জরাজীর্ণ ইঞ্জিন-বগি, বেহাল ওয়ার্কশপ নিয়ে চলছে রেলওয়ে

0

সময় এখন ডেস্ক:

ট্রেনের টিকিট মেলে না আসন সং’কটের কারণে। আর এর নেপথ্যে প্রকৃত কারণ ইঞ্জিন-বগির অভাব। মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও এগুলো চালানো হচ্ছে জোড়াতালি দিয়ে।

ইঞ্জিন-বগির অনেক বেশি সং’কট থাকায় এ থেকে পরিত্রাণ পেতে নতুন লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচ (বগি) কেনা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনাই শুধু নয়, মান নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। ধরা পড়ার পরও ফের একই মানের ট্রেন কেনার প্রস্তাব পাঠানোর নজিরও রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ত্রুটিও। রেলের ৩টি ওয়ার্কশপ আছে। এগুলোর দশাও খুবই সঙ্গিন। অথচ বাজেটে এ খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিয়ে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, বর্তমানে রেলওয়েতে ৬৮ শতাংশ ইঞ্জিনেরই আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে। বিভিন্ন উৎস থেকে ইঞ্জিন-বগি আসছে। ভারত থেকে ধারে যেসব ইঞ্জিন আসার কথা, সেগুলো ২০২২ সাল নাগাদ পাওয়া যাবে। সং’কট কাটাতে এর আগেই আমরা তাদের কাছে ক্রয় অথবা ভাড়ায় কিছু ইঞ্জিন চেয়েছিলাম। তারা বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আমাদের ২০টি ইঞ্জিন দিতে রাজি হয়েছে। এর ১০টা মিটার গেজ, ১০টা ব্রডগেজ।

জানা গেছে, রেলের লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) রয়েছে মোট ২৬৩টি। এর মধ্যে ১৭৩টি মিটারগেজ ও ৯০টি ব্রডগেজ। ইঞ্জিনের সাধারণ মেয়াদ থাকে ২০ বছর। সেই অর্থে মেয়াদ আছে এমন ইঞ্জিন আছে মাত্র ৭৮টি। এ ছাড়া ৪৪টির বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর, ৫৫টির বয়স ৪০ বছরের মধ্যে এবং ৮৬টি ইঞ্জিনের বয়স ৪১ বছরোর্ধ্ব।

একইভাবে বগি আছে মোট ১ হাজার ১৪৫টি। এর মধ্যে ৩৫ বছরের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে ৭৫১টির। এমতাবস্থায় ২০০টি ব্রডগেজ কোচ কেনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) লোন নেওয়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। বর্তমানে ৪২৮টি ব্রডগেজ কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ১৮৭টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এমন বাস্তবতায় ২০২৩ সালের মধ্যে রেলের বহরে ২০০ কোচ যোগ হবে, আশা করছে রেল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে গত ১৬ জুলাই ৬ সেট ডেমু ট্রেন কেনার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় একনেক বৈঠকে। বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক ও ঢাকার মধ্যে শাটল ট্রেন চালুর লক্ষ্যে এ ট্রেন কেনার জন্য ৪৫১ কোটি টাকার প্রকল্পটি উত্থাপন করা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেমু ট্রেন না কেনার পক্ষে মত দিয়ে বলেন, এর আগে কেনা ডেমু ট্রেনগুলো যাত্রীদের উপকারে আসেনি এবং অনেকগুলো নষ্ট হয়ে আছে। তাই নতুন করে এ ট্রেন কেনা হবে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৩ সালের এপ্রিলে চালু হয় ডেমু ট্রেন। উদ্বোধনের দিনই ডেমু অচল হয়ে পড়ে। আসন সমস্যা, হাতল ও জানালা না-থাকার সমস্যা চিহ্নিত হয়। পরে দেখা যায়, যন্ত্রপাতিরও সমস্যা রয়েছে। অথচ ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০ সেট ডেমু কেনা হয়েছিল। এগুলোর অর্ধেকই এখন অকেজো। যেগুলো চলছে সেগুলোর অবস্থাও খারাপ। নেই রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত সুবিধা। তথাপি নতুন করে ডেমু ট্রেন কেনার প্রস্তাব পাঠানো নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে রেল ভবনে।

সূত্র জানায়, রেলের ইঞ্জিন-বগি সং’কট দূর করতে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল। সরকার রেলে বরাদ্দ দিলেও কম প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করতে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ অবস্থা থেকে দ্রুত বের না হলে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রেলের রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে চলে আসে। রেলওয়ের ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও মালামাল ক্রয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বৈঠক হয় রেল ভবনে। বেশ কয়েক মাস আগের ওই বৈঠকে বলা হয়, বর্তমানে মানসম্মত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না।

কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রয়োজনের সময় জরুরি মালামাল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া ভারী মেরামতে যেসব আইটেম থাকা দরকার সেগুলো নেই। অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য মেরামতাধীন ইঞ্জিন থেকে ক্যানিবালেইজ করে (একটা থেকে খুলে আরেকটায় লাগানো বা জোড়াতালি দেওয়া) ডেলিভারি (আউটটার্ন) দেওয়া হয়। এ সং’কট থেকে উত্তরণ জরুরি হয়ে পড়ছে।

সূত্র মতে, রেলের কারখানা ও রানিংশেডে একদিকে রয়েছে জনবল সং’কট, অন্যদিকে যন্ত্রাংশের অভাব। যেমন- সিলিন্ডার লাইনার, পিস্টন, রিং, কমপ্রেশার ও টার্বোচার্জারের মতো অত্যাবশ্যকীয় মালামাল না থাকায় মেরামত সম্ভব হচ্ছে না। ৬ বছর পর পর ভারী মেরামতকে বোঝায় জিওএইচ তথা জেনারেল ওভারহোলিং। এ ছাড়া অনেক লোকোমোটিভ চলছে ট্রাকশন মোটর ঘাটতি নিয়ে। বিয়ারিংয়ের অভাবে ট্রাকশন মোটর মেরামত করা যাচ্ছে না; বোল্ট ত্রুটির কারণে ট্রাকশন মোটর ক্যাপ ভেঙে যাচ্ছে।

এ ছাড়া চলাচলের সময় লোকোমোটিভের উইক ফেল্ট ও সাপোর্ট বিয়ারিংয়ের সমস্যায় ক্ষ’তিগ্রস্ত হচ্ছে এক্সেল। আছে শক অ্যাবজরভারে ত্রুটি। এটি বিদেশ থেকে আনার পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করায় এ অবস্থা হয়েছে। ইঞ্জিনের আরেকটি সমস্যা হচ্ছে- ল্যুব অয়েলের লো প্রেশার ও ব্রেক প্রেশার। শোনা যাচ্ছে, কন্টাক্ট টিপ খারাপ ও নিম্নমানের হওয়ায় কুলিং ফ্যান উইন্ডিংয়েও নাকি সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় তুলে ধরলে বৈঠকে এডিজির পক্ষ থেকে কর্মকর্তাদের বলা হয়- বহরে নতুন লোকোমোটিভ যুক্ত হতে ২-৩ বছর সময় লাগবে। এ সময়ে সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

রেলের মেকানিক্যাল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রেলে বিদ্যমান ৩টি ওয়ার্কশপের অবস্থা খুবই করুণ। অনেক পুরনো যন্ত্রপাতি, আধুনিক যন্ত্রপাতি না কেনা, সক্ষমতা সং’কট ও খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব ইত্যাদি কারণে ওয়ার্কশপগুলো ক্রমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে অনেক দক্ষ কর্মচারী আছেন যারা ইতোমধ্যে অবসরে চলে গেছেন। তাই দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে ওয়ার্কশপ চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। বিপুল অর্থে কেনা ইঞ্জিন-বগি মেরামত করা যাচ্ছে না ওয়ার্কশপগুলো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করায়।

রেল সূত্র মতে, ১৯৯২ সালে পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা চালু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। যন্ত্রাংশ সং’কটে এখানে ইঞ্জিনের মেরামতকাজ ব্যাহত হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে বর্তমানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ৪০ শতাংশই কারখানায় নেই।

চীন থেকে কেনা ডেমু ট্রেন মেরামতেও এ লোকোমোটিভ কারখানা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ ছাড়া প্রতিবছর কমছে ইঞ্জিন-কোচ মেরামতের কাজ। ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রেলওয়ের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপ। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের যাত্রা শুরু ১৯৪৭ সালে।

যদিও প্রয়োজনীয় লোকবলের সং’কট এবং বাজেটে প্রয়োজনমত বরাদ্দ থাকে না। তবু রেলের যাত্রীবাহী কোচ, পণ্যবাহী ওয়াগন ও ইঞ্জিন মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ওয়ার্কশপ দুটি।

শেয়ার করুন !
  • 54
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply