সিসি ক্যামেরা-এসি নৌকায় বসে ত্রা’সের রাজত্ব পাগ’লার!

0

বগুড়া প্রতিনিধি:

বগুড়ায় এক যুবলীগ নেতা আছেন যিনি দাপিয়ে বেড়ান ডাঙ্গায়, কিন্তু থাকেন জলে। বাড়িঘর থাকলেও বসবাস করেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) নৌকায়। ওই নৌকায় আবার সিসি ক্যামেরাও লাগানো!

তার বিরু’দ্ধে অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। বসবাস পানিতে হলেও তার অপরাধ জল-স্থল সব জায়গা বিস্তৃত। কৃষকের জমির ফসল নিয়ে যাওয়া, নৌকায় ডাকা’তি, মা’দক ও অ’স্ত্র ব্যবসা, জুয়ার আসর বসানো, যাত্রার নামে দেহ’ব্যবসা, বিরো’ধপূর্ণ জমি নিজের নামে লিখে নেয়া, ডাকা’তিতে বাধা দিলেই খু’ন, অপরাধী ও পলাতক আসামিদের আশ্রয় দেয়া ও প্রহ’সনমূলক সালিশ- কী করেন না তিনি?

এলাকায় তার একটা বাহিনীও রয়েছে। বাহিনীতে বিভিন্ন জেলার শতাধিক সদস্য রয়েছে। যারা তার হুকুম তামিলে ব্যস্ত।

কথিত এই যুবলীগ নেতার নাম লুৎফর রহমান। তবে এ নামে তিনি এলাকায় তেমন একটা পরিচিত নন। তাকে স্থানীয়রা জানে ‘পাগ’লা ডাকা’ত’ নামে। এই নাম বললে এলাকার শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই তাকে চেনে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর চরচালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের পূর্বপাড়ের বহুলাডাঙ্গা গ্রামের মুছা শেখ ওরফে দালাল মুছার ছেলে এই লুৎফর রহমান। তার ইউনিয়নের পাশের ইউনিয়ন জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও ইসলামপুর এবং আরেক পাশে গাইবান্ধার সাঘাটার জুমারবাড়ী এলাকা। ৩ জেলার সীমান্ত এলাকার মধ্যে পড়েছে বহুলাডাঙ্গা গ্রাম। তাই তার রাজত্ব ও কর্মকাণ্ড ৩ জেলার ওই এলাকাগুলোতেই।

পাগ’লা ডা’কাত ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। তিনি এখন চরের রাজা। তার বিরু’দ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখন মানুষের মুখে মুখে। তার অপরাধগুলোও ওপেন সিক্রেট।

তিনি জমিনে থাকেন না। থাকেন নদীর ওপর ভাসমান নৌকায়। তাও যেমন-তেমন নৌকা নয়; থাই গ্লাস লাগানো এয়ারকন্ডিশন্ড (এসি) নৌকা। বিলাসবহুল ওই নৌকায় টিভি-ফ্রিজ তো আছেই; সৌরবিদ্যুতেও চলে এসব। আছে সিসি ক্যামেরাও। তিনি যে নৌকায় বসবাস করেন সেটির দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট।

তার বয়স আনুমানিক ৪৫। চরবাসীর কাছে তিনি এক মূর্তিমান আত’ঙ্ক। একসময় নিজে চুরি-ডাকা’তি করতেন। এখন সর্দার হয়ে গড়ে তুলেছেন পাগ’লা বাহিনী। বাহিনীতে আছে শতাধিক ডাকা’ত সদস্য। এসব অপরাধ করেই কমপক্ষে ৫ কোটি টাকার মালিক তিনি।

খু’ন, চুরি, ছিন’তাই, ডাকা’তি, মা’দক, অ’স্ত্র, লুটপা’টসহ একাধিক মামলা ঝুলছে তার মাথার ওপর। ওয়ারেন্টও আছে একাধিক মামলার। তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার আছে ২০০ গরু ও ৩০০ মহিষের বিশাল খামার। এগুলো চরে বিশাল এলাকাজুড়ে বিচরণ করে। অভিযোগ আছে, তার খামারের গরু-মহিষের বেশিরভাগই ডাকা’তি করা।

তার সম্পদের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক। বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার তেকানী-চুকাইনগর এলাকার তালতলায় ৩ বছর আগে তার স্ত্রী বুলবুলি খাতুনের নামে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। এর বাজারমূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। নীলফামারী জেলা সদরের রামগঞ্জ এলাকায় ৪ বছর আগে একটি দ্বিতল বাড়ি কিনেছেন। ওই বাড়ির বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এ ছাড়া শতাধিক বিঘা জমি ও অর্ধশত পুকুরের মালিক তিনি।

শুধু তাই নয়; ৩ সন্তানের জনক লুৎফর ছেলেদের নামেও ব্যাংকে প্রায় কোটি টাকা আমানত রেখেছেন বলেও অভিযোগ আছে। ‘পাগ’লা হাট’ নামে এলাকায় একটি হাটও করেছেন। তার ৬টি নৌকা ডাকা’তির কাজেই বেশি ব্যবহার হয়। এর একটিতে তিনি বাস করেন।

লুৎফরের বিরু’দ্ধে সারিয়াকান্দি থানায় ৬টি, সোনাতলা থানায় ৩টি, জামালপুরের ইসলামপুর থানায় ৩টি ও গাইবান্ধার সাঘাটা থানায় ২টি এবং জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানায় ২টি মামলার খবর পাওয়া গেছে। তার বিরু’দ্ধে ওয়ারেন্ট আছে ৫টি মামলার।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লুৎফর আগে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রায় ৮ বছর আগে যুবলীগে যোগ দেন। ৫ বছর আগে যুবলীগের ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি হন পেশি’শক্তির বলে। এখনও এই পদে বহাল তিনি। গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দল থেকে মনোনয়ন চেয়ে পাননি।

স্থানীয়দের অনেকেই ভ’য়ে তার অপরাধ নিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস পান না। তবে কিছু লোক তার অ’ন্যায়ের প্র’তিবাদও করছেন। তাদের মধ্যে একজন আবদুল হান্নান। তিনি গত ১৪ অক্টোবর বগুড়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে লুৎফর রহমান ওরফে পাগ’লা ডাকা’তের অ’পকর্ম তুলে ধরে তাকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান। এর পরই তার ওপর নেমে আগে খড়গ। পাগ’লার হুম’কিতে এখন আর এলাকায় যেতে পারছেন না হান্নান। তিনি বর্তমানে জয়পুরহাটে অবস্থান করছেন।

স্থানীয় চালুয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী গণমাধ্যমকে বলেন, লুৎফরের অপরাধের কথা সবাই জানে কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। ওই এলাকার কয়েকজন ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার অত্যা’চারে আমরা এলাকায় টিকতে পারছি না। প্রতিনিয়ত সে লুটপা’ট, ডাকা’তি ও মা’দকের ব্যবসা করে এলাকায় ত্রা’সের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও শা’স্তির দাবি জানান তারা।

জেলা যুবলীগের সভাপতি শুভাশিস পোদ্দার লিটন বলেন, লুৎফরের অপরাধ জগত সম্পর্কে আমার জানা ছিল না, আমি সম্প্রতি জানতে পেরে লুৎফর রহমানকে বহি’ষ্কার করে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে সারিয়াকান্দি যুবলীগ নেতাদের নির্দেশ দিয়েছি।

অভিযোগের বিষয়ে লুৎফর বলেন, সামনে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। আমি এবার নির্বাচনে দাঁড়াব, প্রতি’পক্ষ আমাকে নির্বাচনে পরাজিত করতে ও দলীয় মনোনয়ন যাতে না পাই, সে জন্য নানা অপ’বাদ ছড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, তার খামারে নিজের টাকায় কেনা ১০০ গরু ও ২০০ মহিষ আছে। সোনাতলায় তার বাড়ির মূল্য ২০ লাখ ও নীলফামারীর বাড়ির মূল্য ৩০ লাখের বেশি হবে না। তার নৌকার বিষয়ে বলেন, নদী এলাকায় বসবাস করতে গেলে নৌকা ছাড়া চলে না। আমি শখ করে একটি নৌকা বানিয়েছি।

লুৎফর রহমানের বিরু’দ্ধে উঠা অভিযোগগুলো স্বীকার করে সারিয়াকান্দি থানার ওসি আল আমিন বৃহস্পতিবার দুপুরে বলেন, তার বিরু’দ্ধে সারিয়াকান্দি থানায় ৩/৪টি মামলা রয়েছে। তবে মামলাগুলো বহু আগের। তার বিরু’দ্ধে ওয়ারেন্টও আছে। কিন্তু সে নৌকায় থাকে। তাকে ধরা যাচ্ছে না।

পুলিশ একদিক থেকে অভিযান চালালে পালিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। ৩ জেলার মোহনায় নদীতেই তার বসবাস। তাকে গ্রেপ্তারে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানও নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।

ওসি বলেন, ডাকা’তিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তার বিরু’দ্ধে। নৌকায় থেকে বিভিন্ন এলাকায় ডাকা’তি করে বেড়ায় সে। তবে আমার এলাকায় সে কোনো ডাকা’তি করতে পারছে না।

শেয়ার করুন !
  • 27
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply