‘যাঁদের ফিস দেবার প্রয়োজন নেই’- এক চিকিৎসকের কথা

0

ফিচার ডেস্ক:

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট ভাইরাল হয়েছে, যা বেশ আলোচিত হয়েছে সর্ব মহলে। যে কারণে প্রশংসায় ভাসছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গণপতি আদিত্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাইরাল হওয়া সেই পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে- আমার সরাসরি সম্মানিত শিক্ষকগণ; বীর মুক্তিযো’দ্ধা, বীরাঙ্গনা ও তাঁদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানেরা; কমপক্ষে একটি বই প্রকাশ পেয়েছে এমন কবি- তাদের চিকিৎসায় কোন ধরনের ফি নেয়া হবে না।

প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নামে সারাদেশে চিকিৎসকদের নামে চিকিৎসা বাণিজ্যের নানা অভিযোগ শোনা যায় প্রায়ই। সেখানে একজন ডাক্তার গণপতি আদিত্য ব্যাতিক্রম। প্রাইভেট প্র্যাক্টিসে ফিস নেন, তবে সবার কাছ থেকে নয়। চিকিৎসাসেবামূলক একটি চার্টে যাদের ফিস দেওয়ার প্রয়োজন নেই- শিরোনামে তার ব্যাক্তিগত চেম্বারে দেয়ালে আঠা দিয়ে লাগানো ছবি সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজর কেড়েছেন এই চিকিৎসক। তবে সেটিকে ভালোভাবে দেখছেন না তিনি নিজে।

গণপতি আদিত্য বলেন, আমি কর্মের মধ্যেই মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চাই, প্রচারে নয়। চিকিৎসক গণপতি আদিত্যের মহানুভবতায় উচ্ছ্বসিত তার সহকর্মীরা। রোগীদের মুখেও প্রশংসিত এই চিকিৎসক। আলোচিত এই চিকিৎসকের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে প্রথমেই বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চান তিনি। কারণ তিনি মনে করেন প্রচারে মানুষের মধ্যে অহং’কার চলে আসে। তাই তিনি দায়িত্ববোধ থেকেই মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রচারের স্বার্থকতা তখনই আসবে যখন আমার এই কাজটা আরও অনেকেই করবে।

তারপরও সময় চেয়ে কথা বলা। জানতে চাওয়া হয়, খুব কাছেই ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর থাকতে কেন উপজেলা শহরে রোগী দেখেন? উত্তরে তিনি বলেন, ফুলপুর উপজেলায় আমার বাড়ী এখানকার সাধারণ মানুষগুলো শহরে বিত্তবানদের ভিড়ে সঠিক চিকিৎসা থেকে ব’ঞ্চিত হয়।

তিনি বলেন, শহরের লোকজন এখন অনেক স্বাস্থ্য সচেতন, কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ এখনও সচেতন না হওয়ায় তাদের হৃদরো’গের ঝুঁ’কি বেশি। তাছাড়া শতকরা ৮০ ভাগ রোগীকে আমি যতদূর সম্ভব কম পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। ফলে তাদেরকে অল্প খরচে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হয়।

তিনি আরও বলেন, আমার গ্রামের সহজ সরল মানুষেরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা থেকে দূরে থাকে তাই একটু তাদের কাছাকাছি থাকা।

আমাদের দেশের পল্লী চিকিৎসকরা নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা’বোধ করলেও তিনি গর্ববোধ করে বলেন, আমি গ্রামের মানুষের ডাক্তার, পল্লী চিকিৎসক হিসেবে সারাজীবন সাধারণ মানুষের পাশে থাকব। তার মত অন্য চিকিৎসকরাও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালে ডাক্তারি পড়ার স্বার্থকতা আসবে বলে মনে করেন তিনি।

হৃদরো’গ প্রতিরো’ধে তার পরিকল্পনার কথাও জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, আমি খুব শীগ্রই হৃদরো’গ প্রতিরো’ধ নিয়ে আমার একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু করব। চিকিৎসক গণপতি আদিত্যের এমন উদারতায় উ’চ্ছ্বসিত তার সহকর্মী চিকিৎসকরা। গণপতির মত তারাও অনু-প্রাণিত হচ্ছেন রোগীদেরকে আপন করে দেখার।

ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. বিশ্বনাথ সাহা বলেন, গণপতি স্যার অত্যন্ত ভালো মানুষ। তার কাছ থেকে চিকিৎসার পাশাপাশি অনেক কিছু শেখার আছে। অনেক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেও স্যারের সাথে দেখা করতে আসে।

এই বিভাগের আরেক চিকিৎসক ইয়াসমিন আরা পারভিন বলেন, স্যারের কাছ থেকে আমরা চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হয়, কীভাবে রোগীদের আপন করে নিতে হয় তা শিখি।

আচার ব্যবহার ও আন্তরিকতায় আপন করে নেয়া রোগীদের কাছেও প্রশংসিত প্রিয় চিকিৎসক গণপতি আদিত্য। চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র রোগী হরেন্দ্র পাল বলেন, স্যার আমাদের এ অঞ্চলের সবার প্রিয়। স্যার আমাদের সবাইকে অল্প খরচে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। গরীব রোগীদের কাছ থেকে কোনো ফিস নেন না। উনি মানুষ নন, দেবতা।

ফুলপুর পৌরসভার মেয়র আমিনুল ইসলাম বলেন, ডাক্তার গণপতি আদিত্য আমাদের ফুলপুরের গর্ব। ওনার মত যদি ডাক্তারগণ নিজের এলাকার মানুষকে সেবা দিতেন তাহলে আমাদের দেশটা মানবিক বাংলাদেশ হয়ে যেত। চিকিৎসক গণপতি আদিত্যের মত অন্য চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক হলে চিকিৎসক ও রোগীদের মধ্যে দূরত্ব কমে আসবে বলে মনে করছেন সমাজ সচেতন ব্যক্তিরা।

ফুলপুরের কুন্ডলবালিয়া গ্রামের ভূমি কর্মকর্তা মৃ’ত্যুঞ্জয় আদিত্য ও সুনীতি আদিত্যের ৬ ছেলে-মেয়ের মধ্যে চিকিৎসক গণপতি আদিত্য ৪র্থ। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ৯ম বিসিএসএ চিকিৎসক হন গণপতি। ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী ও ২ সন্তান নিয়ে সাদামাটাভাবেই চলছে সদা হাস্যোজ্জল এই চিকিৎসকের জীবন। ২০ বছর ধরে নিজ উপজেলা শহর ফুলপুরে হতদরিদ্র রোগীদের বিনা ফিসেই দেখার পাশাপাশি আর্থিক সহযোগীতা করছেন।

শেয়ার করুন !
  • 264
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply