বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অ্যামনেস্টির অপতৎপরতায় শঙ্কিত দেশবাসী

0

সময় এখন:

বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নাক গলানোর কারণে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। নিজেদের কর্মপরিধির বাইরে অন্যান্য বিষয় নিয়ে তাদের যত চিন্তা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে কাজ করেন, এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতে, এসব মানবাধিকার সংস্থা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্রদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। ইঙ্গ-মার্কিন হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কূট-চাল দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব প্যারামিটার কার্যকর, ঠিক সেগুলো নিয়েই অযাচিত হস্তক্ষেপ করে এই সংস্থাগুলো।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এবং তাদের মিত্ররা অন্য দেশগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে, যুদ্ধাপরাধ করলে সেসব নিয়ে কখনই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালদের মত সংস্থাগুলো সাড়াশব্দ করে না। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতে নিজস্ব আইন ও সংবিধান অনুসারে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে নাক গলায় সংস্থাগুলো। মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, নৃশংসভাবে নারী ও শিশু হত্যাসহ জঘন্য অপরাধের দায়ে আদালত কর্তৃক অপরাধী প্রমাণিত হয়ে সর্বোচ্চ সাজা তথা মৃত্যুদাণ্ড ঘোষিত হলেও শুধুমাত্র উন্নত দেশগুলোর স্বার্থ ঠিক রাখতে এসব সর্বোচ্চ সাজার বিরোধিতা করে তথাকথিত মানবাধিকারবারীরা।

ভয়ঙ্কর অপরাধীদের শাস্তি বাতিলে সংস্থাগুলোর তৎপরতা দৃষ্টিকটু। সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড আদৌ মানবাধিকার রক্ষা নাকি লঙ্ঘনে উদ্বুদ্ধ করছে সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ভুক্তভোগীরা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার ব্যবস্থা বাতিলের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল অ্যামনেস্টিসহ অপর সংস্থাগুলো। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এসব সংস্থার কাজটা আসলে কী? কেন তারা অপরাধীদের দণ্ড বাতিলে এত সোচ্চার? কাদের অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে সংস্থাগুলো?

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। এটি একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা। তাদের দাবি অনুসারে, মানবাধিকারের উত্তরণ ও মর্যাদা রক্ষায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত ঘোষণাপত্র বাস্তবায়নে কাজ করছে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি ১৯৭৭ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পায়। ম্যানিফেস্ট অনুসারে তাদের প্রধান কাজ- নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা, নারী নির্যাতন, বিচার ব্যবস্থায় নির্যাতন বন্ধসহ দরিদ্র্, অভিবাসী ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা ও মর্যাদাপ্রাপ্তিতে সহায়তা করা, বৈশ্বিক পর্যায়ে অস্ত্র ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।

অ্যামনেস্টির কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও বিভিন্ন দেশের নিজস্ব আইন ও সংবিধান অনুসারে প্রতিষ্ঠিত বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ রহিতকরণ বিষয়ে কর্মকাণ্ড বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। সংস্থাটি শক্তিধর দেশগুলোর পক্ষে ভাড়াটে দালাল হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনিরা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক, তাদেরকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে নানারকম অজুহাত দেখানো হয়। কারণ, বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, যা অ্যামনেস্টি সমর্থন করে না।

অথচ একইরকম অপরাধে দণ্ডিত আসামি, যারা উন্নত দেশগুলোর নাগরিক, তাদেরকে বিভিন্ন দেশে আটক অবস্থা থেকে নানারকম চাপ ও স্যাংশনের ভয় দেখিয়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা ওসামা বিন লাদেনের অপরাধীদেরকে নিজ নিজ দেশের আইন ও বিচারের দ্বারস্থ না করে উল্টো গায়ের জোরে বিভিন্ন দেশে অনুপ্রবেশ করে হত্যা কিংবা বন্দী করে অন্যত্র নিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টি বা হিউম্যান রাইটসওয়াচের মত সংস্থাগুলো নীরব ভূমিকা পালন করে। অন্য দেশের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো যে দৃষ্টিতে দেখা হয়, ঠিক একই ধরণের অপরাধ, যেমন- বর্ণবৈষম্যের কারণে পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যার মত ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সংস্থাগুলো। এসব কারণেই অ্যামনেস্টির মত সংস্থাগুলোর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ।

বিশ্লেষকদের মতে, অ্যামনেস্টি তাদের অর্থ যোগানদাতা দেশগুলোর স্বার্থরক্ষায় পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা উদীয়মান দেশগুলোকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্রদের পক্ষে কাজ করছে। যার কিছু উদাহরণ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে রীতিমত এক আতঙ্কের নাম চীন। কোনোভাবেই চীনা অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করা যাচ্ছে না, চীনকে অবরোধ দিলে নিজেদের দেশের উৎপাদন ও কাঁচামাল আমদানির সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তাই অ্যমনেস্টি এবং অপর সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নানা কৌশল খাটানোর চেষ্টা চলছে চীনের বিরুদ্ধে।

এজন্য চীনের আভ্যন্তরীণ বিষয়, যেমন উইঘুর ইস্যু নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত করার চেষ্টা করেছে অ্যামনেস্টি ও অপর ভাড়াটে দালাল সংস্থাগুলো। নানারকম অতিরঞ্জিত খবর ছড়ানো হয়েছে পোষা গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে। অথচ কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। উইঘুরের ক্ষেত্রে তাদের ভিন্ন হিসাব। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বিচারে অস্ত্র বেচাকেনা ও সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে অ্যামনেস্টির চাপ দেখা যায় না- সংস্থাটির ম্যানিফেস্টে অস্ত্রের অপব্যবহার রোধ সংক্রান্ত এজেন্ডা থাকলেও অবাধে অস্ত্র বিক্রিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি স্বাধীনতা আখ্যা দেয়া হয়।

মিয়ানমারে দেড় থেকে দুই মিলিয়ন রোহিঙ্গার ওপর নির্যাতন নিয়ে সেভাবে বড় ধরণের সাড়াশব্দ করেনি সংস্থাগুলো। এমনকি মিয়ানমারের ওপর স্যাংশন আরোপও করেনি। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অ্যামনেস্টি সোচ্চার, যে বাংলাদেশ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং উন্নত জীবন-যাপনের ব্যবস্থা করেছে শুধুমাত্র মানবিকতার খাতিরে। অথচ প্রায়শ অ্যামনেস্টির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পেজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশবিরোধী গুজব ও অপপ্রচার চালানো হয়। ২০২০ সালের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

২০২০ সালের ১০ই জানুয়ারি নিজেদের অফিসিয়াল পেজ থেকে একটি পোস্ট করে সবাইকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সেই পোস্টে তারা যে ছবি ব্যবহার করেছিল তা ছিল সিরিয়ার। সেখানে একটি ধ্বসে পড়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় দুই শিশুকে। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে অনেক সাধারণ মানুষ ভুল সময় ভুল স্থানে থাকার কারণে আক্রমণ, ভায়োলেন্স ও মৃত্যুর মুখে পড়ছে। যুদ্ধ ও সংঘর্ষের সময় আক্রান্তদের কথা প্রকাশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা। না বলা গল্পগুলো জানাতে লাখো মানুষের এই আন্দোলনে আপনিও যোগ দিন।’

এমন মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ সরকার। এই প্রতিক্রিয়া এতটাই কঠিন ছিল যে, তা অ্যামনেস্টির জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। তারা ধারণাও করতে পারেনি যে, বাংলাদেশ এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে। দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে মাত্র ৪ দিনের মাথায় নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে অ্যামনেস্টি তাদের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে ক্ষমা চায়। পোস্টে লিখেছে- ‘আক্রমণ, ভায়োলেন্স ও মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ভুলক্রমে বাংলাদেশের নাম জড়ানোর কারণে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ক্ষমা চাইছে। আমরা আমাদের দোষ স্বীকার করে নিচ্ছি এবং বাংলাদেশের মানুষ ও যারা এতে কষ্ট পেয়েছেন তাদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাচ্ছি। ফেসবুক পোস্টটি ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ভুল আর না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবে। আমরা স্বীকার করছি বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধ, সংঘাত চলছে না। বরং মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা অন্তত ১০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।’

তবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মত তথ্যসন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মত বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পরে ছোট্ট করে ক্ষমা চাওয়ার এই পদ্ধতিটা গুজব সৃষ্টি করে উস্কানি দেওয়ার জন্য একটা নিরাপদ পদ্ধতি। কারণ, ৪ দিনের ব্যবধানে লাখ লাখ শেয়ার হয়েছে সেই মিথ্যা পোস্ট। তাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়েছে চরমভাবে। বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রচারিত হলো একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সংস্থার মাধ্যমে। সিরিয়ার ছবিকে বাংলাদেশের দাবি করা সেই ভুয়া পোস্টটি বিজ্ঞাপন আকারে ছড়ানো হয়েছিল বিশ্বব্যাপী। অথচ বিপরীতে তাদের ক্ষমা চাওয়া পোস্টটি তেমন প্রচার পায়নি। এভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বড় মাপের ষড়যন্ত্রের স্বরূপ দেখেছে দেশের মানুষ। তবে এখানেই শেষ নয়। আরও কিছু ঘটনা আছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে চলছে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত সরকার অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। ভারতের রাজনীতি, ভারত সরকারের অবস্থান এবং আভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপের দায়ে অ্যামনেস্টির ওপর ভারত সরকার অনেকদিন ধরেই নজরদারি করছিল। এরইমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারে অ্যামনেস্টির অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেনের খবর। বিভিন্ন দেশ থেকে অ্যামনেস্টির কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন করা হচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়া বহুদিন ধরেই বিদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করছে এবং তার মাধ্যমে ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট’ বা এফসিআরএ লঙ্ঘন করে আসছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অ্যামেনেস্টির ভারতীয় কার্যালয় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) রুট ব্যবহার করে ব্রিটেন থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান পেয়েছে – যা আইনত তারা করতে পারে না। বস্তুত ২০১৮ সালেই ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) ভারতে অ্যামনেস্টির সব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে। বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এমন অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে নতুন কিছু নয়। ভারত ছাড়াও কয়েকটি দেশে অ্যামনেস্টির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগের কারণেই।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে যে পর্যায়ে ছিল এবং বর্তমানে যেখানে পৌঁছেছে, এই দুই সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে পার্থক্যটা সহজেই চোখে পড়বে। খালেদা জিয়া সরকারের সময় মাত্র ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো দেশে, লোডশেডিং ছিল দিনে গড়ে ১৬-১৮ ঘণ্টা। সেখান থেকে আজ দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে, সারাদেশে হাজার হাজার কল-কারখানা গড়ে উঠেছে, শিল্পখাতে অসামান্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সরকার ক্রমেই জ্বালানি সাশ্রয়ী বড় বড় আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে, সেইসাথে অধিক খরুচে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটকারী বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর চক্ষুশূলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ খাত নিয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক অপপ্রচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের অর্থায়নে পরিচালিত গুজবসেল। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির অঙ্গ সংঠগন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের বাঁশখালী উপজেলার নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরী ফেসবুকে উস্কানিমূলক পোস্ট দেন। যার প্রেক্ষিতে সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ ও নাশকতা করে। এস আলম গ্রুপের নির্মাণাধীন একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শ্রমিক বিক্ষোভে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এতে বাধা দিতে গেলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে পুলিশ গুলি চালালে ৭ শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় অনেকেই আহত হন।

এই ঘটনায় উস্কানি প্রদানের দায়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শাহনেওয়াজ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বাঁশখালী থানায় মামলা করেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিফ কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ। শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৯ ও ৩১ ধারায় অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, শাহনেওয়াজ তার ফেসবুক আইডি থেকে গন্ডামারায় নির্মাণাধীন এসএস পাওয়ার লিমিটেডের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতি এলাকার মানুষের ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করেন। তিনি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি করতে লোকজনকে প্ররোচিত করেন।

অবাক করা ব্যাপার হলো, শাহনেওয়াজ চৌধুরীর রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার দেওয়া ফেসবুক পোস্টে উস্কানি বিষয়ক তথ্য চেপে যায় প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারসহ একই ঘরানার পত্রিকাগুলো। বিএনপির কর্মী উল্লেখ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই শাহনেওয়াজের উস্কানির উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারত। তাই সরকারবিরোধী অবস্থান তৈরি ও মত প্রকাশের অধিকারের ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর অবস্থান বোঝাতে শাহনেওয়াজের বিষয়ে অসম্পূর্ণ তথ্য সম্বলিত সংবাদ প্রকাশ করা হয় বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। বরং পত্রিকাগুলোতে সংবাদটি এমনভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, যে কেউ ভাববে- ‘ফেসবুকে পোস্ট করার কারণেই’ শাহনেওয়াজ গ্রেপ্তার হয়েছেন। অথচ তার ফেসবুক পোস্ট এলাকায় কত বড় ক্ষতির কারণ তৈরি করেছে, সেই ‘ইমপ্যাক্ট’ সযত্নে চেপে যাওয়া হয়েছে।

বিএনপি এবং সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো শাহনেওয়াজের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দায়ী করছে সরকারকে। যদিও তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ। শুধু তা-ই নয়, শাহনেওয়াজ গ্রেপ্তারের ইস্যুটি জিইয়ে রাখার জন্য বিএনপির পলাতক নেতা তারেক রহমানের অর্থায়নে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকারবারী সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে বলে অভিমত অনেকের। মানবাধিকারবারিরা বাংলাদেশের জনগণের সামনে নাকি কান্না করছে শাহনেওয়াজের মুক্তির দাবিতে। এমনকি অর্থের বিনিময়ে দিনের পর দিন বিজ্ঞাপন হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে অ্যামনেস্টির সেই বিভ্রান্তিকর পোস্ট। যাতে দাবি করা হয়েছে- ফেসবুক পোস্ট দেওয়ার কারণে শাহনেওয়াজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একইসাথে তারা শাহনেওয়াজের মুক্তির দাবিতে পিটিশন ফর্ম খুলেছে। এসবই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

এই সেই অ্যামনেস্টি, যারা কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদর আলশামস বাহিনীর কসাই হিসেবে নিয়োজিত জামায়াত ও বিএনপি নেতাদেরকে যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালের হাত থেকে রক্ষা করতেও পিটিশন ফর্ম খুলেছিল। লন্ডন বসে বিএনপি-জামায়াতের গুজবসেল-এর অর্থ যোগানদাতা তারেক রহমান এখন অর্থায়ন করছেন অ্যামনেস্টির পেছনে। আবারও বাংলাদেশের মানুষের মাঝে বিভ্রান্তিকর, মিথ্যা সংবাদ ও গুজব ছড়াচ্ছে এই কুখ্যাত সংস্থাটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্রদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে ইতিপূর্বে গুম-খুন নিয়ে বাংলাদেশকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিল এই লেজড়ু সংস্থাগুলো। কিন্তু সরকারের অনমনীয় অবস্থান ও সঠিক তথ্য তুলে ধরায় উল্টো সংস্থাগুলোর পরিবেশিত তথ্যের অসারতা প্রমাণিত হয়েছে। একইসাথে তাদের কার্যক্রমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতে যেভাবে অ্যামনেস্টির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, একইভাবে বাংলাদেশেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠেছে সাধারণ দেশপ্রেমিক মানুষের মাঝে। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি, আভ্যন্তরীণ বিষয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধাচরণ করে যারা, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে যারা, তাদের কোনো কার্যক্রম এদেশে চলতে পারে না। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!