলো, কে নেতৃত্ব দিল, যুদ্ধই বা হলো কেন, কাদের সাথে আমাদের শত্রুতা তৈরী হয়েছে- কয়েকটি প্রজন্মকে এভাবেই ইতিহাস বিমুখ করে রাখা হয়েছিল ৭৫-এর পর।

“সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্য”- শব্দবন্ধটির উৎস সম্পর্কে কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেন-

… সেই আশির দশকের গোড়ার ঘটনা। বাংলাদেশে স্বৈরাচার নিপাতের যে আন্দোলন লন্ডনে তখন চলছিল, তাতে সমর্থন জানিয়ে সুইডেনে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূত আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করে সুইডেনেও এই আন্দোলন গড়ে তোলেন। সুইডেনের তৎকালীন সরকার ছিলেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে। আবদুর রাজ্জাক সুইডিস এমপিদের সহযোগিতায় এই আন্দোলনের সমর্থনে স্টকহোমে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি তখন ঢাকায়।

এ সময় একদিন সকালে শফিক সিদ্দিক (শেখ রেহানার স্বামী) আমার বাসায় এসে হাজির। বললেন, হাসিনা আপা তো স্টকহোম সম্মেলনে যেতে পারবেন না, তাই তিনি সম্মেলনে তাঁর বাণী পাঠাবেন। আপনাকে এই বাণীটি লিখে দিতে হবে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছি। আমি বঙ্গবন্ধুরও ডিকটেনশন অনুযায়ী তার কয়েকটি ভাষণ লিখেছি। এখন তাঁর কন্যার বাণী লিখব।

আমি এই বাণীর এক জায়গায় লিখেছিলাম, ‘সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়ে আমার পিতাকে হত্যা করে।’ এই বাণীটি দেখে দেয়ার জন্য ড. কামাল হোসেনকে দেয়া হলে তিনি সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের কথা কেটে সেখানে যোগ করে দেন- ‘সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত একদল বিপথগামী সামরিক অফিসারের দ্বারা’- এই কথা কয়টি। স্টকহোম সম্মেলনে এই বাণী পঠিত হয়। ড. কামাল হোসেন পরে তার বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে দাবি করেছেন, এই বাণী তিনি লিখে দিয়েছিলেন…।

১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন জার্মানীতে। তখন ড. কামাল হোসেন লন্ডনে। শেখ রেহানা সে সময় ড. কামালকে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের জন্য এবং আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করার জন্য আকুলভাবে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ড. কামাল সেই আবেদনে সাড়া দেননি। ১৫ই আগস্টের পর থেকে জিয়ার শাসনামল পর্যন্ত কখনই ড. কামালকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ব্যাপারে সোচ্চার দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে তিনি রহস্যময় ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, জিয়ার মৃত্যুর পর যখন আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখনও ড. কামালের ভূমিকা ছিল রহস্যদীপ্ত।

১৯৯০ সালে তোলা এক ছবিতে দেখা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ঢাকাস্থ শ্রীলঙ্কান দূতাবাসের এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদার সঙ্গে ড. কামালকে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপচারিতায় রত। তাদের দুজনের হাতে মদের গ্লাস দেখে বোঝা যায়, দুজনের মাঝে বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপ চলছিল।

এর আগেই শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে আসার পর ১৯৮৩ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের সামাজিকভাবে বয়কট এবং তাদের কোন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করেই ড. কামাল বঙ্গবন্ধুর খুনির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। তাদেরকে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যেত।

ছবিটি দেখলে বোঝা যায়, ড. কামালের সঙ্গে খুনি বজলুল হুদার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই খুনির প্রতি কেন তার কোন ঘৃণার উদ্রেক হয়নি? ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেয়, তখন ড. কামাল ছিলেন নীরব। এমনকি যখন বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রয়াত অ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের নেতৃত্বে, তখনও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল ছিলেন ভূমিকাহীন।

১৯৭১ এর ২৫শে মার্চ রাতে ক্র্যাকডাউনের পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারের বাড়িতে বৈঠক হয়, যেখানে ছিলেন ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ এবং ড. কামাল। বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু নির্দেশনা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থের ১৯ ভলিউমে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে, ব্যারিস্টার আমির এবং তাজউদ্দীন- ড. কামালকে নিয়ে ২৫শে মার্চ রাতে গাড়িতে করে পশ্চিম বাংলার উদ্দেশে কুষ্টিয়ার পথে ঢাকা থেকে রওনা হন। যাত্রা শুরুর পরপরই ড. কামাল তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে গাড়ি থেকে নেমে বলে যান যে, তিনি শীঘ্রই ফিরে আসবেন। ব্যারিস্টার আমির এবং তাজউদ্দীন এরপর গাড়িতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু ড. কামাল আর ফেরেননি। অবশেষে তারা দু’জনই কুষ্টিয়ার পথে এগুতে থাকেন। এরপর আর ড. কামালের কোন খবর পাওয়া যায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের পর অবশ্য তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিস্থান থেকে ফিরে এলে জানা গেল, তিনি ৯ মাস শ্বশুরবাড়ি পাকিস্থানেই ছিলেন। তিনি কীভাবে সেখানে গেলেন, কোথায় ছিলেন- এ প্রশ্নগুলোর জবাব পাওয়া যায় পাকিস্থান স্পেশাল সার্ভিসের (আইএসআই) যাকে স্থপতি বলা হয়, সেই মেজর জেনারেল আবু বকর ওসমান মিঠ্ঠার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আনলাইকলি বিগিনিংস’-বইটিতে। মিঠ্ঠা লিখেছেন, ড. কামালকে তিনিই পাকিস্থানে নিরাপদে পৌঁছে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু কেন ড. কামালকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন- এটি ছিল সবারই প্রশ্ন। মূলত এটি ছিল ভুট্টোর এক কৌটিল্য পদ্ধতির ষড়যন্ত্রের সফল ফসল। ভুট্টো ভেবেছিলেন তাদের জামাতা ও নিজস্ব লোক বলে বিবেচিত ড. কামালকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে পাঠাতে পারলে পাকিস্থান লাভবান হবে। তাই তার এই ষড়যন্ত্র।

বঙ্গবন্ধু সবে মুক্তি পেয়েছেন। বিশাল হৃদয়ের এই মানুষের মহানুভবতা ছিল আকাশচুম্বী। তিনি কাউকে সন্দেহ করতে বা অবিশ্বাস করতে পারতেন না। তাই ভুট্টোর ষড়যন্ত্রও তিনি আঁচ করতে পারেননি। যেমন পারেননি মোশতাক, জিয়া, তাহের ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম, মাহবুবুল আলম চাষীদের ষড়যন্ত্র, যেমন পারেননি ডালিমের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে, যে ডালিমকে তিনি ঘরের ছেলের মতই স্নেহ করতেন।

ড. কামালের ’৭৫ পরবর্তী ভূমিকা কী ছিল- এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অতি ঘনিষ্ঠজন ড. ফরাসউদ্দিন যথার্থই বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধু হত্যায় ড. কামালের হাত ছিল কি না এটা খতিয়ে দেখা উচিত। ১৫ই আগস্টের পরপরই যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সভা আহ্বান করা হয়। যেখানে ছিলেন যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক আবুল হাসেম, সাধারণ সম্পাদক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ড. আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী প্রমুখ। সবাই মিলে বহুবার ড. কামালকে অনুরোধ করার পরেও ড. কামাল সেই সভায় যোগ দেননি। তিনি তখন অক্সফোর্ডে। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অবশ্য এসেছিলেন।

এরপর বিশ্বখ্যাত আইরিশ মানবতাবাদী নোবেল লরিয়েট শ্যেন মেকব্রাইটের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠিত হলে ড. কামাল সেই তদন্ত কমিশনে থাকার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে শ্যেন মেকব্রাইটের নেতৃত্বে সর্ব ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠিত হয়, যে পরিষদে ছিলেন- বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মাইকেল বার্নস, ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকী, সৈয়দ আশরাফ, ডা. সেলিম, ডা. জায়েদুল হাসান, অ্যাকাউনটেন্ট রউফ প্রমুখ। কিন্তু ড. কামাল ঐ পরিষদে যোগ দেয়ার প্রস্তাবও নাকচ করেছিলেন।

এসব প্রেক্ষিত বিবেচনা করলে ড. কামাল হোসেনের রহস্যময় ভূমিকা সম্পর্কে অনেকটা আঁচ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা যাকে বিগ আংকেল বলে সম্বোধন করতেন, বারংবার ভুল করেও বঙ্গবন্ধুর স্নেহের আতিশয্য রক্ষা পেয়েছেন, সেই মানুষটির সাথে পাকিস্থানি জেনারেল এবং ঘাতকদের সম্পর্ক নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!