যুবলীগ অফিসের সেই কোটিপতি পিয়ন আনিসের খোঁজ জানে না কেউ-ই!

0

সময় এখন ডেস্ক:

যুবলীগের প্রধান কার্যালয়ের এক সময়কার পিয়ন থেকে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক বনে যাওয়া কাজী আনিসুর রহমান এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। যুবলীগ নেতাকর্মীদের কাছে ক্যাশিয়ার আনিস নামে পরিচিত এই নেতার অবস্থান সম্পর্কে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারছেন না। পুলিশ তাকে নজরদারিতে রেখেছে বললেও কার্যত তাকে গ্রেপ্তারে চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো তৎপরতা নেই বললেই চলে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর গা ঢাকা দিয়েছেন আলোচিত কাজী আনিস। তাকে এরইমধ্যে যুবলীগ থেকে বহি’ষ্কারও করা হয়েছে।

এদিকে অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে যুবলীগের বহি’ষ্কৃত দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমানের বিরু’দ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলা দুটি করা হয়। দুই মামলারই বাদী দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

মামলার এজাহারে কাজী আনিসের বিরু’দ্ধে ১২ কোটি ৮০ লাখ ৬০ হাজার ৯২০ টাকা এবং তার স্ত্রীর বিরু’দ্ধে ১ কোটি ৩১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ টাকার অ’বৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর আগে দলীয় শৃঙ্খলা ভ’ঙ্গের দায়ে যুবলীগ থেকে বহি’ষ্কার করা হয় বহুল আলোচিত ও বিত’র্কিত নেতা কাজী আনিসুর রহমানকে। ১১ অক্টোবার যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

কাজী আনিসুর রহমান সর্বশেষ যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক পদে ছিলেন। তিনি যুবলীগ অফিসে ৩ হাজার টাকা বেতনে সুপারিশে নিয়োগ পান পিয়ন পদে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বড় নেতাদের আশীর্বাদে কেন্দ্রীয় নেতা বনে যান। চলমান শুদ্ধি অভিযান শুরু হলে তিনি আড়ালে চলে যান।

যুবলীগের একসময়কার প্রভাবশালী নেতা কাজী আনিসের অবস্থান নিয়ে সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশার। কেউ বলছেন, কাজী আনিস দেশ ছেড়েছেন। কেউ বলছেন আত্ম’গোপনে আছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, কাজী আনিসুর রহমানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ। তার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছেন কোটিপতি এ নেতা। যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর লাপাত্তা কাজী আনিস।

যুবলীগ নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, কাজী আনিস কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে। বেতন ছিল মাসে ৩ হাজার টাকা। আর ৭ বছর পর বনে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক। যুবলীগের সবশেষ কমিটিতে তাকে এ গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

কাজী আনিসের আঙুল ফুলে কলাগাছ। তিনি এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। আত্ম’গোপনে যাওয়ার আগে কোটিপতি আনিস যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ছাড়া কাউকে পরোয়া করতেন না। তার বে’পরোয়া মনোভাবে যুবলীগ নেতাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোণঠাসা।

২০০৫ সালে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যখন আনিসের চাকরি হয়, তখন তিনি নেতাদের ফুট ফরমায়েশ শোনার পাশাপাশি কম্পিউটার অপারেটরের কাজও করতেন। এ সুবাদে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি কার্যালয়ে আসা তৃণমূল নেতাদের সঙ্গেও সখ্য হয় তার। সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা নেতাদের নজরেও চলে আসেন আনিস।

কেন্দ্রীয় যুবলীগ সারা দেশে যেসব কমিটি দিত, সেগুলো কম্পিউটারে টাইপ করে দিতেন আনিস। টাইপ করতে গিয়ে কোন জেলায় কে সভাপতি কে সম্পাদক তা নখদর্পণে চলে আসে আনিসের। মুখস্থ বলে দিতে পারতেন যে কোনো কমিটির নেতার নাম। এসব কারণেই চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হয়ে যান তিনি। আবার জেলা পর্যায়ের নেতারাও কমিটির বিষয়ে কেন্দ্রের তথ্য বা সিদ্ধান্ত জানতে তাকে ফোন করতেন। এভাবে জেলা নেতাদের সঙ্গেও তার সখ্য হয়ে যায়।

২০১২ সালে যুবলীগের কমিটি হলে আনিস পেয়ে যান উপদপ্তর সম্পাদকের পদ। শীর্ষ নেতার আশীর্বাদ থাকায় ৬ মাস পর খালি থাকা দপ্তর সম্পাদক পদে পদোন্নতি পেয়ে যান আনিস।

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনিসকে সবাই ‘ক্যাশিয়ার’ বলেই চেনে। তবে গত ১ যুগে তিনি শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। কিছু যুবলীগ নেতার সব ধরনের অ’পকর্মের সঙ্গী এই আনিস।

ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর সড়কে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে আনিসের। তবে ওই ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন না। বর্তমানে রাজধানীর ধানমণ্ডির ১০/এ সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে থাকেন কাজী আনিস। ওই ফ্ল্যাটটিও তার নিজের।

শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে আনিসের রয়েছে বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। আগে ৫/৬ বিঘা জমি ছিল তাদের। গত ৪ বছরে কয়েকশ বিঘা জমি কিনেছেন। বাড়ি করেছেন, পেট্রল পাম্প এবং তার পাশের জমি কিনেছেন। এই পেট্রল পাম্পটি কিনতে কোটি টাকা লেগেছে আনিসের। পাশেই ৫ একর জমি আছে তার কেনা। এ ছাড়া ঢাকায় আনিসের ৩টি বাড়ি আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদা’বাজি, দরপত্র থেকে কমিশন ও যুবলীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদবাণিজ্য করেই বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছেন কাজী আনিস। যুবলীগ নেতারা জানান, আনিসের দা’পটে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টেকা দায়। অনেক নেতার অভিযোগ, আনিসের বিরু’দ্ধে কথা বলে টেকা কঠিন। বিভিন্ন ইউনিটে বছরের পর বছর সম্মেলন না করে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চালানো হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে এসব আহ্বায়ক কমিটি বানানো ও দীর্ঘদিন বহাল থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন আনিস।

নেতাকর্মীরা জানান, জি কে শামীম, খালেদসহ কয়েকজনের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়েন আনিস। তার সিন্ডিকেট চাঁদা’বাজি, টেন্ডারবাজি, ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোসহ সব অ’পকর্মে জড়িত। যুবলীগে আনিস ‘ক্যাশিয়ার’ নামেই পরিচিত। চাঁদার টাকা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন মহলে পৌঁছানোর কাজ করেন তিনি। এক শীর্ষ নেতা ছাড়া সবাই তাকে সমীহ করেন। আনিসের কারণে ত্যাগী ও সৎ যুবলীগ নেতারা শীর্ষ নেতাদের কাছেও ভিড়তে পারেন না।

প্রসঙ্গত, ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় চাঁদা দাবির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে অপসারণের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের বিষয়েও চরম ক্ষো’ভ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, যুবলীগের এক নেতা অ’স্ত্র উঁচিয়ে চলে। আরেকজন প্রকাশ্যে চাঁদা’বাজি করে বেড়ায়।

এর পর গণমাধ্যমে যুবলীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতায় ঢাকার ৬০টি জায়গায় ক্যাসিনো পরিচালনার খবর প্রকাশ হয়। ১৮ নভেম্বর ফকিরাপুলের ইয়াংমেন্স, ওয়ান্ডারার্স এবং গুলিস্তানে মুক্তিযো’দ্ধা ক্রীড়া সংসদে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মদ ও ৪০ লাখের বেশি টাকা উদ্ধার করে র‌্যাব। ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে ওই দিনই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়, যিনি ইয়াংমেন্স ক্লাবের সভাপতি ছিলেন।

পাশের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকেও জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ক্লাব পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার। এর পর ধানমণ্ডির কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে অভিযান চালিয়েও ক্যাসিনো চালানোর প্রমাণ পায় র‌্যাব। অ’স্ত্র, গু’লি ও ইয়া’বাসহ গ্রেপ্তার করা হয় ক্লাবের সভাপতি কৃষক লীগের সহসভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে।

এর মধ্যে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারি করা গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় মোহামেডান ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ ও বিসিবির পরিচালক লোকমান ভূঁইয়াকে। দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শীর্ষ সন্ত্রা’সী জিসানকে। পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ক্যাসিনো সম্রাট যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানকে ‘শুদ্ধি অভিযান’ নাম দিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সন্ত্রা’স, চাঁদা’বাজি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অ’নিয়মে জড়িতদের বিরু’দ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের ভাসানচরে পাঠানো হবে। এরপরই বহি’ষ্কার করা হয় কাজী আনিসকে।

শেয়ার করুন !
  • 269
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply