শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সেরা ১০টি সিদ্ধান্ত

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

স্বাধীনতাবিরো’ধী শক্তি কর্তৃক ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশং’স হ’ত্যাকাণ্ডের ৬ বছর পর ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা পেয়েছিলেন এক প্র’তিকুল ঝ’ঞ্ঝা বিক্ষু’ব্ধ পরিবেশে। গত ৩৮ বছরে তাঁকে রাজনৈতিক জীবনে অনেক ঘা’ত-প্র’তিঘাত চ’ড়াই-উৎ’রাই পার করতে হয়েছে। নানারকম বিপৎসং’কুল পরিবেশ অতিক্রম করেই আজকে তিনি বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর যাই হোক শেখ হাসিনার নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

রাজনীতিবিদ হিসেবে শেখ হাসিনার সেরা ১০টি সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা হলো নিবন্ধে। দেশবরেণ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সহযোগিতা নিয়েই এই সেরা ১০টি সিদ্ধান্ত নির্বাচন করা হয়েছে। এই ১০টি সিদ্ধান্ত শুধু শেখ হাসিনার জীবনের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন করেনি বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এক নতুন মেরুকরণ ও বিন্যাস তৈরি করেছে। আসুন দেখা যাক-

১. আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করাঃ ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হ’ত্যার পর আওয়ামী লীগ হয়ে পড়েছিল বিধ্ব’স্ত ও হত’বিহ্বল। কো’ন্দলে আবদ্ধ দলের মনোবল হয়ে গিয়েছিল চূ’র্ণ। এরকম একটি পরিস্থিতিতে নেতৃত্বশূন্য আওয়ামী লীগের হাল ধরার জন্য আহ্বান জানানো হয় শেখ হাসিনাকে। তখন তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু যখনই তাঁকে নেতৃত্ব দেওয়া হয় তখন তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এটি শুধু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে নয়, বলা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এটি সবচেয়ে বড় এবং সাহসী সিদ্ধান্ত। যেখানে পুরো পরিবারকে হ’ত্যা করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ফিরে আসা শুধু মৃ’ত্যুর ঝুঁ’কিই নয় বরং আত্মহ’ত্যারও সামিল। এছাড়া তিনি নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন কতটা প্র’তিকূল পরিবেশে তাঁকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। আজ ৩৮ বছর পরও ফিরে তাকালে সেটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য ব্যাপার। তাই গুরুত্ব বিবেচনায় এটি তাঁর সবচেয়ে সেরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

২. সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনঃ শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পরই মা’রা যান জিয়াউর রহমান। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়ে ক্ষমতায় বসেন উর্দি পরা আরেক একনায়ক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তারপরই শুরু হয় স্বৈ’রাচার বিরো’ধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আন্দোলনে এক পর্যায়ে যুক্ত হন বেগম খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলনের পর স্বৈ’রাচারী এরশাদের প’তন ঘটলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ৯১-এর নির্বাচনে অ-ভাবনীয়ভাবে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয় যা ছিল অনেকের কাছে অ-বিশ্বাস্য। পরাজিত হলেও তিনি তাঁর নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী কাজ করতে থাকেন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবী করেন। সংসদীয় গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযু’দ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার এবং ৭২ এর সংবিধানে সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা প্র’বর্তিত ছিল। পরবর্তীতে এই ব্যবস্থা থেকে আমরা সরে আসি এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি জানতেন সংসদীয় গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প নেই এবং বিরো’ধী দলে থেকেই সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা পুনঃপ্র’বর্তনের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। কাজেই এটা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

৩. প্রচলিত আইনে জাতির পিতা হ’ত্যাকান্ডের বিচারঃ ৯৬ সালে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার অনুযায়ী জাতির পিতার হ’ত্যাকান্ডের বিচার শুরু করে। শেখ হাসিনা চাইলেই বিশেষ ট্রাইবুনাল করে বা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল করে জাতির পিতার হ’ত্যার বিচার করতে পারতেন কিন্তু তিনি সেসব না করে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার করেন। যা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক অনবদ্য নজির এবং যা দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। বলা হয় যে, শেখ হাসিনা যে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল তার প্রমাণ এটি।

৪. একাত্তরের গণহ’ত্যা ও মানবতাবিরো’ধী অপরাধের বিচারঃ ৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে যেটা তিনি পারেননি এবং যা ছিল এদেশের মানুষের অনেক আকাঙ্খিত বিষয় তা হলো একাত্তরের গণহ’ত্যা ও মানবতাবিরো’ধী অপরাধের বিচার। ২০০৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে তিনি ৭১ এ যারা গণহ’ত্যা, লুট, হ’ত্যা, ধ-র্ষণ, অগ্নিসং’যোগের সংগে জড়িত ছিল তাঁদের বিচার করা। ক্ষমতায় এসে আন্তার্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল অনুযায়ী তাদের বিচার শুরু করে দেশে পুনরায় মুক্তিযু’দ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তিনি সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

৫. কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠাঃ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল তৃণমূল পর্যন্ত দেশের সকল নাগরিকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সাড়ে ৩ বছরের শাসনামলে তা করে যেতে পারেননি। শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতা গ্রহণ করে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত কাজ এগিয়ে নিলেও বিএনপি জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা চালু করেন জনগণের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। কমিউনিটি ক্লিনিক শুধু বাংলাদেশে নয় তৃণমূলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে এবং সারাবিশ্বে একটি অনন্য স্বাস্থ্য মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। কাজেই কমিউনিটি ক্লিনিক শেখ হাসিনার আরেকটি বিচক্ষণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

৬. ডিজিটাল বাংলাদেশঃ ২০০৮ সালে নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের ঘোষণা দেয়। তখন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিষয়টি ছিল অস্পষ্ট, এর রূপ কী হবে তা সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা ছিল না। অনেকে এটিকে কৌতুকে পরিণত করে। কিন্তু আজকে বাংলাদেশ সত্যি সত্যি ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে। গ্রামে গঞ্জে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা ভোগ করছে। শুধু তাই নয় ইন্টারনেটে দ্রুত বর্ধনশীল দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। কাজেই শেখ হাসিনার সেরা ১০টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের একটি হলো বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া গ্রহণ।

৭. জঙ্গিবাদের বিরু’দ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতাঃ ৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছিল যে জ’ঙ্গিবাদ সন্ত্রা’সবাদের বিরু’দ্ধে আওয়ামী লীগের শূন্য সহিষ্ণুতা রয়েছে। কিন্তু প্রথম মেয়াদে সেটি আওয়ামী লীগ সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে সেটি করে এবং তা হলো জ’ঙ্গিবাদ, সন্ত্রা’সবাদের বির’দ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি। এই নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশে যে ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছি’ন্নতাবাদী সংগঠনের আশ্রয়স্থল ছিল, যে পকেটগুলো ছিল, সেগুলো সমূলে উৎ’পাটন করেন শেখ হাসিনা। ফলে বাংলাদেশ যে জ’ঙ্গিবাদ সন্ত্রা’সবাদের বিরু’দ্ধে শূন্য সহিষ্ণু- সে বার্তাটি সারা বিশ্বে পৌঁছে যায়। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সাররাবিশ্বে উজ্জ্বল হয়। এটি আওয়ামী লীগ সভাপতির অন্যতম একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

৯. ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কঃ ভারত বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবেশী। শুধু মায়ানমারের কিছু অংশ ছাড়া পুরোটাই ভারত বেষ্টিত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গাঁথা। কিন্তু রাজনৈতিক টানাপড়েনে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি ভারত বি’দ্বেষী মনোভাব জাগিয়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক, আর্থিকসহ বিভিন্ন খাতে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফলে ভারতের সঙ্গে পার্বত্যচুক্তি, ট্রানজিট, ছিটমহল বিনিময়সহ বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‌এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি নতুন মাত্রা পায়। যার ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক স্থিতি-শীলিতা এবং সামাজিক সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছে যা আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

৯. উন্নয়নের গণতন্ত্রঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণ করেই বুঝেছিলেন গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না যদি মানুষের পেটে ভাত না থাকে। এজন্য উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্র যদি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে তাহলে কখনো গণতন্ত্র টেকসই হতে পারে না। সে জন্যই তিনি দেশকে টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মডেল গ্রহণ করেন। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে গেলে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই তিনি স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। তাই বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বের বিস্ময়, উন্নয়নের রোল মডেল। বিশ্বের দ্রুত বর্ধিষ্ণু ৮টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উন্নয়নের গণতন্ত্রের মডেলের কারণেই বাংলাদেশে আজ স্থিতি-শীল এবং উন্নয়ন যুগপৎভাবে চলছে বলে মনে করা হয়।

১০. অ’বৈধভাবে ক্ষমতা দখ’লের পথ চিরতরে রু’দ্ধ করাঃ দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০৯ সালে দায়িত্বগ্রহণ করেই আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। ৭২-এর সংবিধানের আলোকে সংবিধানকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন। সেখানে অ’বৈধভাবে ক্ষমতা দখ’লকে রাষ্ট্রদ্রো’হী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং অ’বৈধভাবে ক্ষমতা দখ’ল করে সাংবিধানিকভাবে বৈধতা দেওয়ার সব প্রচেষ্টাই র’হিত করা হয়েছে। এটা একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য এক অনন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচ। ফলে বাংলাদেশে হ’ত্যা, ক্যু’, ষড়-যন্ত্রের রাজনীতির চির অ-বসান ঘটেছে। এটা শেখ হাসিনার সেরা ১০টি সিদ্ধান্তের একটি।

শেয়ার করুন !
  • 564
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply