৩০ বছর পর সেই নির্যা’তিত আওয়ামী কর্মীর মূল্যায়ন, আজ তিনি দলীয় সভাপতি

0

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:

অবশেষে ৩ দশক ধরে মুজিব কোট গায়ে দেয়া নির্যা’তিত ছেলেটিই হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি।

সভাপতি পদে এমপি, সাবেক এমপি, শিল্পপতি আর কোটিপতি ধণাঢ্য প্রার্থীদের হ’টিয়ে অবশেষে শূন্য ব্যাংক-ব্যালেন্সের মালিক নৌকার পাগল ‘মাইক বাঁধা’ সাজ্জাদ হলেন মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

দলটির সম্পাদক পদেও এসেছে নতুন মুখ। এ পদে ১২ প্রার্থীর সাথে ল’ড়াই করে সাবেক ছাত্র নেতা মীর সুলতানুজ্জামান লিটন হয়েছেন সাধারণ সম্পাদক। শনিবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে ভালবেসে রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম উপেক্ষা করে ৩ দশক ধরে ১২ মাস মুজিব কোট গায়ে দিয়ে আসছেন তিনি। কর্মীরা বলছেন নৌকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না তাদের এই মুজিব সেনা। তবে সারা জীবন আওয়ামী লীগ করলেও সংগঠনে তার যোগ্য স্থান হয়নি। অথচ ঝিনাইদহের মহেশপুর আওয়ামী লীগে তিনিই ছিলেন দুর্দিনের কান্ডারী। একাই মাইক টাঙিয়ে একাই বক্তব্য দিতেন দলটির দুঃসময়ে। সেই আশির দশকে মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের এমন দিনও ছিল।

সরেজমিন মহেশপুর ঘুরে ও সেখানকার প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মাধ্যমে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের দুঃসময় গেছে। এ সময় সাংগাঠনিক অবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, নৌকা প্রতীকের ভোট ছিল মাত্র ২০-২৫ হাজার। ১৯৭৩ সালের এম.এল.এ নির্বাচনে মইনুদ্দিন মিয়াজী এখানে এমপি নির্বাচিত হন।

তবে ৭৫ সালের পর থেকে সুদীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকে। ২০০৮ সালের পর অবশ্য ৩ বার এই আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের জোয়ার বইছে এই আসনে। এই সুযোগে এখানে অনু-প্রবেশকারীরা দলের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে আছে কিন্তু দলের দুর্দিনের যারা সাথী ছিলেন এমন অনেকের ভ্যাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। এর মধ্যে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ ছিলেন তাদেরই একজন।

জানা গেছে, ১৯৭৭-৭৮ সালে কোটচাঁদপুর থানা ছাত্রলীগের মাধ্যমে সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদের ছাত্র রাজনীতি শুরু। ১৯৭৮ সালে মহেশপুরের পার্শ্ববর্তী কোটচাঁদপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। এর পর থেকে মুজিব কোট পরা শুরু করেন। ৩ দশক ধরে ১২ মাসই সেই কোট ধারণ করেন তিনি। রোদ-বৃষ্টি, শীত-গরম কোনো কিছুই বাধা মানেন না।

১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত রাজনীতি করতে গিয়ে সাজ্জাদুল ইসলামকে জেল-জু’লুম, অত্যা’চার-নির্যা’তন সহ্য করতে হয়েছে। ১৯৮৭ সালে ২৭ অক্টোবর এরশাদ বিরো’ধী আন্দোলনে রাষ্ট্রদ্রো’হী মামলায় আটক হয়ে ৭/৮ মাস জেলে থাকেন মুজিব আদর্শের সৈনিক সাজ্জাদ হোসেন। এ সময় তার পিতা মদি উদ্দিন সরদার মা’রা গেলেও দাফন করতে পারেননি।

১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগাঠনিক সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন সাজ্জাদ। এ সময় দলের সাংগাঠনিক অবস্থা আগের থেকে মজবুত হয়। ২০১২ সালে ইউপি নির্বাচনে মহেশপুর উপজেলার এসবিকে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দলের জন্য জীবন-যৌবন শেষ করলেও এমপি ও উপজেলা নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়েও ব’ঞ্চিত হন।

তৃণমুল কর্মীরা বলছেন, ইতিহাস সাক্ষী দেয় ৯০ সালের পূর্বে মহেশপুর পুরাতন পৌরসভার সামনে শেখ নিজাম উদ্দিনের সভাপতিত্বে একাই মাইক বেঁধে একাই বক্তব্য দিতেন এই নেতা। পথচারীরা ছাড়া বক্তব্য শোনার কেউ ছিল না। তখন হাল ধরার মত তেমন কোনো নেতা-কমী ছিল না। যারা ছিলেন তারা সামনে আসতে ভয় পেতেন।

৯০ দশকের পরে মহেশপুর পৌর আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক বুলু, ইব্রাহিম আলম, শিল্পী আব্দুর রাজ্জাক, তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা রিপন খাঁন, মীর সুলতানুজ্জামান লিটন, পলাশ খাঁন, যুবলীগ নেতা শরিফুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ সহ উদীয়মান ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হলে তার সহযাত্রী বৃদ্ধি পায়। আওয়ামী লীগ প্রসারিত হয়। দীর্ঘ ৩ দশক পর অবশেষে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তাকে মূল্যায়ন করলো।

৩০ নভেম্বর মহেশপুর উপজেলা সম্মেলনে প্রথম পর্ব শেষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই এমপি ২য় পর্বে বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলের সভানেত্রী কর্তৃক অনুমোদিত ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি এখন ঘোষণা করা হবে। কেন্দ্র থেকে এই কমিটির নাম হাতে দেয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপনের হাতে। তিনি আমাকে এই কমিটি ঘোষণা করতে বলেছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তা আপনাদের সামনে ঘোষণা করছি।’

এ সময় মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করেন সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদের নাম। এর পরপরই তৃণমুলের নেতা-কর্মীরা সাজ্জাদকে ঘাড়ে করে নিয়ে আনন্দ উৎসব করেন।

সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদের কাছে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

নির্বাচিত সভাপতি সাজ্জাদ জানান, এক সময় দলে অনু-প্রবেশকারীদের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, টিকতে না পেরে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে পড়েন। জাতীয় দৈনিক আমাদের সময়ে গত ১ দশক ধরে জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পাশাপাশি ছাড়েননি প্রিয় দলটিকে। তিনি জামায়াত অধ্যুষিত মহেশপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগকে আরো সুসংগঠিত করতে দলের সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

শেয়ার করুন !
  • 36.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply