জাতিসংঘে বক্তৃতায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ৪ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

0

সময় এখন ডেস্ক:

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যেতে হবে, যেখানে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বাস করেছিল। এ সংকটের সমাধানে ৪টি প্রস্তাব তিনি জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে উপস্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামীকাল শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি এ ৪ প্রস্তাব তুলে ধরবেন বিশ্বনেতাদের সামনে। খবর বাসস ও বিডিনিউজ।

মঙ্গলবারের সভায় বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, যে প্রস্তাবগুলো আমি জাতিসংঘের চলতি ৭৪তম অধিবেশনে উত্থাপন করব সেগুলো উল্লেখ করছি।

যেগুলো হচ্ছে- ১. রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবর্তন বিষয়ে মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছে সুস্পষ্ট করতে হবে। এ জন্য রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কী করছে সেটাও সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে। ২. বৈষম্যমূলক আইন ও চর্চা পরিত্যাগ করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের রাখাইন রাজ্যে ‘যাও এবং দেখ’- এ নীতিতে পরিদর্শনের অনুমতি দিয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। ৩. রাখাইন রাজ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেসামরিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই রোহিঙ্গাসহ সবার নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। ৪. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্য নিশ্চিত করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ এবং রোহিঙ্গাদের বিরু’দ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা দূর করা হয়েছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, ওআইসি মহাসচিব ইউসেফ বিন আহমেদ আল-ওথাইমেন এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইব্রাহিম বিন আবদুল আজিজ আল-আসাফও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা যোগ দেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সার্বিয়া, ফিলিপাইন ও গাম্বিয়ার প্রতিনিধিরাও যোগ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক, রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো রকম সমাধান ছাড়াই আমরা আরও একটি বছর পার করে দিয়েছি। মিয়ানমারের উত্তর রাখাইন রাজ্যে নিপী’ড়িত রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, টেকসই, নিরাপদ এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের বিরু’দ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চলমান কার্যক্রম অনুসরণ করছে। আমরা বিশ্বাস করি, ওআইসি তার জবাবদিহিতা সম্পর্কিত অ্যাডহক মন্ত্রিপরিষদ কমিটির মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা পূরণেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো ভালো কিছু নয়। অনেক রোহিঙ্গা ব্যক্তি রাখাইনের অভ্যন্তরীণ-বাস্তুচ্যুত শিবিরে (আইডিপি) বাস করছে এবং দিনে দিনে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। একই টেবিলে বসে মধ্যাহ্নভোজও করেছেন তারা। জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বনেতারা এখন নিউইয়র্কে রয়েছেন। সম্মেলনে আসা বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে মঙ্গলবার দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জে মঙ্গলবার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজের সময় দুই নেতা শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার রাতে লোট্টে নিউইয়র্ক প্যালেস হোটেলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সংবর্ধনায়ও যোগ দেন।

টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জের মধ্যাহ্নভোজে বিভিন্ন নেতা পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। এক সময় ট্রাম্প এগিয়ে আসেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তাদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলাপ করতে দেখা যায়। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলসহ অন্য নেতাদের সঙ্গেও শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়।

পরে জাতিসংঘ মহাসচিব নিজের টেবিলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বসেন। একই টেবিলে আরও বসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলসহ বেশ কয়েক বিশ্বনেতা।

এসডিজি অর্জনে অর্থবহ অংশীদারত্বে গুরুত্বারোপ

টেকসই লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে স্থানীয় এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে অর্থবহ অংশীদারত্ব এবং সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে কার্যকর অংশীদারত্ব এবং সহযোগিতা স্থানীয় এবং বৈশ্বিক- উভয় পর্যায়ে সমভাবেই প্রয়োজনীয়। কাজেই আমি বিশ্বনেতাদের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারে অটুট থাকার অনুরোধ জানাব, যা আমরা এই গ্রহ এবং মানুষের জন্য করেছি।

জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে মঙ্গলবার বিকালে টেকসই উন্নয়নের ওপর উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে ‘লোকালাইজিং দ্য এসডিজিস’-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কো-মডারেটরের দায়িত্ব পালনকালে ভাষণে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত আমরা একত্রে এসডিজির সুবিধাগুলোকে সবচেয়ে প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছাতে পারব, যাদের অবস্থান প্রায়ই সমাজের একেবারে তলানিতে থাকে।

তিনি বলেন, এসডিজি স্থানীয়করণ হলো স্থানীয় স্তরে কৌশলগুলো বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া, যা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগগুলো প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া এবং এর ব্যবহার দ্রুত করতে জাতীয় তথ্য সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে। আমরা সম্পদ সংগ্রহ এবং ইনোভেটিভ ফিন্যান্সিং বাস্তবে রূপ দিতে বেসরকারি সেক্টর ও দায়িত্বশীল সুশীল সমাজকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি। তবে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো আমাদেরও বহুমুখী ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারদের সমর্থন প্রয়োজন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রশাসক অ্যাচিম স্টেইনার, ইন্টার পার্লামেন্টারিয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট গ্যাবরিয়েলা চ্যুয়েভাস ব্যারন, ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়র মেয়র ত্রি রিসমহারিনি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মো. আবুল কালাম আজাদ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

গান্ধীর আদর্শ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে

মহাত্মা গান্ধীর মানবিক আদর্শ ও মূল্যবোধ সব ধরনের বিভেদ ও অনৈক্যের ওপর বিজয়ী হয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন হিংসা-বিদ্বেষ ও ধর্মান্ধতা সমাজকে সন্ত্রা’সবাদ এবং সহিংস চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গান্ধীজীর জীবনাদর্শন ও সব শ্রেণির মানুষের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন বিদ্যমান ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জলবায়ুর প্রভাবের মতো দুরূহ চ্যালেঞ্জগুলোর অর্থবহ ও কার্যকর মোকাবিলায় আমাদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।

গত মঙ্গলবার বিকালে নিউইয়র্কে সমসাময়িক বিশ্বে মহাত্মা গান্ধীর প্রাসঙ্গিকতা শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী মিশন মহাত্মা গান্ধীর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী পালনের অংশ হিসেবে জাতিসংঘের ইকোসক চেম্বারে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

শেখ হাসিনা বলেন, ধর্ম-বর্ণ ও জাতি সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাকে মহাত্মার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর বুদ্ধিদীপ্ত চৌকস নেতৃত্ব, তার ত্যাগ ও মানুষের জন্য সংগ্রামের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর অনেক মিল পাই।

অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লুন-জে-ইন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরদারনসহ ৭ জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করেন।

শেয়ার করুন !
  • 440
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!