হবিগঞ্জ শেখ হাসিনা মেডিক্যালে কেনাকাটায় কোটি-কোটি টাকা লোপাট!

0

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:

হবিগঞ্জের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর বছর না ঘুরতেই উঠছে বড় ধরনের অ’নিয়মের অভিযোগ। জানা গেছে, কর্তৃপক্ষের যোগ’সাজশে প্রায় ১৫ কোটি টাকার টেন্ডারের অর্থ লু’টপাট করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে হবিগঞ্জ সদরে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বইপত্র, সাময়িকী, যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্য ২০১৮ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আবু সুফিয়ান স্বাক্ষরিত এক আদেশে ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডা. মো. শাহীন ভূইয়াকে সভাপতি করে গঠন করা হয় ৩ সদস্য বিশিষ্ট বাজারদর যাচাই-বাছাই কমিটি।

এই টেন্ডারে অংশ নেয় ৭টি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মূল্যায়ন রিপোর্টে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর ছাড়াই রাজধানীর শ্যামলী এলাকার ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ ও মতিঝিলের ‘পুণম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানকে মালামাল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই কেনাকাটায় মোট বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ভ্যাট ও আয়কর খাতে সরকারি কোষাগারে জমা হয় ১ কোটি ৬১ লাখ ৯৭ হাজার ৭শ’ ৪৮ টাকা। আর মালামাল কেনায় ব্যয় দেখানো হয় ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ১শ’ ৯ টাকা।

কিন্তু ক্রয়কৃত ওইসব মালামালের বাজারমূল্য ৫ কোটি টাকার বেশি নয় বলে দাবি করেছেন দরপত্র প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ লুটপাট করা হয়েছে ৮ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ অর্থ।

মালামাল কেনার বিবরণীতে দেখা যায়, প্রতিটি ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা দরে লেনোভো ব্র্যান্ডের ৬৭টি ল্যাপটপের (মডেল ১১০ কোর আই ফাইভ) সর্বমোট দাম দেখানো হয়েছে ৯৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫শ’ টাকা। অথচ অনলাইনে এবং রাজধানীর কম্পিউটার সামগ্রী বেচাকেনার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘুরে একই মডেলের ল্যাপটপের দাম দেখা গেছে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকার মধ্যে। এইচপি কালার প্রিন্টার (মডেল জেড প্রো এম ৪৫২এন ডব্লিউ)-এর দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯শ’ টাকা, বাজার যাচাই করে যার দাম দেখা যায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা।

৫০ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন কনফারেন্স রুমের জন্য টেবিল, এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এসব চেয়ারে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘ইয়ামিন ফার্নিচার’ লেখা থাকলেও টেবিলগুলোতে কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

দেশের শীর্ষস্থানীয় দু’টি আসবাব নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের শো’রুম যাচাই করে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের জন্য কেনা ওইসব চেয়ারের বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু তাই নয়, সাধারণ মানের ১৫টি বুক শেলফের মোট মূল্য ৬ লাখ ৬০ হাজার, ৫টি স্টিলের আলমারির মোট দাম ২ লাখ ৮৫ হাজার, ১০টি স্টিলের ফাইল কেবিনেটের মোট দাম ৪ লাখ ২২ হাজার, ২৫টি স্টিলের র‌্যাকের মোট দাম ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ও ৬ হাজার ৪শ’ ৭৫টি বইয়ের জন্য দাম দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮ হাজার ৬শ’ ৬৪ টাকা।

এছাড়াও, ‘নির্ঝরা এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ১০৪টি প্লাস্টিক মডেলের দাম ১ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৩ টাকা ও চিকিৎসাবিদ্যার বই ‘পেডিয়াটিক সার্জারি’র (২ ভলিউমের সেট) দাম দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার ৫শ’ ৫০ টাকা। কিন্তু বাজার যাচাই করে দেখা গেছে, বইটির বাজারমূল্য প্রায় ৩৩ হাজার টাকা।

এদিকে, মেডিকেল কলেজটিতে ‘কার্ল-জিস প্রিমো স্টার’ বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করেছে ‘পুণম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে প্রতিষ্ঠানটি। ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে ৮১টি মাইক্রোস্কোপের মোট দাম ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৩শ’ ২৫ টাকা। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে একই মাইক্রোস্কোপ পাওয়া যায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩শ’ টাকা দরে।

এছাড়াও, এয়ার কন্ডিশন, রেফ্রিজারেটর, ওজন মাপার ডিজিটাল যন্ত্র ইত্যাদির দামের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে বড় ধরনের হের-ফের।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি সম্বলিত ভালো মানের চার্ট বাজারে ১শ’ থেকে ৫শ’ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিটি চার্ট কিনেছে ৭ হাজার ৮শ’ টাকা দরে। এ ধরনের ৪শ’ ৫০টি চার্ট কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। দেশে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকায় পাওয়া যায় ‘স্টারবোর্ড’ নামে হিটাচি ব্র্যান্ডের ৭৯ ইঞ্চির ইন্টারঅ্যাক্টিভ বোর্ড। কিন্তু একই কোম্পানি ও মডেলের এই ইন্টারঅ্যাক্টিভ বোর্ডটি কেনা হয়েছে ১৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়।

দুর্নীতির বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মোতাচ্ছিরুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সম্মান রেখেই মেডিকেল কলেজটিকে তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি প্রধানমন্ত্রীর অ’সম্মান এবং অভিযুক্তরা পার পেয়ে গেলে বিষয়টি হবে লজ্জাজনক।

এ বিষয়ে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. মো. আবু সুফিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে বাজারদর যাচাই-বাছাই কমিটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঢাকার দু’টি প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার দিয়েছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, হবিগঞ্জবাসীর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে আমি ত্যাগ স্বীকার করেছি। হবিগঞ্জের সন্তান হিসেবে আমি চাই প্রতিষ্ঠানটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি অনুমোদন লাভ করে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৫১ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পথচলা শুরু করে কলেজটি।

শেয়ার করুন !
  • 853
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply