বুয়েটে ছাত্র নির্যা’তনের আরও কিছু বিবরণ, রিমান্ডে ৩ জন

0

বুয়েট প্রতিনিধি:

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ছাত্র আবরার হ’ত্যার পর মুখ খুলতে শুরু করেছেন নির্যা’তিত সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যারা প্রাণভ’য়ে এতদিন নির্যা’তনের কথা গোপন রেখেছিলেন, তারা ফাঁ’স করছেন তাদের ওপর রোম’হর্ষক সব নির্যা’তনের ঘটনা। ‘ইউ রিপোর্টার’ নামে বুয়েটের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ করছেন চরম নির্যা’তনের শি’কার শিক্ষার্থীরা।

এদিকে আবরার হ’ত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রলীগের ৩ নেতাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টায় তিতুমীর হলের সাবেক এক শিক্ষার্থী নিজের পরিচয় না দিয়ে হল প্রভোস্ট বরাবর অভিযোগে লিখেন, নিজেকে শিবির বলে স্বীকার করানোর জন্য তার ওপর চলে হুবহু আবরারের মতোই অকল্পনীয় নির্যা’তন। ‘ইউ রিপোর্টার’ নামে বুয়েটের ওয়েবসাইটে ওই শিক্ষার্থী তুলে ধরেছেন, তাকে বস্তাব’ন্দী করে কীভাবে ভয়’ঙ্কর নির্যা’তন করা হয়েছিল।

তার অভিযোগ, ২০০৬ নম্বর রুমে তাকে ডেকে নিয়ে যায় ১২ ব্যাচের জাওয়াদ। তার কোনো ধারণাই ছিল না তাকে কেন ডাকা হয়েছে। সেখানে ৯ম ব্যাচের শুভ্র টিকাদার, সিয়াম, শুভম, ১০ম ব্যাচের কনক, রাসেল আর ১১তম ব্যাচের তানভীর রায়হান (টিআর নামে কু’খ্যাত) তাকে জিজ্ঞাসা’বাদ শুরু করে।

ওই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই আজগু’বিভাবে আমি শিবির করি এটা প্রমাণ করার জন্য আমাকে টর্চার করে। প্রথমে তানভীর আমাকে গালে প্রচণ্ড থাপ্প’ড় মা’রে। আমি মাথা ঘুরে যাই। ঠোঁট কে’টে যায়। এটা ওদের টেকনিক। আচমকা আঘা’ত করে টর্চারের মুড ক্রিয়েট করে। এরপর তানভীর আমার বুকে প্রচণ্ড এক লা’থি মা’রে। আমি মেঝেতে পড়ে যাই। কেউ এসে তোলে আমাকে। এরপর আমাকে জো’র করে স্বীকার করতে বলে যে আমি শিবির করি।

স্বীকার না করলে আমার মাথায় একটা বস্তা পরিয়ে দিয়ে বেঁ’ধে দেওয়া হয়। এরপর শুধু মুহুর্মু’হু রডের বাড়ি পড়তে লাগল পিঠের ওপরে। একজন মনে হয় টায়ার্ড হয়ে রডটা রাখতেই আরেকজন রড হাতে তুলে নেয়। এভাবে থেমে থেমে প্রায় ১ ঘণ্টা বস্তাব’ন্দী হয়ে মা’র খেয়েছিলাম।’

রোম’হর্ষক নির্যা’তনের শি’কার সাবেক ওই ছাত্র অভিযোগে জানান, এ অবস্থায় যখন সে জ্ঞান হা’রিয়ে ফেলার অবস্থায় তখন বর্ব’র অত্যা’চারীরা আশ্রয় নেন নতুন টেকনিকের। মাথা থেকে বস্তা খুলে একজন এসে খুব আদর করে তাকে রক্ষা করার ভান করে বলে, সে যদি বলে ‘আমি শিবির করি’ তাহলেই সে অন্যদের থেকে বাঁচিয়ে নেবে।

তিনি বলেন, কিন্তু আমি আল্লাহর রহমতে ঘোরের মধ্যেও বুঝতে পারি এটাও ওদের চাল। এরপর আবার মা’র দিতে থাকে। এক পর্যায়ে আমাকে ক্রসফা’য়ারে দেওয়ার হুম’কি দেয়। শুভম এসে আমার পা ভে’ঙে ফেলার পরামর্শ দেয়। পরামর্শ শুনে কাজল আর রাসেল মিলে আবার পূর্ণোদ্যমে আমার পা লক্ষ্য করে রড দিয়ে পেটানো শুরু করে। একপাশ হয়ে যাওয়ায় সব মা’র এসে লাগে বাম পায়ে।

একপর্যায়ে আল্লাহপাক মুখ তুলে তাকায়। ওরা কোনো কারণে আমার ওপরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমাকে চলে যেতে বলে। আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যাওয়ার সময় হলের গেটে আমাকে বলে, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবি রাস্তায় এক্সি’ডেন্ট করছিস। ৫ বার আমাকে দিয়ে মিথ্যা উত্তর প্র্যাকটিস করিয়ে যখন ছেড়ে দেয় তখন রাত ৩টা। আমি এখন কোথায় যাব হল থেকে? কোনো রিক্সাও পাওয়া যাচ্ছে না। শরীরে একফোঁটা শক্তি অবশিষ্ট নেই।

কিন্তু যত দ্রুত পারা যায় ওদের দৃষ্টির সীমানা থেকে চলে যেতে চাচ্ছিলাম, যদি আবার সেই জাহান্নামে ডাকে! খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তিতুমীর থেকে বের হয়ে পলাশীর কাছে এসে একটা রিক্সা ডাকি শরীরের সব শক্তি জড়ো করে। তারপর আমার চাচার বাসায় চলে যাই। এর পরের বুয়েটের বাকি সময়টা একটা ট্রমা নিয়ে কাটিয়েছি।

এভাবেই সাবেক ওই শিক্ষার্থী তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যা’তনের ভয়া’বহ চিত্র তুলে ধরেছেন হল প্রভোস্ট বরাবর অভিযোগে। নির্যা’তনের শি’কার এমন বহু শিক্ষার্থী আবরারের মৃ’ত্যুর পর মুখ খুলছেন।

বুয়েটে নির্যা’তনের চিত্র সামনে নিয়ে আসেন মো. এনামুল হক নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী। নিজের ফেরিভাইড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের ওপর চালানো নির্ম’ম নির্যা’তনের কথা জানিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে পোস্টজুড়ে দিয়েছেন সেদিনের নির্ম’ম নির্যা’তনের ২টি ছবিও। যেখানে দেখা গেছে, নির্যা’তনের কারণে পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘা’তের নানা চিহ্ন।

এনামুল হক বলেছেন, এসব মা’রের দাগ আবরারের নয়; এগুলো তার শরীরেরই ছবি। আবরার মা’রা গেলেও সেবার নির্যা’তনের পরও প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি।

ছাত্রলীগের আরও ৩ জন রিমান্ডে:

আবরার ফাহাদ হ’ত্যা মামলায় বুয়েট ছাত্রলীগের আরও ৩ জনকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে আদালত। ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জাল হোসেন জিজ্ঞাসা’বাদের জন্য রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ওয়াহেদুজ্জামান আসামিদের আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক রিমান্ডের আদেশ দেন।

রিমান্ডে পাঠানো ৩ আসামি হলেন- শামসুল আরেফিন রাফাত (২১), মো. মনিরুজ্জামান মনির (২১) ও মো. আকাশ (২১)। এর মধ্যে আসামি রাফাত বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। মনির বুয়েটের পানিসম্পদ বিভাগের ১৬তম ব্যাচের এবং আকাশ একই ব্যাচের সিই বিভাগের ছাত্র।

এর আগে মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর জিগাতলা থেকে রাফাতকে, ডেমরা থেকে মনিরকে ও সন্ধ্যার পর গাজীপুরের বাইপাইল থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, আবরার নিহতের ঘটনায় তার বাবা ১৯ জনকে আসামি করে রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করেন। এখন পর্যন্ত এ মামলায় ১৩ জন রিমান্ডে আছে।

এর আগে রবিবার দিবাগত রাতে আবরারকে বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে অ’চেতন এ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃ’ত ঘোষণা করেন।

শেয়ার করুন !
  • 79
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply