দেশের শেষ গন্ডারটি মাত্র ৫ হাজার পাউন্ডে বেচে দিয়েছিল ব্রিটিশরা!

0

ফিচার ডেস্ক:

আজ থেকে প্রায় দেড়’শ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার বিলু’প্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীতে বুনো পরিবেশে ৫ প্রজাতির গন্ডারের বাস। যার ২টি প্রজাতি ছিল আফ্রিকায় ও ৩টি ছিল এশিয়ায়। এশিয়ার ৩টি প্রজাতির গন্ডারই ছিল আমাদের দেশে। কালের বিবর্তনে বসতি হারিয়ে, শিকা’র হয়ে আমাদের দেশের সব গন্ডার বিলু’প্ত হয়ে গেছে।

অতীত নথিপত্র, জেলাভিত্তিক গ্যাজেটিয়ার, ব্রিটিশ শাসনামলে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়- বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ৩ প্রজাতির গন্ডারের বসতি। সর্বশেষ জীবিত গন্ডারটিকে অর্থের লোভে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ৫ হাজার পাউন্ডে লন্ডন চিড়িয়াখানায় বিক্রি করে দেয় ১৮৭২ সালে।

গন্ডার (Rhinoceros বা Rhino) এক প্রকার স্তন্যপায়ী তৃণভোজী প্রাণী। এটি রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্গত। বাংলাদেশ থেকে বিলু’প্ত এই ৩ প্রজাতির গন্ডারের বসতির বিস্তৃতি ছিল যথাক্রমে: Indian rhinoceros (Rhinoceros unicornis) এক শিঙ্গি বড় গন্ডার নেপাল, সিকিম থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত; Javan rhinoceros (Sunda rhinoceros) সুন্দরবন, যশোর থেকে বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত; Sumatran (Didermoceros sumatrensis) দুই শিঙ্গি গন্ডারের আবাস কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত ছিল।

সুন্দরবন ও যশোর থেকে শি’কার করা ১১টি এক শিঙ্গি ছোট গন্ডার কলকাতা, বার্লিন ও লন্ডন জাদুঘরে তৎকালীন সময় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গেছে।

সুন্দরবনে আদি সভ্যতার প্রত্নস্থলের আবিষ্কারক ইসমে আজম (ঋজু) বাংলাদেশ থেকে গন্ডারের বিলু’প্তি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।

ইসমে আজম (ঋজু) জানান, ১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় ১টি দুই শিঙ্গি গন্ডার গু’লি করে মারা হয় এবং ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি দুই শিঙ্গি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার ‘বেগম’। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোনো এক স্থানে এটি মানুষের হাতে ব’ন্দী হয়। চোরাবালিতে আটকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল গন্ডারটি। স্থানীয় লোকজন গন্ডারটিকে চোরাবালি থেকে তুলে আটকে রেখে প্রশাসনকে জানায়।

তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ক্যাপ্টেন হুড ও মি. উইকস ৮টি হাতি নিয়ে ১৬ ঘণ্টা কঠোর চেষ্টার পর এটিকে ব’ন্দী করে। অর্থের লোভ সামলাতে পারেনি তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তা। ১৮৭২ সালে বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারটিকে ৫ হাজার পাউন্ডে লন্ডন চিড়িয়াখানার কাছে বিক্রি করে দেন। নিজ বসতভিটা ছেড়ে বেগম ব’ন্দী হলো লন্ডনের খাঁচায়। এই গন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে বিলু’প্ত হয়েছে আমাদের গন্ডার প্রজাতি।

লন্ডন চিড়িয়াখানাতেই গন্ডারটির নামকরণ করা হয় ‘বেগম’ নামে। লন্ডনে মি. কিউলমান নামের এক চিত্রশিল্পী বাংলাদেশের জীবিত শেষ গন্ডারের ছবিও আঁকেন।

ইসমে আজম আরও জানান, সুন্দরবনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮০০ শতাব্দীর শেষ দিকে বা ১৯০০ সালের প্রথম দিকে সুন্দরবনের নলিয়ান থেকে কালাচাঁদ নামের এক শি’কারি একটি গন্ডার Javan rhinoceros (Sunda rhinoceros) শি’কার করেন। খুলনার রায় সাহেব নলিনীকান্ত রায় চৌধুরী শেষ ১৮৮৫ সালে সুন্দরবনে গন্ডারের পায়ের চিহ্ন দেখেছিলেন। তারপর সুন্দরবনে বা বাংলাদেশের কোথাও আর গন্ডারের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুবাদে সমগ্র সুন্দরবন ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছি কয়েকবার। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫–১৬ সালে বাঘ বিষয়ক একটি গবেষণা কার্যক্রমের অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়। মাঠ পর্যায়ের সেই গবেষণাকালে আমার দলের নাম দিয়েছিলাম টিম রাইন (গন্ডারের দল)। বনভূমি ও ইতিহাস অনুসন্ধান করে বুঝেছিলাম সুন্দরবনে তৃণাঞ্চলের ঘাটতি ও অবাধ শি’কারই গন্ডার বিলু’প্তির কারণ।

ইসমে আজম জানান, একসময় সুন্দরবনে চামড়া, শিং ও মাংসের জন্য ব্যাপক আকারে গন্ডার শিকা’র করা হতো। প্রাচীনকালে সুন্দরবন অঞ্চলের আদিবাসীরা গন্ডারের মাংস খেত। সুন্দরবনের প্রাচীন প্রত্নস্থলে তারই নমুনাস্বরূপ একটি গন্ডারের দাঁতের জীবাশ্ম-প্রমাণ পাওয়া যায়। পাশাপাশি অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর হাড়ের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। অন্য আরেক প্রত্নস্থলে পাওয়া যায় পায়ের হাড়, যা দেখে অনুমান করা যায় হাড়ের ভেতরের মজ্জা বের করার জন্য ভাঙা হয়েছিল হাড়টি।

তিনি আরও জানান, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সেকেন্দার ডাক্তার একটি পুকুর খননের সময় মাটির গভীরে ২টি গন্ডারের কঙ্কাল পান। এ ছাড়া সুন্দরবনসংলগ্ন হরিণগড় গ্রামে এফাজতুল্লা সরদার পুকুর খননের সময় ১টি গন্ডারের কঙ্কাল, ধুমঘাট দিঘি খননের সময় ৬টি গন্ডারের কঙ্কাল ও ঈশ্বরীপুর মাখন লাল অধিকারীর বাড়িতে ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক এ এফ এম আবদুল জলিল ৬টি গন্ডারের কঙ্কাল দেখেন।

ইসমে আজম বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে বসবাসরত ঢালী পদবির লোকজন সুন্দরবনে গন্ডার শি’কার করে তার চামড়া দিয়ে যু’দ্ধের জন্য ঢাল প্রস্তুত করত। ঢাল থেকে পেশাগত কারণে ঢালী পদবির উৎপত্তি। এই ঢালীরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যর হয়ে যু’দ্ধ করত। পরবর্তী যুগে এসে ইংরেজ শি’কারিদের ব্যাপক শি’কারের ফলে অবশিষ্ট গন্ডার সুন্দরবন থেকে বিলী’ন হয়ে যায়।

প্রতিবেদক: রিপন দে
দেশ রূপান্তর

শেয়ার করুন !
  • 358
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!