জীবনে কী পেলাম ভাবি না, মানুষের জন্য কী করতে পেরেছি- সেটাই গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী

0

সময় এখন ডেস্ক:

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ছাত্রজীবন থেকেই আমার রাজনীতি শুরু। কিন্তু কোন বড় পোস্টে ছিলাম না, কখনও বড় পোস্ট চাইওনি। পদ তৈরি করা এবং সবাইকে পদে বসানো এই দায়িত্বই পালন করতাম। ৭৫-এর পর দলের যে এত বড় দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে, সেটা আমি কখনও ভাবিওনি, চাইওনি। এমন দায়িত্ব নেওয়ার কথা চিন্তাতেও ছিল না।

শেখ হাসিনা বলেন, স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তারপর কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে তখনো ছাত্রলীগেরই সদস্য ছিলাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটির একজন সদস্য ছিলাম। কখনও পদ নিয়ে চিন্তা করিনি, পদ চাইওনি।

আলোচনার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ক্ষমতায় থেকে দেশের জন্য কাজ করার কারণেই মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই শুধু দেশে নয় গোটা উপমহাদেশে আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয় বরং একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, দেশবিরো’ধীরা পঁচাত্তরের পর স্বাধীনতার চেতনা ব্যা’হত করেছে। যারা স্বাধীনতা ও দেশের চেতনায় বিশ্বাস করে না ৭৫ পরবর্তী সময়ে তারা ক্ষমতায় থাকার কারণে, যে আদর্শ নিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা বাস্তবায়ন হয়নি।

ক্ষমতায় থাকলেও দেশের উন্নয়ন করায় মানুষের আস্থা অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অথচ স্বাধীনতা ও দেশের চেতনায় বিশ্বাস করে না এমন দল পঁচাত্তর পরবর্তী সময় ক্ষমতায় থাকায় দেশে স্বাধীনতার চেতনা বাস্তবায়ন হয়নি।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জন্য কাজ করতে এবং গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতেই দেশে ফিরে আসি। এর জন্য দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছি। কেননা, গণতান্ত্রিক ধারা ছাড়া দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্ভব না।

১৯৮১ সালের ১৭ মে’র স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে যখন ফিরেছিলাম, সেদিন আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। প্রচন্ড ঝ’ড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। বিমানটি বাংলার মাটি ছুঁয়েছে, ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ওই সময় ঝ’ড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ এসেছিল। এয়ারপোর্ট থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত এতো মানুষের ঢল যে এইটুকু পথ আসতে প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লেগে গিয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হ’ত্যার সেই নি’র্মম ঘটনা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে, জুলাই মাসের ৩০ তারিখে ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে আমি জার্মানিতে গিয়েছিলাম। রেহানা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কলেজে গেলাম। সবাইকে রেখে গিয়েছিলাম, কামাল, জামাল, রাসেল। মাত্র ১৫ দিনের মাথায় শুনলাম, আমাদের কেউ নেই, আমরা নিঃস্ব। আমাদের দেশেও আসতে দেওয়া হলো না। এক পর্যায়ে চাচা এসে আমাদের নিয়ে যায়।

দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই ফিরে এসেছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে আসব। আমি জানি না কী করব, কোথায় থাকব, কই যাব। অনেক বাধা, অনেক বি’পত্তি। তবু সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আসতেই হবে।

বঙ্গবন্ধুই রাজনৈতিক আদর্শ ছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাজনীতির কাজ করে যেতাম আব্বার আদর্শ নিয়ে। তিনি দেশের জন্য কাজ করেছেন। বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। আমরা কখনো টানা ২ বছরও আব্বাকে জেলের বাইরে পাইনি। এ নিয়ে আমাদের কোনো হা-হুতাশ ছিল না। আমার মা খুব চিন্তাশীল ছিলেন, তিনি বাসাও দেখতেন, বাইরেও দেখতেন। সাংসারিক কোনো ঝামেলা তিনি আব্বাকে দিতে চাইতেন না। আমাদের দাদা-দাদী, চাচারা পারস্পরিক সহযোগিতা করতেন। কাজেই এমন একটি পরিবেশ থেকে আমরা উঠে এসেছি, যে মাথাতেই ছিল দেশের জন্য কিছু একটা করে যেতে হবে।

দেশের ফেরার পরের প্র’তিকূল পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, দেশে ফেরার পর থেকেই পদে পদে বাধা। যারা মুক্তিযু’দ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না, তারাই তখন ক্ষমতায়। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ১৯টি ক্যু’ হয়েছিল। এক সামরিক শাসকের মৃ’ত্যুর পর আরেক সামরিক শাসক আসলো। আমরা আওয়ামী লীগ কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য একটার পর একটা সংগ্রাম করেই গেছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক ধারা আর ব্যবস্থা ছাড়া দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব না।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এক নম্বর পলিটিক্যাল পার্টি। যে পার্টি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস অর্জন করেছে। সেই আস্থা বিশ্বাস আমরা দেখতে পারি এবারের নির্বাচনে, নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে যারা প্রথমবারের ভোটার তারা সকলে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে তাদের আস্থা বিশ্বাসকে তারা জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকলে সাধারণত মানুষের জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় এসে মানুষের আস্থা বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি বলেই মানুষের ভোট আমরা পেয়েছি। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারণটা হলো আমরা যে ক্ষমতায় থেকে মানুষের জন্য কাজ করেছি, মানুষের জন্য উন্নয়ন করেছি, মানুষের ভাগ্য গড়ার জন্য যে কাজগুলো করেছি। সেটা মানুষ উপলব্ধি করতে পেরেছে। এটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো রাজনৈতিক নেতার জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে মানুষের আস্থা বিশ্বাসটা অর্জন করা।

তিনি বলেন, ক্ষমতায় থেকেও মানুষের আস্থা বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি এটাও কিন্তু বিশাল অর্জন। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জনগণের আস্থা বিশ্বাস ধরে রাখার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নেতা-কর্মীদের কাছে এইটুকু চাইবো, এই আস্থা বিশ্বাস যেন আমরা ধরে রাখতে পারি। ব্যক্তিগত জীবনে কী পেলাম, না পেলাম সে চিন্তা করি না। দেশের মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কতটুকু দিতে পারলাম সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।

আওয়ামী লীগকে ধ্বং’স করতে বিভিন্ন সময়ের ষড়-যন্ত্র ও প্র’তিকূল পরিবেশে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, যারা বার বার চেয়েছে আওয়ামী লীগকে নি’শ্চিহ্ন করে দিতে তারা সফল হয়নি। আওয়ামী লীগ কিন্তু আওয়ামী লীগের মতই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।

১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা শেখ হাসিনা বলেন, একটা দলের সভাপতি হিসেবে ৩৮ বছর এটা বোধ হয় একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা সমস্বরে ‘না, না’ বলে ওঠে।

তিনি বলেন, ৩৮ বছরে বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ক্ষু’ণ্ণ হোক, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষু’ণ্ণ হোক, এমন কোনো কাজ আমি বা আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনো করিনি। নিজেদের চাওয়া পাওয়ার জন্য কাজ করিনি, কাজ করেছি দেশের মানুষের জন্য। সব সময় চিন্তা করেছি মানুষকে কী দিতে পারলাম, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম। দেশটাকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা ও প্রত্যয়ের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

ষড়’যন্ত্রকারীদের বিষয়ে সবাইকে সব সময় সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই দেশটা যেন আবার স্বাধীনতা বিরো’ধী, যু’দ্ধাপরাধীদের হাতে ক্ষমতা না যায়। কেউ যেন দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনি-মিনি খেলতে না পারে। সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময় ছাড়াও ২০০১ সালের পর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার নেতাকর্মীকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তা সত্ত্বেও দলকে টিকিয়ে রাখতে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

** গত ১৭ মে, ২০১৯ তারিখে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৯তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে শুভেচ্ছা জানাতে এলে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে দলে‌র সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।

শেয়ার করুন !
  • 2.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply